এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট পরিবর্তন করতে চান? চলুন বাস্তবতা জেনে নিই
প্রারম্ভিকতা
চলছে এসএসসি পরীক্ষা – কয়দিন পর হয়তো শেষ হয়েও যাবে। তবুও যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এক ভয়ংকর ব্যাধির জম্বি ভাইরাস আমাদের পিছু ছাড়বে না – সেটা হলো রেজাল্ট পরিবর্তন!
ভার্চুয়ালের সস্তা কমেন্ট বক্স কিংবা গ্রুপ অথবা পেইজের আড়ালে এইসব জম্বির একই জবানবন্দি যে “তারা চাইলেই যেকোন পরীক্ষার রেজাল্ট পরিবর্তন করতে পারেন – তাদের নাকি বোর্ডের সাথে কি জানি হেনতেন লিংক আর আপনজন থাকে” অথচ বাস্তব সত্যটা কি আমরা জানি?
অবশ্যই জানি – আর সেইসব জানার পরও তবুও ইচ্ছা করেই তাদের ফাঁদে কুড়ালের নিচে পা বাড়িয়ে দিই”।
এই বিষয়টাকে সহজভাবে শুধু বোকামী বলেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না কেননা প্রায় প্রতিবছরই রেজাল্ট আসার পূর্বে এমন সংবাদও নেহায়েত কম শোনা যায় যে “রেজাল্ট খারাপ বা ফেইল হওয়ার ভয়ে অমুক ছাত্র/ছাত্রী সুইসাইড করেছে”। এটা শুধুই যে নেহায়েত ভয় তা নয় বরং এটার সাথে শিক্ষা ব্যবস্থা, নামীদামী কলেজ এডমিশন আর মাতাপিতার “ভালো সন্তান” হিসেবে সামাজিকভাবে প্রমাণ করতে হয়!
আর এতোসব সামাজিক প্রতিবন্ধকতায় আসলেই যখন কারোর পরীক্ষা খারাপ হয় তখন এতোকিছু জানার পরও অবচেতন মনেই এসব ফাঁদে আটকে গিয়ে একটা রিলিফ খুঁজে – যদি সত্যি সত্যিই রেজাল্ট পরিবর্তন হয় এই আশাতে…
বাস্তবতা আসলে কি?
নাহ, শুধুই স্বান্তনামূলক “এসব ভুয়া” বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না বরং এটি ঠিক তখনই ব্রেইনে গেঁথে দেওয়া সম্ভব যখন “আক্ষরিকভাবেই কিভাবে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন ও রেজাল্ট আপডেট এবং পরীক্ষার খাতা পুনঃমূল্যায়ন করা হয় সেটি সম্পর্কে জানবেন”।
পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন
এটা আমাদের সকলেরই জানা (জানা থাকা উচিত) যে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে কোন শিক্ষার্থীর উত্তরপত্রে আদতে শিক্ষার্থীর নাম, রোল অথবা রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার থাকে না – যাতে খাতা মূল্যায়নকারী সরাসরি শিক্ষার্থীর পরিচয় জানতে পারেন। পরীক্ষার খাতায় মার্কিং করার সময় শিক্ষার্থীর রোল/রেজিঃ এর সাথে মিল রেখে একটি Exam Paper Code থাকে। পরবর্তীতে ঐ খাতা মূল্যায়ন করার পর টোটাল মার্ক’স কাউন্ট করে ঐ কোডের বিপরীতে OMR বেইজড সিস্টেমে নাম্বার শীট তৈরী করা হয়। এই শিট আরেকটি ধাপে প্রধান পরীক্ষক কর্তৃক ভেরিফাই করা হয় এবং এরপর সেটা সংশ্লিষ্ট ঐসব বোর্ড’তে [কোড ভিত্তিক ডিজিট সিস্টেম ইউনিট] পাঠানো হয় এবং এরপর ঐ শীট হতে রোল ও রেজিস্ট্রেশন নাম্বার এর বিপরীতে নাম্বার শীট হতে প্রাপ্ত নাম্বার ঐ খাতার কোড ম্যাচ করে কম্পিউটারে ডাটা এন্ট্রি করা হয়।
একটি মজার কথা এবং ফ্যাক্ট
একটা সময় দেখা যেতো কিছু শিক্ষার্থী পরীক্ষার খাতায় কিছু লিখতে না পেরে নানান আবেগী কথা লিখতো যেমন “প্লিজ স্যার দয়া করে পাশ করিয়ে দেন” অথবা এমন কথাও শোনা যায় যে খাতার সাথে টাকা স্ট্যাপলিং করে দেওয়া হতো – যদি কোনভাবে পাশ করিয়ে দেয়। শুনতে হাস্যকর মনে হলেও আদতে এটা কখনোই বাস্তবে সম্ভব হয়না। বিষয়টা মোটেও স্যার দয়া করে পাশ করিয়ে দেয় না এমনটা না বরং এমন নিয়মবিরুদ্ধ কিছু করলে যদি খাতা পুনঃমূল্যায়ন করা হয় (যাকে খাতা কল করা বলি অথবা রেজাল্ট চ্যালেঞ্জ করা) তখন কোন শিক্ষক হতে এই খাতা মূল্যায়িত হয়েছিলো সেটা আইডিয়েন্টিফাই হয়ে যায় তাই কেউই শিক্ষকতা ক্যারিয়ারে এমনটা করার সুযোগ কিংবা এখতিয়ার রাখে না। তবেও এটাও ঠিক যে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে অনেক সময় ব্যস্ততা বা তাড়াহুড়ো করায় ভুলভাবে নাম্বার মার্কিং/কর্তন হয় – এখানে অবশ্য শিক্ষকের মুডের এর বিষয় থাকে বৈকি (তবে যারা খাতা মূল্যায়ন করে তাদেরও আলাদা করে ট্রেইন করা হয় তাই তারা যথাসম্ভব নৈতিকতা নিয়েই ডেডিকেটেশন রেখেই খাতায় মার্কিং করেন)। আবার এটাও ঠিক যে অনেক সময় এক্সাম পেপার মূল্যায়নে শিক্ষক শর্টকাট করতে অন্যদের দিয়ে সেইসব খাতা মার্কিং করেন (ইভেন ছাত্র থাকা অবস্থায় একজন শিক্ষকের কোচিং পড়তে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সেই অভিজ্ঞতা আছে – তখনকার সময় ভালো লাগলেও এখন বুঝি সেটা অনুচিত ছিলো)।
এভারেইজ বলতে আসলে এমনভাবে খাতা মূল্যায়নে আবেগ ও ইমোশন এবং অনৈতিকতার উপায় যেমন থাকে না তেমনি সিংহভাগ শিক্ষক থাকেন ওয়েল ট্রেইনড এবং প্রফোশনের প্রতি ডেডিকেটেড।
এক্সাম পেপার হ্যাকস
লেখাটি একটু বড় হতে পারে কারন এখানে অপ্রাসঙ্গিক না হলেও বাড়তি একটি বাস্তব নির্ভর আইডিয়া দিচ্ছি ঠিক লাইফ হ্যাক’সের মতোই (নৈতিক না হলেও হয়তো বিপদের সময় কাজে আসতে পারে); এমন অনেক সময় হয় যখন কোন প্রশ্নের উত্তর জানা থাকার পরও পরীক্ষার হলে ঠিক মনে পড়ে না। আবার যেসব উত্তর পরীক্ষার্থীর জানা নেই সেইসব উত্তর সবার শেষে লেখেন।
এখন যখন সব মার্কের উত্তর দিয়ে আসা লাগে তখন এমন সংকটের সময়ে (১) শুরুতেই খাতাতে অধিকাংশ জানা উত্তর লেখার মাঝে এমন করে একটি/দুইটি ঐসকল প্রশ্নের উত্তর এমনভাবে কনফিডেন্টলি লেখা যাতে শেষের উত্তর ঠিক থাকে তাহলে দেখা যায় গড়পড়তা ঐ শুরুতে সঠিক উত্তরের ইমপ্রেশানে সেটাকেও সঠিক বলেই মার্কিং করা হয় [বলা বাহুল্য গণিতের অংক মেলানোর মতো নয় বরং ব্যাখ্যা ভিত্তিক উত্তরে]। ঐসব লেখাটিও সবখানে গোঁজামিল না করে শুধু একটা লজিক্যাল টুইস্ট রেখে উত্তরের সাথে মিলে যায় এমনভাবে লিখলে মাঝে মাঝে কাজ করে। এছাড়া যেসব শিক্ষক খাতা মূল্যায়ন করেন তারাও আসলে স্টুডেন্টদের এসব বিষয়ে এক্সপেরিয়েন্সড তাই কদাচিৎ এটা কাজ করতে পারে। (২) উত্তরপত্রে হাতের লেখা সুন্দর হলে সেটাতে বাড়তি করে শুধু হাতের লেখার জন্য নাম্বার দেওয়া হয় না এটা যেমন সত্য তেমনি সুন্দর হাতের লেখাতে শিক্ষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। বস্তুুত এই পৃথিবীতে আমরা সকলেই প্রকাশ্য – অপ্রকাশ্য সুন্দরের পূজারি তাই মোলায়েম দৃষ্টিনন্দন হাতের লেখাতে এমন অজানা উত্তর লজিকের সাথে মিল রেখে লেখার মাধ্যমে কখনো কখনো এমন হ্যাকিং কাজ করে বৈকি।
এনিওয়্যে এই বিষয়টা পুরোপুরিই সাইকোলজিক্যাল একটি ফ্যাক্ট।
যাই হউক বহু প্যাচাল করা হলো – মূল বিষয়ে ফেরা উচিত…
রেজাল্ট পরিবর্তন আদৌ কি সম্ভব?
এখন ঐসব পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে যে নাম্বার শীট কপি থাকে সেটা কম্পিউটারের এন্ট্রি করা হয়; যেখানে অপারেটর চাইলেই কারচুপি কিংবা কারোর পক্ষ হতে এক্সট্রা নাম্বার মোডিফাই করতে পারেন না কেননা Number Sheet এর ফাইনাল সাবমিশনের আগেই ক্রস চেক করতে স্ক্যানিং করা হয়।
হ্যা, এখানে এটাও উল্লেখ করতে হচ্ছে যে অসাধু বোর্ড কর্মকর্তা এমন সুযোগ নেওয়ার নজির আছে যে টাকার বিনিময়ে নিজেদের বিকিয়ে দেন তবে বিষয়টা এমন নয় যে কেউ চাইলেই বোর্ড এক্সাম এর রেজাল্ট পরিবর্তন করতে পারে।
আমরা আসলে যে রেজাল্ট দেখি (সকল অফিশিয়াল ও নন অফিশিয়াল সেক্টরে কারোর সার্টিফিকেট ও মার্ক শীট ভেরিফাই করতে) www.educationboardresults.gov.bd সেটার Server End এমন নয় যে সেখানেই সকল নাম্বার (প্রাপ্ত নাম্বার) ও গ্রেড ডাটাবেইজ আকারে স্টুডেন্ট বাই স্টুডেন্ট স্টোর করা থাকে – বরং এটি শুধুমাত্র এপিআই বেইজড ফেইচিং সিস্টেম [ফন্ট এন্ডে রেজাল্ট শো করে] এবং স্টুডেন্ট রেজাল্ট ডাটা প্রতিটি বোর্ডের স্বকীয় ওয়েব সার্ভারে সংরক্ষিত থাকে – সুতরাং এমন নয় যে আসলে চাইলেই যে কোন স্টুডেন্ট এর রেজাল্ট গভঃমেন্ট এডুকেশন রেজাল্ট বোর্ড সাইট হতে পরিবর্তন করা সম্ভব।
এনালাইসিস
অপরাপর এখানে বিষয়টি আক্ষরিকভাবে রিয়েলাইজ করার জন্য উদাহরণ হিসেবে বরিশাল বোর্ডের ওয়েবসাইট এনালাইসিস করা যেতে পারে [কোন অনৈতিক উদ্দেশ্য বা সার্ভার হতে তথ্য পরিবর্তন বা ক্ষতিসাধন উদ্দেশ্য নয়]; বরিশাল বোর্ডের অফিশিয়াল গভঃমেন্ট ওয়েব সার্ভার www.barisalboard.gov.bd যার এডমিন এক্সেস এরিয়া প্যাথ /admincp তে স্ব স্ব EIIN নাম্বার এবং পাসওয়ার্ড হতে এক্সেস করতে হয় >>> Super Administration Port >>> Result & Admit >>> Results (Selective Order -> Unit/Class) >>> Data Input Field; এখন এই বিষয়টা যেহেতু টিউটোরিয়াল নয় সুতরাং স্পেসিফিকশনের অবকাশ নেই; তদুপরি মূল সত্যটা যতোক্ষন না অবধি চাক্ষুষ হচ্ছে ততোদিন অবধি কি ঐসকল রেজাল্ট পরিবর্তনে ইচ্ছুক মানুষের ভ্রম কাটবে?!
যারপরনাই কিছু স্ক্রিন শেয়ার করা হলো – যেমন উদাহরণ হিসেবে যেসব সাবজেক্টে যারা ফেইল করেছেন তাদের এন্ট্রি করা টেবিল ডাটা কলাম ওয়াইজ স্পেসিফিকেশান [এই সংক্রান্ত TrickBD কমিউনিটির ইতিপূর্বের একটি প্রশ্ন উত্তর থ্রেডে সংযুক্ত ভিডিও মেনশন করে দিবো / এটাকে হাতে কলমে শেখানোর উদ্দেশ্য অন্তত আর্টিকেল’টি নয়]।
বাস্তবতা বিচার এবং উপলব্ধি
এখন একটি বিষয় আমাদের খুব ভালো ট্রিগার করে – যেটি স্পষ্ট করলে আমাদের মানসিকতার একটা স্বরূপ বুঝতে সহজ হবে। এই যে শুরু হতে পুরো বিষয়টি যথাসম্ভব বোঝানোর পরও এমনও কিছু মানুষ হয়তো থাকবেন যারা আদতেই টাস্ক অংশের এটাই মাথাতে গেঁথে নিবেন এবং এভাবে রেজাল্ট পরিবর্তন করার জন্য হয়তো উপযাচিত হতেও সংকোচ করবেন না।
দেখুন আপনি আপনার জীবন ও ক্যারিয়ার শুরু করছেন – সেই সুন্দর ক্যারিয়ারের আশাতে জীবনের একদম Root তথা মূলে কপটাতার আশ্রয় নিচ্ছেন; আপনার জীবনের বাদবাকি ভবিষ্যতের যা যা অর্জন সবকিছুই এই প্রাথমিক একটা রেজাল্ট এর ওপর বেইজ করেই; সুতরাং যদিও বাস্তবিকপক্ষে নানান অনৈতিকতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে রেজাল্ট পরিবর্তনের মতো সেল্ফ হিপোক্রেসি করেও থাকেন তাহলে সেটাতে গর্ব করার মতো কিছুই নেই বরং আফসোস এটাই যে আপনি নিজেই আপনার জীবন নিঃশেষ করে মিথ্যা স্বান্তনা’তে বাকি জীবনটাকে নষ্ট করলেন!
শেষ কথা
আপনার জীবনে আপনার বোর্ড এক্সাম যেমন SSC বা HSC যেটাই হউক না কেন সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ফ্যাক্ট – এটা এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ যে আপনার জীবনের ক্যারিয়ারের প্রাইম পার্ট। আপনি অবশ্যই আপনার রেজাল্ট এবং সার্টিফিকেট’কে গুরুত্ব দিন – সেই গুরুত্ব’টা যদি এমন হয় যে রেজাল্ট খারাপ বা ফেইল হলেও আপনি পরবর্তী বার সফলতার জন্য পড়াশোনা করেই গুরুত্ব দিবেন; হ্যাকিং করতে হলে সেটাও পড়াশোনার মাঝেই কিভাবে রেজাল্ট ভালো হতে বাধ্য সেটার এনালাইসিস করুন – মিথ্যা মোহে মরিচিকা যতোই আকাঙ্ক্ষিত হউক না কেন তাতে জীবনের স্বার্থকতা অন্তত থাকে না।
কি…? আপনি একটুও বুঝি উপলব্ধি করবেন না?!
নিরন্তর শুভকামনা ও ভালোবাসা রইলো
