[হ্যাকিং লার্নিং – ০১] : হ্যাকিং কি? হ্যাকার কিভাবে হওয়ার যায়?
খুব সম্ভাবত হ্যাকিং লার্নিং সিরিজের সবচেয়ে এর বাজে লেখা হতে যাচ্ছে এটা কেননা শিরোনাম দেখেই অনেকের নাক মুখ কুচকে যাবে – এটা আবার কে না জানে? এসব তো সবাই জানে!
বাস্তবতা হলো আমরা অনেকেই হ্যাকিং এর আসল স্বরূপ জানি না – ইভেন অনেক লেজিট হ্যাকার যারা প্রফেশনালি হ্যাকিং করেন তারাও হয়তো আক্ষরিকভাবে হ্যাকিং এর আসল ডেফিনেটিভ রূপ রিয়েলাইজ করেন না।
হ্যাকিং কি?
যাই হউক প্রথাগত সংজ্ঞা’তে হ্যাকিং হলো “কারোর অনুমতি ছাড়া তার সিস্টেমে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করা কিংবা অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা”।
অন্যদিকে আক্ষরিক রিয়েলাইজেশান করতে পারেন এমন ডেফিনেশন হলো “যেকোন সিস্টেমে সেটা হতে পারে কম্পিউটার সিস্টেম বা ওয়েব সার্ভার অথবা কারোর ঘরের লক করা দরজা অথবা অন্যের ব্রেইন সেখানে আপনার আপন উদ্দেশ্য সফল করার জন্য যেসকল অল্টারনেটিং পদ্ধতি অবলম্বন করে এক্সেস করার চেষ্টা করেন সেটিই মূলত হ্যাকিং”।
হ্যাকার কতো প্রকার?
হ্যাকারদের কাজের উদ্দেশ্য এবং পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়:
১. এথিক্যাল ক্লাসিফিকেশন
(ক) হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার (White Hat Hacker) : এদেরকে ইথিক্যাল হ্যাকার (Ethical Hacker) বা নৈতিক হ্যাকার বলা হয়। এরা কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির অনুমতি নিয়ে তাদের সিস্টেমের নিরাপত্তা ত্রুটি খুঁজে বের করে এবং তা সমাধান করে। এদের লক্ষ্য থাকে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা এবং হ্যাকিং বিষয়টাকে ভালো কাজ বা কল্যানকর কাজে ব্যবহার করা।
(খ) ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার (Black Hat Hacker): এরা মূলত সাইবার অপরাধী যারা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে কোনো অনুমতি ছাড়াই সিস্টেমে প্রবেশ করে। এদের মূল উদ্দেশ্য থাকে ব্যক্তিগত বা আর্থিক লাভ, তথ্য চুরি, ব্ল্যাকমেইল বা সিস্টেমের ক্ষতি করা ইত্যাদি।
(গ) গ্রে হ্যাট হ্যাকার (Grey Hat Hacker): এরা হোয়াইট ও ব্ল্যাক হ্যাকারের মিশ্রণ। এরা কোনো অনুমতি ছাড়াই সিস্টেমে প্রবেশ করে (যা অবৈধ) তবে এদের উদ্দেশ্য সাধারণত ক্ষতিকর হয় না। এরা ত্রুটি খুঁজে পাওয়ার পর সিস্টেমের মালিককে জানায় এবং অনেক সময় বিনিময়ে অর্থ বা পুরস্কার দাবি করে। এদেরকে আপনি সরাসরি Black Hat Hacker বলতে পারেন না আবার White Hat Hacker হিসেবেও ক্লাসিফাইড করতে পারেন না – বরং তারা এই দুই শ্রেণীর ভেতরে থাকা এমন হ্যাকার যারা চাইলে ভালো কাজেও হ্যাকিং ব্যবহার করতে পারে আবার মন্দ কাজেও ইউটিলাইজ করতে পারেন।
২. অন্যান্য হ্যাকিং ক্লাসিফিকেশন
(ক) রেড হ্যাট হ্যাকার (Red Hat Hacker): এদেরকে হ্যাকিং জগতের “রবিন হুড” বা “রক্ষক” বলা যায়। এদের উদ্দেশ্য হোয়াইট হ্যাটের মতো হলেও কাজের পদ্ধতি ভিন্ন। এরা ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারদের আক্রমণ প্রতিহত করে এবং উল্টো ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারদের সিস্টেমে ঢুকে তাদের ডাউন বা ধ্বংস করে দেয়।
(খ) ব্লু হ্যাট হ্যাকার (Blue Hat Hacker): কোনো সফটওয়্যার বা সিস্টেম কমার্শিয়াল মার্কটে ছাড়ার আগে সেটির নিরাপত্তা পরীক্ষা করার জন্য এদের হায়ার করা হয়। সাধারণত বড় বড় টেক কোম্পানি (যেমন: মাইক্রোসফট) তাদের সিস্টেমের বাগ (Bug) বা ত্রুটি খোঁজার জন্য এদের নিয়োগ দেয়।
(গ) গ্রিন হ্যাট হ্যাকার (Green Hat Hacker): এরা মূলত শিক্ষানবিশ হ্যাকার। হ্যাকিং জগতে এরা একদম নতুন এবং শেখার জন্য প্রচুর আগ্রহ প্রকাশ করে। এরা বিভিন্ন ফোরাম বা অভিজ্ঞদের কাছ থেকে হ্যাকিংয়ের কৌশল শেখার চেষ্টা করে।
(ঘ) স্ক্রিপ্ট কিডি (Script Kiddie): এরা কোনো দক্ষ হ্যাকার নয় – এদের নিজেদের কোনো কোডিং বা হ্যাকিং জ্ঞান থাকে না। অন্য হ্যাকারদের তৈরি করা রেডিমেড টুলস বা স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করে এরা ছোটখাটো সাইট বা সিস্টেমে আক্রমণ করে কেবল মজা বা সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য।
(ঙ) হ্যাকটিভিস্ট (Hacktivist): রাজনৈতিক, সামাজিক বা ধর্মীয় কোনো বিশেষ আদর্শ বা বার্তা প্রচারের জন্য এরা হ্যাকিং করে। কোনো সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক করে নিজেদের দাবি বা বার্তা ঝুলিয়ে দেওয়া এদের প্রধান কাজ – যাতে তারা তাদের মোটিভ মেসেজ রিচ করতে পারে।
(চ) ম্যালিসিয়াস ইনসাইডার (Malicious Insider/Whistleblower): এরা কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কর্মচারী বা বিশ্বস্ত ব্যক্তি হয়ে থাকে তবে ভেতরের শত্রু হিসেবে এরা প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্য বাইরে পাচার করে দেয় বা সিস্টেমের ক্ষতি করে।
(ছ) সাইবার টেররিস্ট (Cyber Terrorist): এরা অত্যন্ত বিপজ্জনক। দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো (যেমন: বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ব্যাংক, সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি) হ্যাক করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ বা আতঙ্ক ছড়ানো এদের মূল লক্ষ্য।
(জ) স্টেট/স্পনসর্ড হ্যাকার (State/Nation-Sponsored Hacker): এরা কোনো দেশের সরকার বা রাষ্ট্র দ্বারা নিযুক্ত হয়ে কাজ করে। অন্য শত্রু দেশের গোপন তথ্য চুরি করা, সামরিক বা অর্থনৈতিক ক্ষতি করার জন্য এদের ব্যবহার করা হয়।
হ্যাকার কিভাবে হওয়া যায়?
সাইবার ভার্চুয়াল জগতে সবচেয়ে কমন একটি ফ্যাক্ট হলো “হ্যাকার কিভাবে হওয়া যায়?”। আমরা প্রায় সবাই হ্যাকার হতে চাই – তবে সবচেয়ে বাস্তব সত্যটা হলো আমরা এমনিতেও “সবাই হ্যাকার”।
এই যেমন আপনি কাঁচা বাজারে কোন কিছু কিনতে গেলে একটু দাম কমাতে যেসব ট্রিক ব্যবহার করেন / আপনার প্রিয়জনের (প্রেমিক/প্রেমিকা) মান অভিমান ভাঙ্গাতে যেসকল প্রেমময়ী ট্রিক এপ্লাই করেন [সোস্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং] / যেকোন কাজে সাকসেস হতে আপনি যে শটকার্ট উপায় অবলম্বন করেন [প্রবলেম সলভিং] – তাতে আসলে বাস্তব জীবনে আমরা সবাই’ই আসলে এক একজন হ্যকার বৈকি। অন্যদিকে কম্পিউটার টেকনোলজিতে হ্যাকিং লার্নিং করার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত Skill সমূহ প্রয়োজন।
১. কম্পিউটার এবং নেটওয়ার্কের বেসিক জানুন :
(ক) অপারেটিং সিস্টেম (OS): উইন্ডোজের পাশাপাশি Linux (লিনাক্স) অপারেটিং সিস্টেমে দক্ষ হতে হবে কেননা সিংহভাগ হ্যাকারদের প্রধান পছন্দ লিনাক্স (যেমন: Kali Linux বা Parrot OS)।
(খ) কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং: হ্যাকিংয়ের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে নেটওয়ার্ক। তাই IP Address, Subnetting, DHCP, DNS, OSI Model, TCP/IP এবং বিভিন্ন Routing Protocol সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে এবং সেইসব ব্যবহার সম্পর্কে দক্ষতা থাকতে হবে।
২. প্রোগ্রামিং ভাষা লার্নিং
কোডিং না জেনে ভালো হ্যাকার হওয়া অসম্ভব তথাপি আপনাকে অবশ্যই প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ জানতে হবে :
(ক) Python (পাইথন): হ্যাকিং টুলস তৈরি এবং অটোমেশনের জন্য এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সহজ ভাষা।
(খ) JavaScript & HTML/CSS: ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন হ্যাকিং বা বাগ বাউন্টির জন্য এটি আবশ্যিক।
(গ) Bash Scripting: লিনাক্স টার্মিনালে কাজ দ্রুত করার জন্য প্রয়োজন।
(ঘ) C / C++: সিস্টেমের একদম ভেতরের (Low-level) ত্রুটি ও ম্যালওয়্যার বুঝতে সাহায্য করে।
৩. ডেটাবেস এবং সাইবার সিকিউরিটি :
(ক) SQL: ডেটাবেস কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে SQL Injection-এর মাধ্যমে ডেটাবেস হ্যাক করা হয় তা জানতে হবে।
৪. হ্যাকিং টুলস এবং ল্যাব প্র্যাকটিস :
(ক) টুলস ব্যবহার: Nmap (নেটওয়ার্ক স্ক্যানিং), Wireshark (প্যাকেট অ্যানালাইসিস), Metasploit (এক্সপ্লয়েটেশন) এবং Burp Suite (ওয়েব সিকিউরিটি)-এর মতো টুলস চালানো শিখুন।
(খ) প্র্যাকটিস (CTF): কখনোই অনুমতি ছাড়া কারও সিস্টেমে আক্রমণ না করে কেবল লার্নিং পারপাসে অনুশীলনের জন্য TryHackMe, Hack The Box অথবা PortSwigger Web Security Academy এর মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারেন।
এখন এতোসব টেকনিক, টোকনোলজি ও Skill সবকিছুর উর্দ্ধে যে বিষয়টি আপনাকে আয়ত্ত্ব করতে হবে সেটা হলো “লজিক ডেভেলপমেন্ট এবং প্রবলেম সলভিং মেন্টালিটি” যাতে একজন আদর্শ হ্যাকার হবে এমন যে কখনোই কোন সিস্টেমে এক্সেস কিংবা যেকোন টাস্ক বা সমস্যা’তে কখনোই বলতে পারবে না যে “পারি না / পারবো না / হয় না / অসম্ভব” ইত্যাদি।
একজন হ্যাকার হবে এমন যে কিনা তাকে যে টাস্ক বা চ্যালেঞ্জই দেওয়া হউক না কেন সে তাতে অবশ্যই সফল হবে। এটা কিন্তু মুভির মতো বাড়িয়ে বলা নয় বরং মূল বাস্তব সত্য এবং এটি একজন হ্যাকারের প্যাশান – এটি হ্যাকারের মন মস্তিষ্কে লজিক বিল্ডিং, প্রবলেম সলভিং, রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং এর দৃঢ় মেরিট থাকা আবশ্যক।
সকলের জন্যই শুভকামনা রইলো।
ওয়েব আমন্ত্রণ রইলো : PsychoTech
