অ্যাপলের নতুন চমক: আইফোনের প্রসেসরে ‘MacBook Neo’

শুরুতে কিছু কথা ও বাংলাদেশের বাজারের বাস্তবতা

একটু চিন্তা করুন তো, অ্যাপলের একটি নতুন ল্যাপটপ বাজারে এসেছে, যার গ্লোবাল দাম মাত্র ৫৯৯ ডলার! ইন্টারনেটে বিভিন্ন ভিডিও বা আর্টিকেলে হয়তো শুনে থাকবেন যে, স্টুডেন্ট ডিসকাউন্টে এটি মাত্র ৪৯৯ ডলারে পাওয়া যায়। শুনে মনটা হয়তো খুশিতে নেচে উঠেছিল, তাই না? কিন্তু ভাই, কঠিন বাস্তবতা হলো  আমরা থাকি বাংলাদেশে! আমাদের দেশের বাজারে অ্যাপলের কোনো অফিশিয়াল স্টুডেন্ট ডিসকাউন্ট পাওয়ার উপায় নেই।

ইমপোর্ট খরচ, ট্যাক্স আর বাজারের সার্বিক অবস্থা মিলিয়ে বাংলাদেশে এই ল্যাপটপের ২৫৬ জিবি (256GB) ভ্যারিয়েন্টের দাম গিয়ে ঠেকেছে ৮৭,০০০ থেকে ৮৮,০০০ টাকায়! আর আপনি যদি স্টোরেজ বাড়িয়ে ৫১২ জিবি (512GB) নিতে চান, তবে পকেট থেকে এক ধাক্কায় খসবে ১ লাখ ৪ হাজার টাকা (১,০৪,০০০ টাকা)। গ্লোবাল প্রাইসের সাথে তুলনা করলে দামটা শুনে একটু ধাক্কা লাগাই স্বাভাবিক। তবে গত এক সপ্তাহ ধরে এই ল্যাপটপটি ব্যবহার করার পর আমার মনে হয়েছে, দাম যা-ই হোক না কেন, এটি গত ১০ বছরের মধ্যে অ্যাপলের সবচেয়ে মার্কেট-কাঁপানো পণ্য হতে যাচ্ছে। এটি কোনো ভিশন প্রো (Vision Pro)-এর মতো জটিল প্রযুক্তি নয়, বরং সাধারণ একটি ল্যাপটপ যা উইন্ডোজ আর ক্রোমবুকের বাজারকে রীতিমতো কাঁপিয়ে দেবে।


এই ল্যাপটপটির সবচেয়ে বড় চমক নিয়ে আগে কথা বলি। এটি একটি এন্ট্রি-লেভেলের ল্যাপটপ, আর এতে ব্যবহার করা হয়েছে আস্ত একটি আইফোনের চিপ A18 Pro! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। আইফোন ১৬ প্রো-তে যে চিপ ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটিই এখন ম্যাকবুক নিও-এর ভেতরে বসে ম্যাক ওএস (Mac OS) চালাচ্ছে।

গত কয়েক বছরে মোবাইল প্রসেসরগুলো কতটা শক্তিশালী হয়েছে, এটা তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আইফোনের এই প্রসেসর ল্যাপটপে বসে পারফরম্যান্সের দিক থেকে ম্যাকবুক এয়ারের M1 চিপের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। গিকবেঞ্চ (Geekbench) মাল্টি-কোর স্কোরে এটি সাড়ে আট হাজারের বেশি মার্কস তুলেছে, যা M1 চিপের প্রায় সমান। আর সিঙ্গেল কোর পারফরম্যান্সে এটি M3 চিপের কাছাকাছি পারফর্ম করে! একটি মোবাইল প্রসেসর যে ল্যাপটপের ভেতরে বসে এত দুর্দান্ত পারফর্ম করতে পারে, তা সত্যিই অবাক করার মতো বিষয়।

পারফরম্যান্স এবং র‍্যাম ব্যবস্থাপনা

ল্যাপটপটিতে মাত্র ৮ জিবি র‍্যাম দেওয়া হয়েছে। এখনকার দিনে ক্রোম ব্রাউজারে অনেকগুলো ট্যাব খুললে এই ৮ জিবি র‍্যাম খুব দ্রুতই ভরে যায়। কিন্তু অ্যাপল এখানে তাদের মোবাইল ইকোসিস্টেমের পুরোনো ম্যাজিকটা দেখিয়েছে। যখন র‍্যাম ভরে যায়, তখন এটি সোয়াপ (Swap) মেমোরি ব্যবহার শুরু করে। অর্থাৎ, সামাল দেওয়ার জন্য ল্যাপটপের এসএসডি (SSD) ব্যবহার করে। এর ড্রাইভগুলোর রিড স্পিড প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৫০০ মেগাবাইট। তাই সাধারণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ৮ জিবি র‍্যাম নিয়ে খুব একটা সমস্যা বা ল্যাগিং ফেস করতে হয় না। আপনি অনায়াসেই ওয়েব ব্রাউজিং, স্প্রেডশিট, গান শোনা, ইমেইল চেক করা এবং ওয়ার্ড প্রসেসিংয়ের কাজগুলো একসাথে করতে পারবেন।

ডিজাইন ও ডিসপ্লে: প্রিমিয়াম ফিল

বাজেট ল্যাপটপ হলেও অ্যাপল এর বিল্ড কোয়ালিটিতে কোনো ছাড় দেয়নি। এর বডি পুরোটাই অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি, যা এই বাজেটের অন্য যেকোনো প্লাস্টিক উইন্ডোজ ল্যাপটপের চেয়ে অনেক বেশি প্রিমিয়াম ফিল দেয়। কিবোর্ডে চাপ দিলে দেবে যাওয়ার কোনো অনুভূতি নেই। ব্যালেন্সড হিঞ্জের কারণে আপনি মাত্র এক আঙুল দিয়েই ল্যাপটপটি খুলতে পারবেন।

ল্যাপটপটিতে রয়েছে একটি ১৩ ইঞ্চির এলসিডি (LCD) ডিসপ্লে, যার রেজোলিউশন ১৪৪০পি (1440p) এবং রিফ্রেশ রেট ৬০ হার্জ। এর ব্রাইটনেস ৫০০ নিটস, যা ঘরের ভেতরে বা অফিসে ব্যবহারের জন্য একদম পারফেক্ট। ল্যাপটপটির পাশে দুটি ইউএসবি টাইপ-সি (USB Type-C) পোর্ট আছে। মজার ব্যাপার হলো, ল্যাপটপটি বেশ কয়েকটি দারুণ রঙে পাওয়া যাচ্ছে। ‘সিট্রাস’ (Citrus) রঙের ল্যাপটপটি দেখতে ঠিক লেমন-লাইম গেটোরেডের মতো। ল্যাপটপ চালু করলে ভেতরের ওয়ালপেপার আর সফটওয়্যারের থিমও ল্যাপটপের বাইরের রঙের সাথে ম্যাচ করা থাকে, যা দেখতে খুব কিউট লাগে!

কিবোর্ড ও ব্যাটারি লাইফ

এর কিবোর্ডটি ঠিক ৩ হাজার ডলারের দামি ম্যাকবুক প্রো-এর মতোই। টাইপিং এক্সপেরিয়েন্স মাখনের মতো, তবে আক্ষেপের বিষয় হলো এতে কোনো ব্যাকলাইট নেই। রাতের অন্ধকারে টাইপ করতে একটু সমস্যা হতে পারে।

ব্যাটারির দিক থেকে ল্যাপটপটি মোবাইল চিপ ব্যবহারের পুরো ফায়দা লুটেছে। আইফোনের চিপ হওয়ায় এটি প্রচণ্ড বিদ্যুৎসাশ্রয়ী। লেখালেখি, ব্রাউজিং বা ভিডিও দেখার মতো সাধারণ কাজে এটি প্রায় সারাদিন ব্যাকআপ দিতে পারে। বক্সের ভেতরে একটি ২০ ওয়াটের চার্জার দেওয়া থাকে, যা দিয়ে শূন্য থেকে ফুল চার্জ হতে এক ঘণ্টার একটু বেশি সময় লাগে।


ল্যাপটপটি কাদের জন্য?

  • স্টুডেন্ট: গ্লোবাল মার্কেটে এটি স্টুডেন্টদের জন্য ‘এ-প্লাস’ অপশন হলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টা একটু ভিন্ন। ৮৮ হাজার টাকা একজন স্টুডেন্টের জন্য অনেক বড় একটি অ্যামাউন্ট, আর যেহেতু কোনো স্টুডেন্ট ডিসকাউন্ট নেই, তাই পকেটে ভালো টান পড়বে। তবে আপনার বাজেট যদি এই রেঞ্জে থাকে এবং পড়াশোনার পাশাপাশি টুকটাক কাজ করার জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী ও স্টাইলিশ ল্যাপটপ চান, তবে ম্যাকবুকের দুনিয়ায় ঢোকার জন্য এটি দারুণ একটি এন্ট্রি-লেভেল মেশিন।
  • রাইটার বা লেখক: লেখালেখি, ইমেইল বা ওয়েব ব্রাউজিংয়ের জন্য এটি পারফেক্ট। দামি ম্যাকবুকের কিবোর্ড থাকায় টাইপিং করে আপনি দারুণ আরাম পাবেন।
  • ফটোগ্রাফার ও কোডার: হালকা কোডিং এবং ফটোশপ বা লাইটরুমের মতো কাজ এতে অনায়াসেই করা যাবে। তবে প্রফেশনাল কালার গ্রেডিংয়ের জন্য এর ডিসপ্লে খুব একটা পারফেক্ট নয়, সেক্ষেত্রে ভালো একটি এক্সটারনাল মনিটর কানেক্ট করে নিতে হবে।
  • ভিডিও এডিটর: বেসিক ৪কে (4K) ভিডিও এডিট করা, কাটছাঁট করা বা ক্যাপকাটের (Capcut) মতো মোবাইল ভিডিও এডিটরের কাজগুলো এতে খুব সুন্দরভাবে করা যায়। তবে ভারী প্লাগিন বা প্রফেশনাল এডিটিংয়ের জন্য এটি নয়।
  • গেমার: ৬০ হার্জ ডিসপ্লে, কম র‍্যাম এবং ম্যাক ওএসের কারণে গেমারদের এই ল্যাপটপ থেকে ১০০ হাত দূরে থাকাই ভালো।

শেষ কথা

অ্যাপলের জন্য আইফোনের প্রসেসর দিয়ে এই ল্যাপটপটি তৈরি করা ছিল দারুণ একটি ব্যবসায়িক কৌশল। বাংলাদেশের বাজারে দামটা গ্লোবাল প্রাইসের তুলনায় একটু বেশি মনে হলেও, ৮৭-৮৮ হাজার টাকার মধ্যে আপনি অ্যাপল ইকোসিস্টেমের যে প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স পাচ্ছেন, তা অন্য কোনো ব্র্যান্ড দিতে পারবে না। স্টুডেন্ট ডিসকাউন্ট না থাকার আক্ষেপটা হয়তো থেকেই যাবে, তবে মোবাইল গতির প্রসেসর দিয়ে সারাদিন চার্জের চিন্তা ছাড়া ল্যাপটপ চালাতে চাইলে, এটি চোখ বন্ধ করে আপনার উইশলিস্টে রাখতে পারেন।