আমরা সবাই জানি, একদিন এই পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন—কিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনটি শুরু হবে কীভাবে? প্রথমে কী ঘটবে?

আজ আমরা পৃথিবীতে ব্যস্ত। কেউ টাকা উপার্জন করছি, কেউ ঘর বানাচ্ছি, কেউ ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছি। কিন্তু এমন একটি দিন আসবে, যেদিন এসব কিছুই আর থাকবে না। কুরআন আমাদের সেই দিনের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী, কিয়ামতের সূচনার অন্যতম প্রধান ঘটনা হলো শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন, যখন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে, তখন আসমান ও জমিনে যারা আছে তারা অচেতন হয়ে পড়বে বা মৃত্যুবরণ করবে—আল্লাহ যাদের ইচ্ছা করেন তারা ব্যতিক্রম। এরপর আবার শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে, তখন সবাই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকবে।

—সূরা আয-যুমার: ৬৮

অর্থাৎ কিয়ামতের ঘটনাগুলো এক মুহূর্তে আমাদের পরিচিত পৃথিবীকে সম্পূর্ণ বদলে দেবে।

পৃথিবী তখন কেমন হবে?

কুরআনে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনের বিভিন্ন ভয়াবহ দৃশ্য বর্ণনা করেছেন।

পাহাড়, যেগুলোকে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত ও স্থির জিনিস মনে করি, সেগুলোও তখন স্থির থাকবে না।

আল্লাহ বলেন, “যেদিন আমি পাহাড়গুলোকে চালিয়ে দেব এবং তুমি জমিনকে উন্মুক্ত দেখতে পাবে।”

—সূরা আল-কাহফ: ৪৭

আর অন্য জায়গায় আল্লাহ বলেন, পাহাড়গুলো তখন ধুনিত পশমের মতো হয়ে যাবে।

—সূরা আল-ক্বারিআহ: ৫

যে পৃথিবীকে আজ এত শক্ত মনে হচ্ছে, সেই পৃথিবীরই একদিন এমন অবস্থা হবে।

সূর্য, চাঁদ ও আকাশের কী হবে?

কুরআনে কিয়ামতের দিনের এমন কিছু দৃশ্যও এসেছে, যা শুনলে মানুষের অন্তর কেঁপে ওঠে।

আল্লাহ বলেন, “যখন সূর্যকে গুটিয়ে নেওয়া হবে।”

—সূরা আত-তাকভীর: ১

আর বলা হয়েছে, যখন নক্ষত্রগুলো ঝরে পড়বে।

—সূরা আত-তাকভীর: ২

অর্থাৎ আমরা যে আকাশকে প্রতিদিন দেখি, কিয়ামতের দিন সেই পরিচিত আকাশ আর আগের মতো থাকবে না।

সেদিন মানুষের অবস্থা কেমন হবে?

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—সেদিন মানুষ নিজের অবস্থার ব্যাপারে এতটাই চিন্তিত থাকবে যে কাছের মানুষকেও ভুলে যাবে।

আল্লাহ বলেন, সেদিন মানুষ তার ভাই, মা, বাবা, স্ত্রী ও সন্তান থেকে পালিয়ে যাবে।

—সূরা আবাসা: ৩৪–৩৭

কেন?

কারণ প্রত্যেক মানুষ নিজের হিসাব নিয়ে ব্যস্ত থাকবে।

আজ আমরা অন্যের ভুল নিয়ে কথা বলি, অন্যের জীবন নিয়ে চিন্তা করি। কিন্তু সেই দিন প্রত্যেকেই ভাববে—আমার আমলনামায় কী আছে? আমার হিসাব কী হবে? আমার পরিণতি কোথায়?

এরপর শুরু হবে হিসাব-নিকাশ

কিয়ামতের দিন শুধু মানুষকে জীবিত করেই ছেড়ে দেওয়া হবে না। মানুষের দুনিয়ার কাজের হিসাব নেওয়া হবে।

আল্লাহ বলেন,

“অতএব যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, সেও তা দেখতে পাবে।”

—সূরা আয-যিলযাল: ৭–৮

ভাবুন তো, আমরা এমন কত ছোট কাজ করি যেগুলোকে নিজের কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না।

একটু ভালো কথা বলা, কাউকে সাহায্য করা, কারও কষ্ট দূর করা—এসবও হয়তো আল্লাহর কাছে মূল্যবান হয়ে থাকবে।

আবার কারও মনে কষ্ট দেওয়া, অন্যায় করা, গোপনে গুনাহ করা—এসবও আমাদের আমলনামায় থাকতে পারে।

তাহলে আমাদের এখন কী করা উচিত?

কিয়ামতের দিন কখন আসবে, সেটা আমরা জানি না। কিন্তু কিয়ামত আসবে—এটা ইসলামের অকাট্য বিশ্বাস।

তাই কিয়ামতের ভয় পাওয়ার পাশাপাশি আমাদের প্রস্তুত হওয়া দরকার।

নামাজ ঠিক করা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা, মানুষের হক নষ্ট না করা, বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, গুনাহ হলে তওবা করা এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসা—এসবই আমাদের প্রস্তুতির অংশ।

কারণ মৃত্যুর পর আর আমল করার সুযোগ থাকবে না। সুযোগ আছে শুধু এখন।

আজ আমরা যেভাবে জীবন কাটাচ্ছি, একদিন সেই জীবনই আমাদের সামনে হিসাব হিসেবে উপস্থিত হবে।

তাই কিয়ামতের দিনের কথা শুনে শুধু ভয় পাওয়ার জন্য নয়, নিজেকে পরিবর্তন করার জন্যও এই কথাগুলো মনে রাখা দরকার।

হয়তো আজকের দিনটি আমাদের জীবনের সাধারণ একটি দিন। কিন্তু আমরা জানি না, আমাদের জীবনের শেষ দিন কোনটি।

কিয়ামত কখন আসবে সেটা আমাদের জানা নেই, কিন্তু সেই দিনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ আমাদের হাতে এখনো আছে।

আল্লাহ আমাদের ঈমানের সঙ্গে জীবন কাটানোর তাওফিক দিন, গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখুন এবং কিয়ামতের কঠিন দিনে আমাদের ওপর রহমত করুন। আমিন।