বাবা-মা—এই দুটি মানুষ পৃথিবীতে আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল নিয়ামত। একজন সন্তান পৃথিবীতে আসার আগেই মা তাকে নিজের শরীরে ধারণ করেন, অসংখ্য কষ্ট সহ্য করেন। বাবা নিজের আরাম-আয়েশ ভুলে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য পরিশ্রম করেন। সন্তান যখন ছোট থাকে, তখন বাবা-মা তার প্রতিটি প্রয়োজন পূরণ করার চেষ্টা করেন। অথচ সেই সন্তান বড় হওয়ার পর অনেক সময় তাদের কথাই ভুলে যায়।
ইসলাম বাবা-মায়ের মর্যাদাকে অত্যন্ত উঁচুতে স্থান দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের নির্দেশ দেওয়ার পরই বাবা-মায়ের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআনে আল্লাহ বলেন, তাঁর ইবাদত করতে এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে।
বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান কেমন হওয়া উচিত, তা বোঝার জন্য নবীদের জীবনেও রয়েছে অসাধারণ শিক্ষা। এর মধ্যে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনের একটি ঘটনা আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
হজরত ইবরাহিম (আ.) যখন নিজের বাবাকে সত্যের পথে ডাকলেন
হজরত ইবরাহিম (আ.) এমন এক সমাজে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যেখানে মানুষ আল্লাহকে ছেড়ে মূর্তি পূজা করত। তাঁর পিতা ও তাঁর জাতির মানুষও মূর্তি পূজার সঙ্গে জড়িত ছিল।
কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ইবরাহিম (আ.) বুঝতে পেরেছিলেন—যে মূর্তি মানুষের কোনো উপকার করতে পারে না, কোনো ক্ষতি করতে পারে না, সে কখনো মানুষের রব হতে পারে না।
তিনি তাঁর বাবাকে সত্যের পথে আহ্বান করতে শুরু করলেন।
কিন্তু লক্ষ্য করুন, তিনি বাবাকে সত্যের পথে ডাকলেও অসম্মানজনক কোনো ভাষা ব্যবহার করেননি।
কুরআনে সূরা মারইয়ামে ইবরাহিম (আ.) তাঁর বাবাকে বারবার অত্যন্ত কোমলভাবে সম্বোধন করেছেন—
“হে আমার পিতা!”
তিনি বলেছিলেন, “হে আমার পিতা, আপনি কেন এমন জিনিসের ইবাদত করেন, যা শুনতে পায় না, দেখতে পায় না এবং আপনার কোনো উপকার করতে পারে ন
ইবরাহিম (আ.) জানতেন তাঁর বাবা ভুল পথে আছেন। কিন্তু তিনি বাবাকে গালাগালি করেননি, অপমান করেননি, চিৎকার করেননি। বরং ভালোবাসা ও কোমল ভাষায় সত্যের দিকে ডাক দিয়েছেন।
বাবা রাগ করলেও ইবরাহিম (আ.) অসম্মান করেননি
ইবরাহিম (আ.) যখন তাঁর বাবাকে মূর্তি পূজা ছেড়ে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকলেন, তাঁর বাবা এতে সন্তুষ্ট হননি।
বরং তাঁর বাবা তাকে ভয় দেখালেন এবং বললেন, সে যদি এসব থেকে বিরত না হয়, তাহলে তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হবে এবং তাকে দূরে চলে যেতে বলা হলো।
একজন সন্তানের জন্য এমন কথা শোনা কতটা কষ্টের হতে পারে, তা আমরা সহজেই বুঝতে পারি।
কিন্তু ইবরাহিম (আ.) তখনও বাবার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেননি।
তিনি বলেছিলেন—
“আপনার প্রতি সালাম। আমি আপনার জন্য আমার রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করব।
বাবা তাঁর কথা গ্রহণ করেননি। বাবা তাঁর বিশ্বাসের বিরোধিতা করেছেন। এমনকি কঠিন হুমকিও দিয়েছেন। তারপরও ইবরাহিম (আ.) বাবার সঙ্গে অশালীন আচরণ করেননি।
এটাই নবীদের চরিত্র।
বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় আমাদের কী শেখা উচিত?
আজ আমরা সামান্য কথায় বাবা-মায়ের সঙ্গে রাগ করি।
মা একটু বেশি কথা বললে বিরক্ত হয়ে যাই।
বাবা কোনো বিষয়ে নিষেধ করলে বলি, “আপনি চুপ করেন!”
কখনো বাবা-মায়ের সামনে বিরক্তির শব্দ করি।
কখনো তাদের ফোন ধরতে বিরক্ত হই।
কখনো তারা একই কথা বারবার বললে বিরক্ত হয়ে যাই।
কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখি—এই মানুষগুলো আমাদের জন্য কত কিছু করেছেন?
যে মা নিজের ঘুম বিসর্জন দিয়ে আমাদের রাত জেগে বড় করেছেন, বয়স হলে সেই মায়ের একটি কথা শুনতে আমাদের এত কষ্ট কেন?
যে বাবা নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়ে সন্তানের প্রয়োজন পূরণ করেছেন, বৃদ্ধ বয়সে সেই বাবার দেখাশোনা করতে আমাদের কেন বিরক্তি লাগে?
ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, বাবা-মায়ের সঙ্গে এমনকি “উফ” শব্দটিও বলা যাবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন, তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তাহলে তাদের ‘উফ’ পর্যন্ত বলবে না এবং তাদের ধমক দেবে না; বরং সম্মানের সঙ্গে কথা বলবে।
মায়ের কষ্টের কথা একটু ভাবুন
একজন মা যখন সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন, তখন তাঁর শরীরের ওপর কতটা চাপ পড়ে—সেটা সন্তান কখনো পুরোপুরি বুঝতে পারে না।
সন্তান জন্মের পর রাতের পর রাত মা জেগে থাকেন।
সন্তান অসুস্থ হলে মা ঘুমাতে পারেন না।
সন্তান ক্ষুধার্ত হলে মা চিন্তা করেন।
সন্তান একটু দেরি করে বাড়ি ফিরলে মায়ের মন অস্থির হয়ে যায়।
সন্তান বড় হয়ে নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে যায়। কিন্তু মা তখনও সন্তানের খবরের অপেক্ষায় থাকেন।
মায়ের কাছে সন্তান যত বড়ই হোক, সে যেন এখনও সেই ছোট্ট শিশুটিই।
আর বাবার ভালোবাসাও অনেক সময় নীরব হয়।
বাবা হয়তো মুখে বলেন না, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজের ঘাম ঝরান।
নিজের শখ বাদ দেন।
নিজের আরাম কমিয়ে সন্তানের পড়াশোনা, খাবার, পোশাক ও প্রয়োজনের ব্যবস্থা করেন।
অনেক বাবা নিজের কষ্ট সন্তানকে বুঝতেও দেন না।
বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো আচরণ শুধু টাকা দেওয়া নয়
অনেকে মনে করেন, বাবা-মাকে টাকা দিলেই দায়িত্ব শেষ।
কিন্তু বাবা-মায়ের হক শুধু অর্থ দিয়ে পূরণ হয় না।
তাদের সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলা, তাদের খোঁজ নেওয়া, অসুস্থ হলে পাশে থাকা, প্রয়োজনের সময় সাহায্য করা, তাদের মন না ভাঙা—এসবও সন্তানের দায়িত্ব।
আপনি যদি দূরে থাকেন, তাহলে ফোন করে জিজ্ঞেস করুন—
“মা, তুমি কেমন আছো?”
“বাবা, শরীর কেমন?”
বিশ্বাস করুন, এই ছোট্ট কথাগুলো একজন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছে অনেক বড় আনন্দ হতে পারে।
তাদের হয়তো আপনার কাছ থেকে দামি কোনো উপহার দরকার নেই।
তারা হয়তো শুধু চায়—তাদের সন্তান তাদের মনে রেখেছে।
বাবা-মা বৃদ্ধ হলে তাদের বেশি প্রয়োজন আমাদের
যখন বাবা-মা বৃদ্ধ হয়ে যান, তখন তাঁদের শরীর দুর্বল হতে থাকে।
আগের মতো হাঁটতে পারেন না।
আগের মতো কাজ করতে পারেন না।
একই কথা বারবার বলতে পারেন।
অনেক সময় ছোটখাটো বিষয়ও ভুলে যেতে পারেন।
এই সময় তাদের নিয়ে বিরক্ত হওয়া নয়, বরং তাদের যত্ন নেওয়া উচিত।
কারণ একসময় আমরাও এমন ছিলাম।
আমরা যখন নিজের হাতে খাবার খেতে পারতাম না, তখন মা আমাদের খাইয়েছেন।
আমরা যখন হাঁটতে পারতাম না, বাবা-মা আমাদের হাত ধরে হাঁটিয়েছেন।
আমরা যখন কথা বলতে পারতাম না, তারা আমাদের কান্নার ভাষা বুঝেছেন।
আজ তারা দুর্বল।
আজ তাদের হাত কাঁপে।
আজ তাদের হাঁটতে কষ্ট হয়।
তাই আজ আমাদের উচিত তাদের হাত শক্ত করে ধরে পাশে দাঁড়ানো।
বাবা-মায়ের দোয়া সন্তানের জন্য কত মূল্যবান!
একজন সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের দোয়া অনেক বড় নিয়ামত।
তাই তাদের মন কষ্ট না দিয়ে তাদের কাছ থেকে দোয়া নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
বাবা-মা জীবিত থাকলে তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করুন।
তাদের সামনে বসুন।
তাদের কথা শুনুন।
তাদের প্রয়োজন বুঝুন।
তাদের জন্য দোয়া করুন।
আর যদি বাবা-মায়ের কেউ মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে হতাশ হওয়ার দরকার নেই। তাদের জন্য দোয়া করা, ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং তাদের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো নেক কাজ করা যেতে পারে।
বাবা-মায়ের অবাধ্যতা থেকে বাঁচুন
ইসলামে বাবা-মায়ের অবাধ্য হওয়া অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বাবা-মা যদি আল্লাহর অবাধ্য কোনো কাজ করতে বলেন, তাহলে সেই কাজ করতে হবে। আল্লাহর অবাধ্যতার ক্ষেত্রে কারও আনুগত্য করা যায় না।
কিন্তু এমন অবস্থাতেও বাবা-মায়ের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করতে হবে।
হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ঘটনাটি আমাদের এই ভারসাম্য শেখায়।
তিনি বাবার ভুল বিশ্বাস মেনে নেননি, কিন্তু বাবাকে অসম্মানও করেননি।
তিনি সত্যের ওপর অটল থেকেছেন এবং একই সঙ্গে বাবার সঙ্গে কোমল আচরণ করেছেন।
আজই বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যান
প্রিয় ভাই ও বোন, যদি আপনার বাবা-মা এখনো জীবিত থাকেন, তাহলে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করুন।
কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুযোগগুলোর একটি আপনার সামনে এখনও আছে—বাবা-মায়ের সেবা করার সুযোগ।
আজ হয়তো আপনি ব্যস্ত।
হয়তো আপনার কাজ আছে।
হয়তো ব্যবসা আছে।
হয়তো সংসারের অনেক দায়িত্ব আছে।
কিন্তু দিনের কিছুটা সময় বাবা-মায়ের জন্য রাখুন।
মায়ের পাশে কিছুক্ষণ বসুন।
বাবার সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলুন।
তাদের কোনো প্রয়োজন আছে কি না জিজ্ঞেস করুন।
আর যদি কোনো কারণে তাদের সঙ্গে আপনার মনোমালিন্য হয়ে থাকে, তাহলে অহংকার করবেন না।
আপনিই আগে গিয়ে বলুন—
“মা, আমাকে মাফ করে দাও।”
“বাবা, আমার কোনো ভুল হয়ে থাকলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।”
হয়তো এই কয়েকটি কথাই আপনার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর কথাগুলোর মধ্যে একটি হয়ে থাকবে।

