স্মার্টফোনের বাজারে এখন যেন আগুন লেগেছে! অফিশিয়াল বা আনঅফিশিয়াল যেকোনো মার্কেটেই ফোনের দাম হু হু করে বাড়ছে। আপনারা নিজেরাই হয়তো খেয়াল করেছেন, কিছুদিন আগেও লঞ্চ হওয়া একটি ফোনের দাম হুট করে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে! আর এই দাম বাড়ার পর সেটা যে কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এর মধ্যে আবার নতুন করে ভ্যাট-ট্যাক্স যুক্ত হওয়ার খবর শুনছি। সব মিলিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য খুব বাজে একটা সময় যাচ্ছে। ঠিক এরকম একটা হতাশাজনক সময়ে বাজারে এসে পৌঁছেছে নতুন একটি ৫জি স্মার্টফোন জেনন এক্স ২২ (Xenon X22)। আজকের এই ব্লগে ফোনটির বিস্তারিত তুলে ধরব।
আর্জেন্টিনা ভক্তদের জন্য সারপ্রাইজ!
আপনি যদি আর্জেন্টিনার অন্ধ ভক্ত হয়ে থাকেন, তবে এই ফোনের বক্সটি আপনার জন্য একটা ইমোশনাল ব্যাপার হতে পারে। কারণ জেনন হচ্ছে আমাদের দেশে আর্জেন্টিনার রিজিওনাল স্পন্সর। আর তাই বক্সের গায়েই দেখতে পাবেন মেসি, মার্টিনেজ আর দিবালার উচ্ছ্বসিত ছবি। বক্সটি খুললেই প্রথমে চোখে পড়বে জেননের একটি গ্রিটিং কার্ড। বক্সের ভেতরে আরো থাকছে ১৮ ওয়াটের একটি চার্জার, একটি ইউএসবি কেবল, সিম ইজেক্টর পিন এবং একটি সেমি-ট্রান্সপারেন্ট ব্যাক কভার। কোম্পানি বক্সের ভেতরেই একটি স্ক্রিন প্রটেক্টর দিয়ে দিয়েছে, যা সত্যি চমৎকার একটি উদ্যোগ।
ডিজাইন ও বিল্ড কোয়ালিটি:
ফোনটির ডিজাইন আমার কাছে বেশ সাধারণ মনে হয়েছে। প্লাস্টিক বিল্ডের এই ফোনের পেছনে ম্যাট ফিনিশ ব্যবহার করা হয়েছে এবং ফ্রেমটি গ্লসি। পেছনের দিকে একটি ক্যামেরা প্ল্যাটোর ডিজাইন রয়েছে। ফোনটির থিকনেস ৬.৬৮ মিলিমিটার বলা হলেও, ভেতরে বিশাল ব্যাটারি থাকায় হাতে নিলে এটিকে বেশ চওড়া মনে হয়। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এর ফ্রন্টে পান্ডা গ্লাসের প্রোটেকশন দেওয়া হয়েছে এবং ৩.৫ মিলিমিটার হেডফোন জ্যাকটি এখনো রয়েছে। ফোনটিতে আইপি৬৪ (IP64) রেটিং আছে। অর্থাৎ, বৃষ্টির পানির হালকা ছিটেফোঁটায় কোনো সমস্যা হবে না, তবে ভুল করেও ফোনটি পানিতে ডোবাবেন না!
ডিসপ্লে: সবচেয়ে বড় আক্ষেপের জায়গা
এই ফোনের ডিসপ্লে নিয়ে আমি সত্যিই বেশ হতাশ। এতে দেওয়া হয়েছে ৬.৮ ইঞ্চির একটি আইপিএস এইচডি প্লাস (IPS HD+) প্যানেল। সবচেয়ে বড় আক্ষেপের জায়গা হলো এর ‘ওয়াটারড্রপ নচ’। ২০২৪/২৫ সালে এসে ২৫ হাজার টাকার বেশি দামের একটি ফোনে এই পুরনো আমলের ওয়াটারড্রপ নচ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এর পাশাপাশি ডিসপ্লের সাইড বেজেল এবং নিচের দিকের চিনটাও বেশ মোটা।
তবে প্যানেল হিসেবে এর ভিজ্যুয়াল কোয়ালিটি মোটামুটি ঠিকঠাক। ওয়াইডভাইন এল১ (Widevine L1) সাপোর্ট থাকায় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোতে ফুল এইচডিতে কনটেন্ট দেখতে পারবেন। আর ইউটিউবে সর্বোচ্চ ১৪৪০পি (1440p) রেজোলিউশনে ভিডিও দেখা সম্ভব। ডিসপ্লেটিতে ১২০ হার্জের রিফ্রেশ রেট থাকায় স্ক্রলিং বেশ স্মুথ। সাধারণ অবস্থায় এর পিক ব্রাইটনেস ৪৫০ নিটস, হাই ব্রাইটনেস মোড (HBM) অন করলে এটি ৬৩০ নিটস পর্যন্ত যায়। কড়া রোদে এই ব্রাইটনেস কিছুটা কম মনে হতে পারে। তাছাড়া টানা ব্যবহারের পর ডিসপ্লেতে হালকা গ্রিন টিন্ট ইস্যু এবং মাঝে মাঝে টাচ মিস হওয়ার মতো ছোটখাটো সমস্যা আমরা খেয়াল করেছি।
পারফরম্যান্স: যেখানে ফোনটি বাজিমাত করেছে
পারফরম্যান্স সেকশনে এসে ফোনটি দারুণ চমক দিয়েছে। জেনন এখানে কোনো ফেক বা এক্সটেন্ডেড র্যাম দেয়নি; দিয়েছে একদম খাঁটি ৮ জিবি ফিজিক্যাল এলপিডিডিআর৫ (LPDDR5) র্যাম। যার ফলে ব্যবহারের সময় আমরা কোনো ধরনের ল্যাগ পাইনি। ফোনটি অ্যান্ড্রয়েড ১৬-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি ‘ডিড ওএস’ (Dido OS)-এ রান করছে। ডে-টু-ডে ইউজে এই ইউজার ইন্টারফেসটি বেশ ভালোই পারফর্ম করে। তবে এতে ১২৮ জিবি ইউএফএস ২.২ (UFS 2.2) স্টোরেজ দেওয়া হয়েছে, যা এই বাজেটে অন্তত ২৫৬ জিবি হওয়া উচিত ছিল। তবে এসডি কার্ড স্লট থাকায় মেমোরি বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রসেসর হিসেবে রয়েছে মিডিয়াটেক ডাইমেনসিটি ৭১০০ (Dimensity 7100) যা একটি ৫জি সাপোর্টেড শক্তিশালী চিপসেট। প্রতিদিনের কাজগুলো এটি খুব সহজেই সামলে নিতে পারে। গেমিংয়ের ক্ষেত্রে, ফোনটি খুব একটা গরম হয়নি। স্মুথলি গেম খেলা যায়, তবে অনেক এনিমি একসাথে চলে আসলে হালকা ফ্রেম ড্রপ দেখা যেতে পারে।
ক্যামেরা পারফরম্যান্স
পেছনের বিশাল ক্যামেরা বাম্প দেখলে মনে হবে তিনটি লেন্স আছে, কিন্তু কাজের লেন্স মাত্র একটি ৫০ মেগাপিক্সেলের আইএমএক্স ৭৫২ (IMX 752) সেন্সর, সাথে রয়েছে ২ মেগাপিক্সেলের একটি ম্যাক্রো লেন্স। মূল সেন্সরটি বেশ শক্তিশালী। দিনের আলোতে এটি ব্রাইট এবং স্যাচুরেটেড ছবি উপহার দেয়। পোর্ট্রেট মোডে ছবি তোলার সময় এই ক্যামেরাটি মানুষের চেহারাকে বেশ স্মুথ এবং ফর্সা করে ফেলে, যা অনেকেরই পছন্দ হতে পারে। ৮ মেগাপিক্সেলের ফ্রন্ট ক্যামেরাও প্রায় একই কাজ করে। তবে রাতের বেলায় বা আলোর স্বল্পতায় ক্যামেরাটি কিছুটা সংগ্রাম করে, ছবিতে নয়েজ চলে আসে। তখন ‘নাইট মোড’ ব্যবহার করলে কিছুটা ভালো রেজাল্ট পাওয়া যায়। ভিডিওর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ 2K 30fps এ রেকর্ড করা গেলেও, স্মুথনেসের জন্য 1080p 60fps ব্যবহার করাই ভালো।
ব্যাটারি: এক সত্যিকারের পাওয়ার হাউস
ব্যাটারি ব্যাকআপের দিক থেকে জেনন এক্স ২২ একটি দানব! এতে রয়েছে ৬০০০ এমএএইচ (6000 mAh) এর বিশাল ব্যাটারি। ভারী ব্যবহারের পরও ফোনটি অনায়াসেই এক থেকে দেড় দিনের ব্যাটারি ব্যাকআপ দিতে পারে। বক্সে থাকা ১৮ ওয়াটের ফাস্ট চার্জার দিয়ে ফুল চার্জ করতে প্রায় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিটের মতো সময় লাগে। সাথে বাইপাস চার্জিংয়ের সুবিধাও রয়েছে, যা গেমারদের জন্য দারুণ উপকারী।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সবশেষে বলা যায়, বর্তমান বাজারের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় জেনন এক্স ২২ মোটামুটি একটি চলনসই ফোন। এর শক্তিশালী 5G প্রসেসর, বিশাল ব্যাটারি, খাঁটি ৮ জিবি ফিজিক্যাল র্যাম এবং ডুয়েল ব্যান্ড ওয়াইফাই, ব্লুটুথ ৫.৪-এর মতো আধুনিক ফিচারগুলো এটিকে বেশ আকর্ষণীয় করেছে। তবে ২৫ হাজার টাকার রেঞ্জে একটি ওয়াটারড্রপ নচ ডিসপ্লে এবং মাত্র ১২৮ জিবি স্টোরেজ এই বিষয়গুলো ক্রেতাদের কিছুটা হতাশ করতে পারে। আপনি যদি ডিজাইন ও ডিসপ্লের চেয়ে ব্যাটারি এবং দীর্ঘস্থায়ী পারফরম্যান্সকে বেশি গুরুত্ব দেন, তবে এই ফোনটি আপনার পছন্দের তালিকায় রাখতে পারেন।
📱 Walton XANON X22 5G-এর সর্বশেষ দাম, সম্পূর্ণ স্পেসিফিকেশন এবং সব ভ্যারিয়েন্টের বিস্তারিত তথ্য —
এখানে দেখুন →





