Welcome to TrickBD!
আপনি কি কখনো শুনেছেন—মানুষ নাকি তার মস্তিষ্কের মাত্র ১০% ব্যবহার করে? আর বাকি ৯০% অংশ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে?
এই ধারণা এতটাই জনপ্রিয় যে সিনেমা, বই, মোটিভেশনাল বক্তব্য এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এটি বারবার উঠে আসে। অনেকে আবার মনে করেন, কোনোভাবে মস্তিষ্কের বাকি ৯০% ব্যবহার করতে পারলে মানুষ অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠতে পারবে!
কিন্তু সত্যিই কি আমাদের মস্তিষ্কের এত বড় একটি অংশ অব্যবহৃত থাকে?
বৈজ্ঞানিক উত্তর হলো—না! মানুষের মস্তিষ্কের মাত্র ১০% ব্যবহৃত হয়, এই ধারণাটি একটি বহুল প্রচলিত মিথ।
চলুন, বিষয়টি সহজভাবে বুঝে নেওয়া যাক।
১০% মস্তিষ্ক ব্যবহারের ধারণাটি কোথা থেকে এলো?
“মানুষ মস্তিষ্কের মাত্র ১০% ব্যবহার করে”—এই কথাটির নির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
ধারণাটি কীভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণা এই দাবিকে সমর্থন করে না।
মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের কাজ আলাদা। কোনো অংশ শরীরের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে, কোনো অংশ দৃষ্টি ও শ্রবণের সঙ্গে যুক্ত, আবার কোনো অংশ স্মৃতি, আবেগ, ভাষা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখে।
তাই মস্তিষ্কের সব অংশ একই মুহূর্তে সমানভাবে সক্রিয় না থাকলেও, তার মানে এই নয় যে সেগুলোর ৯০% কখনোই কাজে লাগে না।
তাহলে আমরা মস্তিষ্কের কতটুকু ব্যবহার করি?
এর উত্তর একটু ভিন্ন।
আমরা মস্তিষ্কের ঠিক কত শতাংশ ব্যবহার করি—এমন কোনো একক সংখ্যা দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় না।
কারণ মস্তিষ্কের কার্যক্রম নির্ভর করে আমরা কী করছি, কী ভাবছি এবং আমাদের শরীরের কী প্রয়োজন হচ্ছে তার ওপর।
যেমন:
🔹 আপনি যখন পড়ছেন: দৃষ্টি, ভাষা, মনোযোগ ও স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ কাজ করছে।
🔹 আপনি যখন হাঁটছেন: নড়াচড়া, ভারসাম্য ও শরীরের অবস্থান নিয়ন্ত্রণে মস্তিষ্কের একাধিক অংশ সক্রিয় হচ্ছে।
🔹 আপনি যখন ঘুমাচ্ছেন: মস্তিষ্ক বন্ধ হয়ে যায় না। ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ে মস্তিষ্কের কার্যক্রম চলতে থাকে।
অর্থাৎ, মস্তিষ্কের কাজ একটি নির্দিষ্ট ১০% অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বিজ্ঞান কী বলে?
মস্তিষ্কের কার্যক্রম বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এর মধ্যে রয়েছে:
১. fMRI (Functional Magnetic Resonance Imaging)
এই প্রযুক্তির সাহায্যে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা যায়।
২. PET Scan (Positron Emission Tomography)
এটি মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে বিপাকীয় কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
৩. মস্তিষ্কের ক্ষত বা আঘাত নিয়ে গবেষণা
মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানুষের স্মৃতি, ভাষা, চলাফেরা কিংবা অন্য কোনো দক্ষতায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটি দেখায় যে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তবে মনে রাখতে হবে, মস্তিষ্কের কোনো অংশ নির্দিষ্ট মুহূর্তে কম সক্রিয় থাকলেই সেটি অপ্রয়োজনীয়—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
তাহলে “বাকি ৯০% ব্যবহার করলে সুপারহিউম্যান হওয়া যাবে”—এটা কি সত্য?
না।
মস্তিষ্কের অব্যবহৃত ৯০% অংশকে কোনো সুইচের মতো চালু করে অসাধারণ ক্ষমতা অর্জন করা যাবে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
বাস্তবে মানুষের শেখার ক্ষমতা, স্মৃতি ও দক্ষতা উন্নত হতে পারে নিয়মিত অনুশীলন, পর্যাপ্ত ঘুম, মনোযোগ এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।
মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ানোর অর্থ মস্তিষ্কের কোনো লুকানো ৯০% অংশ চালু করা নয়; বরং মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখা এবং শেখার প্রক্রিয়াকে উন্নত করা।
মস্তিষ্ক সম্পর্কে আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য
আপনি যখন কোনো নতুন দক্ষতা শেখেন, তখন মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে সংযোগের শক্তি ও বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
এই পরিবর্তনশীল ক্ষমতাকে বলা হয় Neuroplasticity (নিউরোপ্লাস্টিসিটি)।
সহজ ভাষায়, অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের মাধ্যমে মস্তিষ্ক নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। এ কারণেই নিয়মিত অনুশীলন করে নতুন ভাষা শেখা, কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজানো কিংবা নতুন দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব।
তবে নিউরোপ্লাস্টিসিটি মানে এই নয় যে মস্তিষ্কের অসীম ক্ষমতা রয়েছে। বয়স, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অনুশীলনের মতো অনেক বিষয় শেখার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।
শেষ কথা
“মানুষ মস্তিষ্কের মাত্র ১০% ব্যবহার করে”—কথাটি শুনতে রোমাঞ্চকর হলেও এটি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
আমাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলোর কার্যক্রম পরিবর্তিত হয়।
তাই মস্তিষ্কের লুকানো ৯০% অংশ চালু করার চিন্তা না করে, বরং নিয়মিত শেখা, পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করাই বেশি কার্যকর।
আপনি কি আগে বিশ্বাস করতেন যে মানুষ তার মস্তিষ্কের মাত্র ১০% ব্যবহার করে? কমেন্টে আপনার মতামত জানাতে পারেন!
TrickBD-এর সঙ্গে থাকুন, জানুন প্রচলিত ধারণার আড়ালে থাকা আসল সত্য।