এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো শিক্ষার্থী ঢাকামুখী হচ্ছে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতির জন্য রাজধানীর কোচিং সেন্টারগুলোতে ভিড় বাড়ছে প্রতিদিন। কিন্তু এই ভর্তি কোচিং করতে আসলে কত টাকা খরচ হয়? একজন শিক্ষার্থীর পরিবারের জন্য এই বিষয়টি জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকায় ভর্তি কোচিংয়ের মোট খরচ কত?
সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করতে একজন শিক্ষার্থীর মোট খরচ ৬০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এই খরচের মধ্যে রয়েছে কোচিং ফি, থাকা-খাওয়ার খরচ, যাতায়াত ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়।
বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য এই খরচ কিছুটা ভিন্ন হয়। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের খরচ সাধারণত বেশি হয়, কারণ তাদের মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কোচিংয়ের ফি অন্যদের চেয়ে বেশি।
কোচিং ফি কত টাকা?
ঢাকার প্রধান কোচিং সেন্টারগুলোর ফি বিভিন্ন বিভাগের জন্য ভিন্ন। বর্তমানে কোচিং সেন্টারগুলো বিশেষ ছাড়ও দিচ্ছে:
মানবিক বিভাগের জন্য কোচিং ফি ১০ থেকে ১৮ হাজার টাকার মধ্যে। ইউনিএইড কোচিং সেন্টারে মানবিক শাখার কোর্স ফি মাত্র ৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে স্কলার্স কোচিং সেন্টারে ১৬ হাজার টাকা নির্ধারিত থাকলেও ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড় পাওয়া যাচ্ছে।
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য কোচিং ফি ১২ থেকে ১৮ হাজার টাকা। ইউসিসি কোচিংয়ে ১৮ হাজার টাকা নির্ধারিত থাকলেও ৩ হাজার টাকা ছাড়ে ১৫ হাজার টাকায় ভর্তি নেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞান বিভাগের জন্য সাধারণ কোচিং ফি ১৮ থেকে ২২ হাজার টাকা। উদ্ভাস কোচিংয়ে সাধারণ বিজ্ঞান কোর্সের ফি ২২ হাজার টাকা, তবে ডিসকাউন্টের সুবিধা রয়েছে।
মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং প্রস্তুতির জন্য কোচিং ফি সবচেয়ে বেশি – ২০ থেকে ২৪ হাজার টাকা। রেটিনা কোচিংয়ে মেডিকেল প্রস্তুতির জন্য ২৫ হাজার টাকা নির্ধারিত থাকলেও ছাড়ে এটি কমে যাচ্ছে।
নার্সিং কোর্সের জন্য কোচিং ফি ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। কর্নিয়া কোচিংয়ে বিএসসি ইন নার্সিং কোর্সের ফি ১৭ হাজার এবং ডিপ্লোমা কোর্সের জন্য ১৬ হাজার টাকা।
থাকা-খাওয়ার খরচ কত?
কোচিং ফির পর সবচেয়ে বড় খরচের খাত হলো আবাসন ও খাবার। ফার্মগেট এলাকার শিক্ষার্থীরা সাধারণত পান্থপথ, পূর্ব ও পশ্চিম রাজাবাজার, তেজতুরি বাজার এবং তেজকুনিপাড়ায় বাসা বা হোস্টেল ভাড়া নেন।
মেস পদ্ধতিতে সিট ভাড়া শুরু হয় সাড়ে তিন হাজার টাকা থেকে। সার্ভিস চার্জ, ইউটিলিটি বিল ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মাসে একজন শিক্ষার্থীর খরচ হয় সাড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। তিন বেলার খাবারের জন্য মাসে আরও ৩,৫০০ থেকে ৭,০০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়।
হোস্টেলে থাকা শিক্ষার্থীদের খরচও প্রায় একই। একজন শিক্ষার্থী জানান, তিন সিটের একটি রুমে খাবার ও অন্যান্য খরচসহ তার সিটভাড়া মাসে ৯ হাজার টাকা। সবমিলিয়ে থাকা-খাওয়ার খরচ গড়ে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে পড়ে প্রতি মাসে।
অন্যান্য খরচ কী কী?
কোচিং ও থাকা-খাওয়ার খরচের পাশাপাশি আরও কিছু অতিরিক্ত খরচ রয়েছে যা অনেকেই হিসাবে রাখেন না। এর মধ্যে রয়েছে:
বইপত্র ও ফটোকপির খরচ মাসে প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা। কোচিং সেন্টার থেকে দেওয়া লেকচার শিটের বাইরেও অতিরিক্ত বই ও প্র্যাকটিস সেট কিনতে হয়।
যাতায়াত খরচ মাসে ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা। এটি নির্ভর করে শিক্ষার্থী কোথায় থাকেন এবং কীভাবে যাতায়াত করেন তার উপর।
বাড়ি যাওয়া-আসার খরচ মাসে অন্তত একবার। জেলা ভেদে এই খরচ ৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
ভর্তি পরীক্ষার ফি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মোট ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা।
বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা
নীলফামারী থেকে আসা শিক্ষার্থী আকাশ মজুমদার জানান, “ফার্মগেটের একটি কোচিং সেন্টারে আমি ২২ হাজার টাকায় ভর্তি হয়েছি। মাসিক বাসাভাড়া ও খাবার খরচ মিলিয়ে ৪ থেকে ৫ মাসে প্রায় ৪০-৫০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। সবমিলিয়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা বাজেট রেখেছি।”
নোয়াখালী থেকে আসা শিক্ষার্থী আব্দুল ওয়াহিদ বলেন, “আমি ডিসকাউন্টে ১৬ হাজার টাকায় একটি কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছি। পান্থপথ এলাকায় মাসিক ৭ হাজার টাকার খরচে থাকছি। যাতায়াত, ভর্তি পরীক্ষার ফি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ যোগ করলে ৬০ হাজার টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।”
খরচ কমানোর উপায়
সরকারি হোস্টেল বা আত্মীয়ের বাড়িতে থাকতে পারলে থাকা-খাওয়ার খরচ অনেক কমে যায়। অনেক কোচিং সেন্টার বৃত্তি বা ছাড় দিয়ে থাকে মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য।
অনলাইন কোচিং ব্যবস্থা এখন অনেক উন্নত হয়েছে। এতে ঢাকায় না এসেও ভালো প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। গ্রুপ স্টাডি করলে বইপত্রের খরচও কমানো যায়।
অনেক শিক্ষার্থী পার্ট টাইম কাজ করে খরচ চালান। তবে এতে পড়াশোনায় ব্যাঘাত হতে পারে।
কোন কোচিং সেন্টার বেছে নেবেন?
ঢাকার প্রধান কোচিং সেন্টারগুলোর মধ্যে রয়েছে উদ্ভাস, ইউসিসি, ফোকাস, প্যারাগন, স্কলার্স, রেটিনা ইত্যাদি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিশেষত্ব ও সুবিধা রয়েছে।
বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্ভাস ও উন্মেষ বেশ জনপ্রিয়। মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষার জন্য ইউসিসি, ফোকাস ও প্যারাগন ভালো। নার্সিং প্রস্তুতির জন্য কর্নিয়া ও নিউরন কোচিং প্রসিদ্ধ।
আর্থিক পরিকল্পনা কীভাবে করবেন?
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ের জন্য অন্তত ৪-৫ মাস আগে থেকেই আর্থিক পরিকল্পনা করা উচিত। মোট খরচের ৭৫% আগে থেকেই জমা রাখা ভালো। বাকি ২৫% জরুরি প্রয়োজনের জন্য রাখুন।
অনেক পরিবার সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়ে বা ব্যাংক লোন নিয়ে এই খরচ মেটান। কিছু এলাকায় কমিউনিটি ফান্ড থেকেও সাহায্য পাওয়া যায়।
ভবিষ্যতে খরচ কেমন হতে পারে?
প্রতি বছরই কোচিং ফি কিছুটা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৫ সালে এই খরচ আরও ৫-১০% বাড়তে পারে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে থাকা-খাওয়ার খরচও বাড়ছে।
তবে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির ফলে অনেক শিক্ষার্থী এখন স্থানীয়ভাবেই ভালো প্রস্তুতি নিতে পারছেন। এতে ঢাকামুখী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে।
শেষ কথা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কোচিংয়ে ঢাকায় একজন শিক্ষার্থীর ৬০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। এই বিপুল অর্থ অনেক পরিবারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলেও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণের জন্য অনেকেই এই বিনিয়োগ করে থাকেন।
সঠিক পরিকল্পনা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে এই খরচ অনেকটাই কমানো সম্ভব। মেধা ও পরিশ্রমের পাশাপাশি সঠিক নির্দেশনা পেলে ভালো ফলাফল অর্জন করা যায়।
আরও পড়ুন: শিক্ষা সংক্রান্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও বিশ্লেষণের জন্য ভিজিট করুন porasonablog.com – এখানে পড়াশোনা, শিক্ষা তথ্য, ভর্তি তথ্য, সরকারি তথ্য, ফলাফল, স্কলারশিপ, অনার্স ও শিক্ষা নিউজ নিয়ে আরটিকেল পাবলিশ করা হয়ে থাকে।

