একটা সময় ছিলো যখন আমরা বলতাম, বর্তমান যুগ টেকনোলজির যুগ। কিন্তু এখন সেই টেকনোলজির যুগও পুরনো হয়ে গেছে। এখন আমাদের বলতে হচ্ছে বর্তমান যুগ Ai এর যুগ। যেখানেই যান না কেন যাই করেন না কেন, সবখানেই এখন Ai এর আধিপত্য।

স্মার্টফোন থেকে কম্পিউটার, ছবি থেকে ভিডিও সবকিছুতেই Ai এর ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। একটা সময় ছিলো যখন আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি, রিসার্চ, ইত্যাদি করে তারপর একটা আর্টিকেল বা ব্লগ পোস্ট লিখতে বসতাম। তবুও পুরোপুরি লেখা হত না, এরপর বসতাম থাম্বনেইল, ছবি, ইত্যাদি বানাতে। কিন্তু এখন কি হচ্ছে? এইযে পোস্টা টা লিখতেছি এটা যদি ChatGPT বা Gemini বা অন্য কোন Ai কে বলতাম সে এক মিনিটেরও কম সময়ে লিখে দিতো।

তাছাড়া মাত্র একটা প্রম্পট দিলেই থাম্বনেইল সহ বানিয়ে দিতো। এখন তো Ai আরো এডভান্স হয়ে গেছে। যদি বলি আমাকে এই আর্টিকেলের লেখাগুলো দিয়ে একটা ভিডিও বানিয়ে দাও, সেটাও বানিয়ে দিবে মুহূর্তের মধ্যে।  বুঝতেই পারছেন দিন দিন Ai কতটা উন্নত হচ্ছে।

কিছুদিন আগে পর্যন্ত Ai দিয়ে ছবি বানাতে গেলে ঠিকমতো বানাতে পারতো না, হাতের আঙ্গুল থাকতো উল্টাপাল্টা, মুখের এক্সপ্রেশন অদ্ভুত, ইত্যাদি বিভিন্ন সমস্যা থাকতো, কিন্তু এখন একদম নিখুত ভাবে ছবি তো বানাচ্ছেই তার সাথে মাত্র একটা প্রম্পটে একদম রিয়েলিস্টিক ভিডিও বানিয়ে দিচ্ছে তাও আবার ভয়েস সহ। ভিডিও দেখে বুঝার উপায় নেই এটা কি সত্যি নাকি Ai দিয়ে বানানো। এতটাই নিখুত ভাবে বানাচ্ছে যে কথার একসেন্টও একদম মিলে যাচ্ছে।

যেটা এখন ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, সহ সোশাল মিডিয়া সাইট গুলোতে দেখা যাচ্ছে। বেশিভাগ মানুষ তো বুঝতেই পারে না যে এগুলো Ai দিয়ে বানানো। না বুঝেই সবাই লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করতেছে, যার ফলে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, সত্যি-মিথ্যা আলাদা করা যাচ্ছে না। আর বাঙ্গালিতো একটা পাইলে হইসে এটা শেষ না দেখে ছাড়ে না। আর এসব ভিডিওর মাঝে দেখা যাচ্ছে বেশির ভাগই অশ্লীল।

এসবের মাঝে আরো কিছু ভিডিও দেখলাম যেগুলো আরো একধাপ এগিয়ে। সেসব ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, যদি নবী-রাসূলদের আমলে, ইন্টারনেট থাকতো তাহলে কেমন হতো। একটা ভিডিও দেখলাম সেখানে দেখাচ্ছে, মুসা (আঃ) নীল নদ পার হচ্ছে ফেসবুকে লাইভ করেতে করতে, (নাউজুবিল্লাহ)।

কেন Ai দিয়ে ছবি, ভিডিও বানাবেন না?

Ai দিয়ে ছবি, ভিডিও বানানো বন্ধ করুন

এতক্ষণ বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে অনেক কথা বললাম। এবার চলেন দেখা যাক Ai দিয়ে কেন ছবি, ভিডিও বানাতে মানা করলাম। আর যদি বানাতেই হয় তাহলে কি ধরনের ছবি, ভিডিও বানানো যেতে পারে।

হাদিস ১ঃ

একটি সহীহ হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
“কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সব থেকে শক্ত শাস্তি হবে তাদের, যারা ছবি তৈরি করে।”

(সহীহ বুখারি – তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস নং: ৫৯৫০)
সোর্সঃ HadithBD

ব্যাখ্যাঃ

  1. এই হাদীসটির দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, প্রকৃত ইসলাম ধর্মে জীবজগতের বা জীবজন্তুর ছবি বা মূর্তি তৈরি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম করা হয়েছে।
  2. এই হাদীসটির মধ্যে জীবজগতের বা জীবজন্তুর ছবি বা মূর্তি তৈরি করা হতে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে; কেননা এর দ্বারা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাথে তুলনা করা হয়। এবং জীবজগতের বা জীবজন্তুর ছবি বা মূর্তি তৈরি করার বিষয়টি হলো আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করার একটি মাধ্যম এবং উপাদান।

হাদিস ২ঃ

এছাড়া তিনি আরও বলেছেন, “প্রত্যেক ছবি প্রস্তুতকারী জাহান্নামের অধিবাসী হবে। তার তৈরিকৃত প্রতিটি ছবিতে জীবন দেয়া হবে, সে সময় জাহান্নামে তাকে ঐগুলো আযাব দিতে থাকবে। তিনি আরও বললেন, তোমাকে একান্তই যদি তা করতে হয়, তাহলে যেসব জিনিসের জীবন নেই, সে সব বস্তুর ছবি প্রস্তুত করো।”

(সহীহ মুসলিম, আন্তর্জাতিক হাদিস নং: ২১১০, হাদিস একাডেমি হাদিস নংঃ ৫৪৩৩) (সহীহ বুখারী – তাওহীদ পাবলিকেশন হাদিস নং: ২২২৫)
সোর্সঃ HadithBD 1, HadithBD 2

ব্যাখ্যাঃ

  1. প্রকৃত ইসলাম ধর্মে জীবজগতের বা জীবজন্তুর মূর্তি বা ছবি তৈরি করা ও বিক্রয় করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম করা হয়েছে। তবে জীবজগৎ বা জীবজন্তু ছাড়া অন্যান্য জিনিসের মূর্তি বা ছবি তৈরি করা বৈধ। সুতরাং নদী, পাহাড়-পর্বত এবং ভবন অর্থাৎ যেসব জিনিসের জীবন নেই, ইত্যাদির ছবি তৈরি করা সদাসর্বদা বৈধ।
  2. প্রকৃত ইসলাম ধর্মে কাল্পনিক প্রাণীর মূর্তি খোদাই করা অথবা নির্মান করা কিংবা ছবি তৈরি করাও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম করা হয়েছে। কেননা এইগুলি তো স্বভাবিকভাবে আকৃতির দিক দিয়ে প্রকৃত জীবজগৎ বা জীবজন্তুর মতই যদিও সেগুলির সমতুল্য প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে কোনো জীবজন্তুর অস্তিত্ব নেই।
এখন আমরা যে Ai কে প্রম্পট দিয়ে বিভিন্ন ছবি, ভিডিও, ইত্যাদি জেনারেট করি সেগুলোও কিন্তু ছবি আঁকার মতই বরং এটা আরো এডভান্স একদম সেইম টু সেইম হয়ে যাচ্ছে।  হাদিসগুলো থেকে বুঝা যায় মানুষ বা প্রাণীর ছবি, যেসব জিনিসের প্রাণ আছে সেসব ছবি আঁকা নিষেধ বা হারাম, কারন এটা অনেকটা আল্লাহর সাথে শিরক করার পর্যায় চলে যায়। যেহেতু যেসব জিনিসের প্রাণ আছে সেসব ছবি আঁকা নিষেধ বা হারাম, সেহেতু প্রাণ আছে এরকম কিছুর ছবি, ভিডিও, Ai দিয়ে বানানোটাও হারাম হবে। কারন এখানে তো Ai নিজে থেকে বানাচ্ছে না, Ai কে আপনি বানানোর নির্দেশ (প্রম্পট) দিচ্ছেন।

কুরআনঃ

“নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করবেন না। এটা ছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে মাফ করবেন এবং যে আল্লাহর সাথে শরীক করল, সে এক মহা অপবাদ আরোপ করল।” – সূরাঃ আন-নিসা, আয়াতঃ ৪৮, সোর্সঃ HadithBD

আপনি যদি শিরকের গুনাহর জন্য আল্লাহর কাছে তওবা না করে মৃত্যুবরণ করেন তাহলে সেই গুনাহ আর মাফ হবে না। অর্থাৎ, শিরকের গুনাহ থেকে মাফ পাওয়ার জন্য মৃত্যুর আগেই তওবা করে যেতে হবে । আমরা যেহেতু জানি না আমাদের মৃত্যু কখন হবে, তাই জেনে বা না জেনে শিরক হয়ে গেছে এরকম মনে হবার সাথে সাথেই তওবা করে নিতে হবে। নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে, অবসর সময়ে যখনই মনে হবে তখনই আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে।

যেসব যায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছিঃ

আরো ভালোভাবে বুঝার জন্য, ইসলামিক স্কলার ও আলেমদের ব্যাখ্যা জানার জন্য নিচের লিংক থেকে ভিডিও গুলো দেখে নিতে পারেন, পোস্ট পড়ে ভুঝার চেয়ে ভিডিও দেখে বুজা আরো সহজ হবে আশা করি।

ছবি আঁকা, Ai দিয়ে ছবি, ভিডিও বানানো, ইত্যাদি সম্পর্কে ভিডিওঃ

১। শায়খ আহমাদুল্লাহঃ

  1. প্রাণীর ছবি আঁকা জায়েজ আছে কি?
  2. Ai দিয়ে প্রাণীর ইমেজ ক্রিয়েট করা জায়েজ আছে কি না?
  3. Ai ব্যবহার করে অনেকে প্রাণীর ছবি তৈরি করছে, এটা কি জায়েজ?

২। আসিম আল-হাকিমঃ

  1. Is Drawing permissible in Islam?
  2. Is asking AI to draw images of humans & animals haram?

৩। মিজানুর রহমান আজহারীঃ

  1. প্রাণীর ছবি অঙ্কনের ব্যাপারে কি বলে ইসলাম?
  2. ইসলামে প্রাণীর ছবি আঁকা সম্পর্কে

৪। মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহীঃ

  1. Ai দিয়ে ছবি আঁকা কি হারাম?

৫। জাকির নায়েকঃ

  1. making image or statue is haram in Islam
  2. About Drawing Pictures in Islam
  3. is it permitted in islam to draw picture for studying purpose

শিরক ও তওবা সম্পর্কে ভিডিওঃ

Islam and Life:

  1. শিরক কাকে বলে ও তা কত প্রকার?

শায়খ আহমাদুল্লাহঃ

  1. কি কি কাজ করলে শিরক হয় ?
  2. না জেনে শিরক করলে
  3. যদি কেউ শিরক করে পরে তওবা করে, তার গুনাহ কি মাফ হবে?
  4. ছোট শিরক মাফ হবে কি?
  5. তওবা করলে কি সব গুণাহ মাফ হয়ে যায়

মিজানুর রহমান আজহারীঃ

  1. শিরক করা যাবে না
  2. অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করে দেন
  3. শিরকের গুনাহ কি তাওবার দ্বারা ক্ষমা হবে?
  4. আমাদের পাপ যদি হয় পাহাড় সমান, আল্লাহর ক্ষমা আকাশ সমান

জাকির নায়েকঃ

  1. Kya Allah Shirk Ko Maaf Kar Sakte Hai (আল্লাহ কি শিরকের গুনাহ মাফ করবেন)
  2. will Allah forgive the Sin of Shirk

মুফতি মেংকঃ

  1. Would Allah forgive shirk

আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফঃ

  1. সমাজে প্রচলিত ৫০টি শিরক
  2. শিরক করেছি এখন উপায় কি?

এতগুলো লিংক ও রেফারেন্স কেন যুক্ত করলামঃ

এতগুলো লিংক ও রেফারেন্স যুক্ত করার কারন সবাই যাতে বিষয়টা ভালোভাবে বুঝতে পারে। সবাই তো আর এক হুজুর বা স্কলারকে ফলো করেন না তাই চেষ্টা করেছি জনপ্রিয় আলেমদের ব্যাখ্যাগুলো এখানে যুক্ত করতে। আর তাছাড়া এই পোস্টের লেখাগুলো আমার নিজের মতবাদ না, এগুলো আলেম ও স্কলারদের কথার ব্যাখ্যা, সেটা বুঝানোর জন্য সবগুলো লিংক ও রেফারেন্স যুক্ত করা। 

শেষকথাঃ

আজকে অনেকদিন পর এই পোস্ট টা করলাম, প্রায় এক বছর পর ট্রিকবিডিতে পোস্ট লিখতেছি। আগে রেগুলার লেখা হতো এখন কেন যেন লেখার মুড আশে না। আর তাছাড়া ট্রিকবিডিটে আগের মত অভিজ্ঞ লেখক বা ওয়েবমাস্টারও দেখা যায় না। Riadrox ভাই সহ আরো অনেক ভালো ভালো লেখক ছিলো তাদেরকে অনেক মিস করি, কোথায় যে হাড়িয়ে গেল তারা। যদিও পোস্ট লেখা হয় না তবুও প্রিতিদিন একবার হলেও ট্রিকবিডিতে ভিজিট করা হয়।

আজকের পোস্ট টা করতে আমার প্রায় ৬-৭ ঘন্টা সময় লেগেছে, সবগুলো লিংক-রেফারেন্স জোগার করে লেখাটা সাজাতে অনেক সময় লেগেছে। তাছাড়া এই পোস্ট টা ইসলাম বিষয়ক যার করনে সময় আরো বেশি লেগেছে, কারন যদি কোন ভুল তথ্য চলে আসে তাহলে গুনাহ হবে, তাই চেষ্টা করেছি সবগুলো সোর্স যেন ট্রাস্টেড সাইট থেকে হয়। 

তবুও যদি পোস্টে কোন ভুল থাকে অনুগ্রহ করে কমেন্ট করে ভুলটা ধরিয়ে দিবেন। যদিও হাদিসের ব্যাখ্যা এখানে যা যুক্ত করেছি তার একটাও আমার নিজের করা নয়, সবগুলোই HadithBD থেকে কপি করে এখানে দিয়েছি। 

পোস্ট টা শেয়ার করে সবাইকে জানিয়ে দেয়ার অনুরোধ রইলো। আর এ বিষয়ে আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না। কেউ যদি পোস্ট টা কপি করে নিজের সাইট, বা সোশাল মিডিয়ায় দিতে চান তাহলে প্লিজ আমার এই পোস্টের প্রতি একটা ক্রেডিট দিবেন। সেখানে শেয়ার করার সময় এই পোস্টের লিংকটাও সাথে যুক্ত করে দিবেন।