Site icon Trickbd.com

চাকরি গেলে কি পুরুষের সম্মানও চলে যায়? আধুনিক সমাজের এক নগ্ন সত্য!

চাকরি গেলে কি পুরুষের সম্মানও চলে যায়? আধুনিক সমাজের এক নগ্ন সত্য!

চলুন আজ খুব খোলামেলা এবং একটু রূঢ় একটা সত্যি কথা বলি। ধরে নিচ্ছি, আপনি এই প্রজন্মের একজন মানুষ। আপনি ভীষণ বুদ্ধিমান, অনেক বই পড়েন, দেশ-বিদেশের খবর রাখেন। আপনি বাংলাদেশের নামিদামি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় (যেমন বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা আইবিএ) থেকে পড়াশোনা করেছেন। আপনার চিন্তাধারা খুব আধুনিক। খুব ভালো টাকা আয় করেন। আপনি সম্ভবত আপনার বোঝাপড়া এবং জ্ঞানের দিক থেকে দেশের সেরা ১% মানুষের মধ্যে পড়েন।

আপনার বন্ধু মহলেও নিশ্চয়ই এমন সব মানুষজন আছেন। যারা দেশের সেরা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি বা গ্লোবাল টেক ফার্মে কাজ করছেন। দারুণ শিক্ষাগত যোগ্যতা, দারুণ ক্যারিয়ার, আর দারুণ একটা জীবন।

কিন্তু এত আধুনিকতা আর এত প্রগতিশীল চিন্তাধারার পরও একটা জায়গায় এসে আমাদের সমাজের মুখোশটা খুলে যায়। আপনি যদি একজন পুরুষ হন, আর কোনো কারণে আপনি যদি বাড়িতে বসে থাকেন (যাকে আমরা হোম ড্যাড বলি) এবং আপনার স্ত্রী যদি সংসারের খরচ চালান, তবে কি সমাজ আপনাকে সম্মান করবে? সত্যি করে বুকের ওপর হাত দিয়ে বলুন তো!

পুরুষের মূল্য কি শুধুই তার মানিব্যাগে?

উত্তরটা আমরা সবাই জানি। না, সম্মান করবে না। হয়তো আপনার ডিগ্রির কারণে কেউ মুখের ওপর কিছু বলবে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আপনার কোনো দাম থাকবে না। আমরা নারী-পুরুষের সমঅধিকার নিয়ে যতোই গলা ফাটাই না কেন, আমাদের অবচেতন মন বা সোশ্যাল কন্ডিশনিং এমনভাবেই তৈরি যে, একজন পুরুষ যতোক্ষণ টাকা রোজগার করছে, ততোক্ষণই তার সম্মান আছে। টাকা রোজগার বন্ধ, তো সম্মানও শূন্য!

আপনি ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়েছেন কি না, বুয়েট থেকে গোল্ড মেডেল পেয়েছেন কি না এসব তখন আর কেউ মনে রাখবে না। আপনি যখন বেকার বসে থাকবেন, তখন আপনি সমাজের চোখে শুধুই একজন ‘নিকম্মা’ মানুষ।

আপনাদের একটা বাস্তব উদাহরণ দিই। আমার পরিচিত এক বড় ভাইয়ের গল্প। তিনি বুয়েট থেকে পাস করা একজন মেধাবী ইঞ্জিনিয়ার। পড়াশোনা শেষে আমেরিকায় কাজ করেছেন বেশ কয়েক বছর। তারপর দেশে ফিরে আসেন। ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নিজের উপার্জনের টাকায় একটা চমৎকার ফ্ল্যাট কিনেছেন। টেক ইন্ডাস্ট্রিতে তার ক্যারিয়ার বলতে গেলে রীতিমতো ‘রকস্টার’ পর্যায়ের। মাসে লাখ তিনেক টাকা বেতন পেতেন। জীবনের সব মানদণ্ডেই তিনি একজন সফল মানুষ।

কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে বিশ্বে টেক লে-অফ বা ছাঁটাইয়ের যে ঝড় বইছে, তার আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, স্টার্টআপগুলোতে ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইসিস আর এআই (AI) এর প্রভাবে দেশি-বিদেশি অনেক আইটি কোম্পানি কর্মী ছাঁটাই করছে। হুট করে একদিন সকালে একটা ইমেইল পেয়ে সেই বড় ভাই দেখলেন, তার চাকরিটা আর নেই।

তিনি আর্থিকভাবে অসচ্ছল নন। তার যা জমানো টাকা আছে, তা দিয়ে তিনি অনায়াসেই বেশ কয়েক বছর পার করে দিতে পারবেন। কিন্তু চাকরি যাওয়ার পর নিজের তৈরি করা বিলাসবহুল সেই বাড়িতে তার সাথে কী হচ্ছে জানেন?

একদিন বিকেলে ছেলে স্কুল থেকে ফিরেছে। বাবা একটু আদর করে ছেলেকে বললেন, “বাবা, চল একটু ভিডিও গেম খেলি।”
ছেলে উত্তর দিলো, “বাবা, আমার অনেক কাজ আছে। আমি স্কুলে যাই। আমি তো তোমার মতো বেকার বসে নেই!”

ভাবুন তো একবার! যে মানুষটা নিজের জীবনের সেরা সময়টা দিয়ে এই বাড়িটা বানিয়েছেন, ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাচ্ছেন, তাকে শুনতে হচ্ছে এই কথা।

সবচেয়ে আপন মানুষগুলোর কাছেই যখন মূল্যহীন…

গল্পটা এখানেই শেষ নয়। তার স্ত্রী অফিস থেকে ফিরে তাকে বলছেন, “আমাদের পাশের বিল্ডিংয়ের আট তলায় ৩২ বছরের একটা ছেলে নতুন স্টার্টআপ খুলেছে। তুমি বরং ওর কাছে গিয়ে যেকোনো একটা বেতনে চাকরিতে ঢুকে পড়ো।”

একবার কল্পনা করুন সেই লোকটার মানসিক অবস্থা বা ইগোর কথা। যে মানুষটা লাখ লাখ টাকা বেতন পেতো, তাকে তার স্ত্রী বলছে একজন জুনিয়রের আন্ডারে গিয়ে যেকোনো বেতনে কাজ শুরু করতে! পরের দিন হয়তো স্ত্রী আবার তাচ্ছিল্য করে বলছে, “বাসার বেসিনের পাইপটা নষ্ট, তুমি সারাদিন বাসায় বসে বসে করোটা কী?”

তিনি যখন লিফটে করে নিচে নামেন, তখন হয়তো প্রতিবেশী জিজ্ঞেস করেন, “ভাই, আপনার কি এখনও ব্রেক চলছে? একটা মুদির দোকান বা রেস্টুরেন্ট দিয়ে ফেলুন না, ভালোই তো চলবে!”

“ভাই, আমি যদি কোম্পানিতে কাজ করতে করতে একদিন হার্ট অ্যাটাকে মারা যেতাম, সেটাও আমার বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে অনেক ভালো হতো। প্রতিদিন আমার সম্মান ১% করে কমছে। আমার পরিবার আমাকে অসম্মান করছে, এমনকি নিজের চোখেও আমি নিজেকে ছোট মনে করছি। আর কতদিন চলবে এসব?”

এই কথাগুলো তিনি আমাকে বলেছিলেন কাঁদো কাঁদো গলায়। এই হলো আমাদের সমাজের আসল চেহারা। একটা মানুষের সারা জীবনের অর্জন, তার নিজের টাকায় বানানো বাড়ি সবকিছু একটা সাময়িক বেকারত্বের কাছে হেরে যায়।

দ্বৈত আয়ের সংসারে বৈষম্য

আরেকটা উদাহরণ দিই। আমার আরেক বন্ধুর গল্প। স্বামী-স্ত্রী দুজনই প্রায় সমান আয় করতো। মাসে স্বামী হয়তো পেতো ৮০ হাজার, স্ত্রী পেতো ৭০ হাজার। ঢাকা শহরে তারা আলাদা বাসা নিয়ে বেশ সুখেই সংসার সাজিয়েছিল। দুজনেই সমানভাবে সংসারে কন্ট্রিবিউট করতো।

কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দায় দুজনেরই চাকরি চলে যায়। মজার ব্যাপার (নাকি মর্মান্তিক) হলো, গত চার মাস ধরে সমাজের সব তাচ্ছিল্য, সব বাঁকা কথা শুধু স্বামীকেই শুনতে হচ্ছে! সমাজ বলছে পুরুষটাই নিকম্মা। এমনকি যে স্ত্রী নিজেও চাকরি হারিয়েছেন, তিনিও স্বামীকে খোঁচা দিয়ে বলছেন, “তুমি কিছু একটা তো করো! বাসায় একটু তো টাকা আনো!” চাকরি দুজনেরই গেছে, কিন্তু ‘বেঁচে থাকার অধিকার’ যেন শুধু পুরুষটারই কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্যের নীরব মৃত্যু

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন ঘটনা ঘরে ঘরে ঘটছে। অনেক ফ্রিল্যান্সার, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বা কর্পোরেট চাকুরিজীবী আজ কাজ হারাচ্ছেন। মুদ্রাস্ফীতি আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে এমনিতেই মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। তার ওপর চাকরি হারানোর ভয় মানুষকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।

যখন চাকরি যায়, তখন সমাজের চেয়ে বেশি কষ্ট দেয় নিজের কাছের মানুষেরা। তখন একজন পুরুষ কার কাছে গিয়ে কাঁদবে? স্ত্রীর কাছে বলতে পারে না, সন্তানের কাছে সম্মান থাকে না, বাবা-মাও অনেক সময় হতাশ হয়ে কটু কথা শোনান। তখন ওই পুরুষটি হয়তো নিজের কষ্ট ঢাকতে ‘চ্যাট জিপিটি’ (ChatGPT)-র সাথে কথা বলে! কারণ অন্তত সে কোনো বিচার বা তাচ্ছিল্য ছাড়া কথাটা শোনে।

এই নিঃসঙ্গতা থেকেই কিন্তু পুরুষেরা খারাপ অভ্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কেউ নেশাগ্রস্ত হয়, কেউ জুয়ায় জড়ায়। আর যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন অনেকেই আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নেয়। ম্যালকম গ্ল্যাডওয়েলের ‘দ্য টিপিং পয়েন্ট’ বইয়ে একটা তত্ত্ব আছে। সমাজে যখন এমন হতাশা বিরাজ করে, তখন একজন যদি আত্মহত্যা করে বা ডিভোর্সের মতো চরম সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তাকে দেখে আশপাশের অনেকেই একই পথ অনুসরণ করতে শুরু করে। এটা একটা নীরব মহামারির মতো।

পরিবারের প্রতি একটি বিনীত অনুরোধ

আমার এই লেখাটি যারা পড়ছেন, তাদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ। আপনার পরিবারের কোনো পুরুষ সে আপনার বাবা, স্বামী, ভাই বা সন্তান যেই হোক না কেন, সে যদি এই মুহূর্তে চাকরি হারিয়ে বা ব্যবসার ক্ষতি হয়ে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যায়, দয়া করে তার প্রতি একটু সদয় হোন।

সে মানুষটা এমনিতেই নিজের ভেতরে হাজারটা যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত। তাকে আর নতুন করে আঘাত করবেন না। তাকে একটু মানসিক শান্তি দিন। তাকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিন। তাকে অন্তত একটা বছর সময় দিন। বিশ্বাস করুন, যে মানুষটা জীবনে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছিল, সে আবারও ঘুরে দাঁড়াবে। শুধু তাকে এই কঠিন সময়ে খোঁটা দেবেন না।

আর যদি কোনো শিশু এই লেখাটি পড়ে থাকো, তবে তোমার বাবাকে কখনো কটু কথা বলো না। তুমি যে ছাদের নিচে ঘুমাচ্ছো, যে স্কুলে পড়ছো সবকিছু ওই মানুষটারই রক্তপানি করা উপার্জনের ফসল। চাকরি হারালেই বাবার ভালোবাসা বা যোগ্যতা শেষ হয়ে যায় না।

পরিশেষে বলবো, শর্তহীন ভালোবাসা শুধু সিনেমার পর্দাতেই মানায় না, বাস্তবেও এর চর্চা শুরু করা উচিত। মানিব্যাগের ওজন দিয়ে মানুষকে বিচার করা বন্ধ হোক। কঠিন সময়ে একে অপরের হাতটা শক্ত করে ধরাই তো আসল পরিবারের কাজ, তাই নয় কি?

Exit mobile version