আসসালামু আলাইকুম
আশা করি আপনারা সকলে ভালো আছেন। আজকে একটা ভিন্ন ধর্মী বিষয় নিয়ে আর্টিকেল লিখতে বসলাম। ফেসবুকে স্ক্রলিং করতে করতে ব্ল্যাক হোল জিনিসটা নিয়ে একটা পোস্ট সামনে পরে। তো সেই থেকে ভাবলাম ব্ল্যাক হোল নিয়ে একটা আর্টিকেল লিখি। ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে কম বেশি সবাই তো জানি। তবে বিজ্ঞানীদের মতে ব্ল্যাক হোল জিনিসটা আসলে কি? এটা নিয়ে সর্বশেষ আপডেট পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা যা যা ধারণা দিয়েছেন তা এই আর্টিকেলে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
ব্ল্যাক হোল কী?
ব্ল্যাক হোল (Black Hole) শুনলেই অনেকের মনে রহস্যময়, ভীতিকর এক জ্যোতিষ্কের ছবি ভেসে ওঠে। মহাবিশ্বে এমন কিছু বস্তু আছে, যাদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এতটাই প্রবল (বেশি) যে, আলো পর্যন্ত সেখান থেকে বের হতে পারে না, অথচ আলোর বেগ সব থেকে দ্রুতগামী বেগ বলা হয়। বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাক হোলকে মহাবিশ্বের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং রহস্যময় জ্যোতিষ্ক বলে থাকেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, “ব্ল্যাক হোলের ভেতরে আসলে কী আছে?” সেখানে কি অন্য কোনো জগৎ আছে? সেটা কি ফিজিক্সের সব নিয়ম মেনে চলে নাকি ফিজিক্সের সকল নিয়ম, সূত্র সেখানে ভেঙে পড়ে? বিজ্ঞানীদের সর্বশেষ ধারণা ও গবেষণার ভিত্তিতে আজকে আপনাদের সাথে সেগুলোই শেয়ার করবো।
[আর্টিকেল এর বাকি অংশে যাওয়ার আগে আপনাদের একটা বিষয় ক্লিয়ার করে দেই, ব্ল্যাক হোল সম্পর্কিত বেশিরভাগ তথ্যই বিজ্ঞানীরা ধারনার ভিত্তিতে দিয়েছে। কারণ এখন পর্যন্ত ব্ল্যাক হোলের কাছা কাছা না বিজ্ঞানীরা যেতে পেরেছেন না কোনো স্যাটেলাইট সেখানে পাঠাতে পেরেছেন। কেননা পৃথিবী থেকে সব থেকে কাছে যে ব্ল্যাক হোল আছে (Gaia BH1) সেটার দূরত্বই আনুমানিক ১৫৬০-১৬০০ আলোকবর্ষ।
অর্থাৎ আলোর গতিতে কোনো মহাকাশ যান করে সেখানে যেতে গেলেও ১৫৬০-১৬০০ বছর লাগবে। তবে যে তারা একদম যা-তা তথ্য দিয়েছে তা নয়। বিভিন্ন তত্ব মেনেই তারা বিভিন্ন রকম মতবাদ দিয়েছে। তাই এমন হতে পারে তাদের তথ্যর মধ্য কিছু ঠিক, কিছু ভুল আছে। তবে, আমি চেষ্টা করবো যে থিওরি গুলো সবথেকে বেশি প্রচলিত সেগুলোই দেওয়ার।]
ব্ল্যাক হোলের জন্ম কিভাবে হয়?
যখন কোনো ম্যাসিভ স্টার (বিশালাকার নক্ষত্র) এর জ্বালানি ফুরিয়ে যায়, এবং নিজের ভরের জন্য ভেঙে পরে তখন এই ব্ল্যাক হোলের সৃষ্টি হয়। আর এই প্রক্রিয়াকে ‘গ্র্যাভিটেশনাল কোলাপ্স’ বলা হয়।
একটি তারার (নক্ষত্রের) মৃত্যুতে যদি কেন্দ্রীয় ভর অত্যন্ত বেশি হয়, তবে তা সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর ভেঙে গিয়ে ব্ল্যাক হোল তৈরি করে। ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রকে বলা হয় Singularity যেখানে মহাকর্ষ অসীম হয়ে যায় এবং পদার্থ বিদ্যার প্রচলিত নিয়ম কাজ করে না।
ব্ল্যাক হোলের অংশ
ব্ল্যাক হোলকে বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা, এটিকে কয়েকটি অংশে ভাগ করেছে। সেগুলো হলো–
1. Event Horizon (ইভেন্ট হোরাইজন): ব্ল্যাক হোলের চারপাশে একটি সীমারেখা থাকে, যেখান থেকে কোনো কিছুই আর ফিরে আসতে পারে না। এই সীমা রেখাকেই ইভেন্ট হোরাইজন বলা হয়।
2. Singularity (সিঙ্গুলারিটি): ব্ল্যাক হোলের একটি কেন্দ্রীয় বিন্দু থাকে, যেখানে পদার্থ অসীম ঘনত্বে সংকুচিত হয়ে থাকে। এটাকেই সিঙ্গুলারিটি বলে। বিজ্ঞানীদের ধারণা এখানে পদার্থ বিজ্ঞান এর সমস্ত নিয়ম অচল হয়ে যাবে।
3. Accretion Disk (এক্রেশন ডিস্ক): ব্ল্যাক হোলের চারপাশে ঘূর্ণায়মান গ্যাস ও ধূলিকণার চাকতিই হলো এক্রেশন ডিস্ক। এই অংশ অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং প্রচুর বিকিরণ ছড়ায়।
ব্ল্যাক হোলের ভেতরে কি আছে? বিজ্ঞানীদের সর্বশেষ ধারণা!
ব্ল্যাক হোল নিয়ে অনেক মতবাদ আছে। তবে আমি নিচে কিছু বেশি প্রচলিত আর ভরসা করার মতো কিছু মতবাদ সম্পর্কে আপনাদের জানাবো।
অসীম ঘনত্বের সিঙ্গুলারিটি
আইনস্টাইনের General Relativity তত্ত্ব অনুযায়ী, ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রে সব পদার্থ অসীম ঘনত্বে সংকুচিত হয়ে যায়, যাকে singularity বলা হয়। এখানে সময় ও স্থান দুটোই বিকৃত হয়ে যায়। অর্থাৎ ভেতরে প্রবেশ করলে পদার্থবিদ্যার পরিচিত সব সূত্র অচল হয়ে পড়ে।
অন্য জগত বা Wormhole-এর সম্ভাবনা
কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন ব্ল্যাক হোল হয়তো Wormhole বা স্পেস-টাইম টানেল এর পথ হতে পারে। অর্থাৎ, এর ভেতর দিয়ে অন্য মহাবিশ্ব বা দূরবর্তী স্থানে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এটি কেবলই তাত্ত্বিক ধারণা, বাস্তবে কোনো প্রমাণ নেই।
এখানে টাইম ট্রাভেল নিয়ে যেহেতু কথা উঠলো তাই আপনাদের আরো একটি বিষয় জানিয়ে দেই। বিখ্যাত বিজ্ঞানী ‘স্টিফেন হকিং’ এর নাম তো অবশ্যই শুনেছেন! একবার সে একটি পার্টির অর্গানাইজড করেন এবং সেই পার্টিতে কাউকে ইনভাইট দেন নি। কেননা তিনি এটা পরিক্ষা করতে চেয়েছিলেন যে ‘যদি ভবিষতে টাইম ট্রাভেল সম্ভব হয়, তাহলে কেউ না কেউ টাইম ট্রাভেল করে তার এই পার্টিতে আসবে।’
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তার সেই পার্টিতে কেউ আসে নি। এ থেকে তিনি মেনে নেন যে টাইম ট্রাভেল সম্ভব না। তবে অন্য কিছু বিজ্ঞানী এই ঘটনার পরেও টাইম ট্রাভেলে বিশ্বাস করেন। তারা আবার মনে করেন যে, “কেউ ইচ্ছা করেই টাইম ট্রাভেল করে সেই পার্টিতে যায় নি। কারণ সেখানে গেলে হয়তো সঠিক সময়ের আগেই টাইম ট্রাভেলের তথ্য বেড়িয়ে আসতো”
তবে এটাও শুধু ধারণা। যেহেতু এই আর্টিকেল এর মধ্য ট্রাইম ট্রাভেল বা টাইম স্পেস জিনিসটা আসলো তাই ভাবলাম আপনাদেরকে এটাও বলে দেই।
হোয়াইট হোলের ধারণা
কিছু গবেষক ধারণা দেন, ব্ল্যাক হোলের অপর প্রান্তে একটি White Hole থাকতে পারে। তারা মনে করেন, হোয়াইট হোল হলো এমন এক জ্যোতিষ্ক, যা পদার্থ ও আলোকে শোষণ না করে বরং বের করে দেয়। অর্থাৎ, ২নং থিওরি ওর মতে যেমন ব্ল্যাক হোল সব কিছু টেনে নিজের মধ্য নিয়ে নেয়। তেমনি হোয়াইট হোল সেটা বের করে দেয়। মানে একটা দরজার ওপেন প্রান্ত হলে আরেকটা এক্সিট প্রান্ত। তাই হোয়াইট হোলকে আবার ব্ল্যাক হোলের বিপরীত রূপ বলা হয়।
কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দৃষ্টিভঙ্গি
আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী সিঙ্গুলারিটিতে পদার্থ অসীম ঘনত্বে পৌঁছায়। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলছে, প্রকৃতপক্ষে এমন “অসীম” কিছু সম্ভব নয়। হয়তো ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রে কোনো অজানা পদার্থ বা শক্তি লুকিয়ে আছে, যেটিকে আমরা এখনো আবিষ্কার করতে পারিনি।
তথ্য হারানোর প্যারাডক্স
ব্ল্যাক হোলের আরেকটি রহস্য হলো Information Paradox। কোনো বস্তু ব্ল্যাক হোলে ঢুকলে কি তার সমস্ত তথ্য (আকার, উপাদান, বৈশিষ্ট্য) চিরতরে হারিয়ে যায়? আইনস্টাইন মনে করতেন তথ্য হারিয়ে যায়। কিন্তু হকিং পরে বলেন, তথ্য আসলে হারায় না, বরং বিকিরণের (Hawking Radiation) মাধ্যমে তা বাইরে চলে আসে।
আইনস্টাইন আর স্টিফেন এর এই এই বিতর্ক এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
ব্ল্যাক হোলের ভেতরে গেলে কী হবে?
এবার আসুন কিছুটা কাল্পনিক ভাবে কল্পনা করা যাক। ধরুন কোনো মানুষ ব্ল্যাক হোলে প্রবেশ করলো, তাহলে কী হবে?
Spaghettification Effect: ব্ল্যাক হোলের তীব্র মাধ্যাকর্ষণের কারণে দেহ প্রসারিত হয়ে এক ধরনের “স্প্যাগেটি” আকৃতি নেবে। আবার এই তীব্র মধ্যাকর্ষণের জন্য একটা দেহ পুরোপুরি আলাদাও হয়ে যেতে পারে।
সময় প্রসারণ (Time Dilation): বাইরে থেকে দেখা যাবে, মানুষটি ধীরে ধীরে স্থির হয়ে যাচ্ছে, কারণ ইভেন্ট হরাইজনের কাছে সময় ধীর হয়ে যায়। অর্থাৎ, আমরা ফোনে যেমন স্লো-মোশান ভিডিও দেখি, তেমন ঐ ঘটনা স্লো-মোশান এর মতো হয়ে যাবে। তবে এটা তখনই হবে যখন ভেতরে প্রবেশ করা ব্যাক্তির কাঠামো আর আমাদের কাঠামো আলাদা হবে।
অর্থাৎ, আমরা ধরুন ব্ল্যাক হোল থেকে দূরে আছি আর সে ব্ল্যাক হোলে প্রবেশ করলো। সেক্ষেত্রে এমন দেখার সম্ভাবনা আছে। আর আরও একটি তথ্য হলো ভেতরে ঢোকার পর আর কোনোভাবেই সে বাইরের জগতে ফিরে আসতে পারবে না।
সাম্প্রতিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ
২০১৯ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো Event Horizon Telescope (EHT) ব্যবহার করে একটি ব্ল্যাক হোলের ছবি তুলতে সক্ষম হন। ছবিতে M87 গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা বিশালাকার ব্ল্যাক হোলের ছায়া দেখা যায়। এটি ছিল মহাকাশ বিজ্ঞানে এক ঐতিহাসিক অর্জন।
পরে ২০২২ সালে আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে থাকা ব্ল্যাক হোল Sagittarius A এর ছবিও প্রকাশ করা হয়। এসব পর্যবেক্ষণ ব্ল্যাক হোল নিয়ে ধারণা আরও স্পষ্ট করেছে।
শেষ কথা
ব্ল্যাক হোল মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় জ্যোতিষ্ক। এর ভেতরে আসলে কী আছে, সে প্রশ্নের এখনো কোনো চূড়ান্ত উত্তর নেই। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ, হকিংয়ের রেডিয়েশন তত্ত্ব, কোয়ান্টাম মেকানিক্স সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা নানা ধারণা দিয়েছেন। তবে বাস্তব পর্যবেক্ষণ এখনো সীমিত।
হয়তো একদিন হয়তো প্রযুক্তি এত উন্নত হবে যে আমরা ব্ল্যাক হোলের ভেতরের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে পারব। ততদিন পর্যন্ত এটি রয়ে যাবে সবচেয়ে বড় কৌতূহলগুলোর একটি।
আজকের পোস্ট এই পর্যন্তই। আশা করবো আপনাদের সকলের ভালো লাগবে আর্টিকেল। দেখা হবে পরবর্তী কোনো আর্টিকেল এ। সে পর্যন্ত ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন।
