আজকের কাহিনী এমন একজন নবীকে নিয়ে, যাঁর জীবনে পরীক্ষা এসেছিল একের পর এক। কিন্তু যত বড় পরীক্ষা এসেছে, তাঁর ঈমান ততই শক্ত হয়েছে।
তিনি হলেন আল্লাহর নবী হযরত ইবরাহিম (আ.)।
তাঁর সময়ের মানুষ আল্লাহকে ছেড়ে বিভিন্ন মূর্তি ও দেবতার উপাসনা করত। তারা নিজের হাতে পাথর দিয়ে মূর্তি বানাত, তারপর সেই মূর্তির সামনে মাথা নত করত।
ইবরাহিম (আ.) ছোটবেলা থেকেই এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতেন।
তিনি বুঝতে পারতেন, যে জিনিস নিজে কিছু দেখতে পারে না, শুনতে পারে না, কথা বলতে পারে না, নিজের কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না—সে কীভাবে মানুষের উপাস্য হতে পারে?
একদিন তিনি তাঁর জাতিকে বললেন,
“তোমরা এসব মূর্তির উপাসনা করছ কেন? তোমরা কি মনে করো, এগুলো তোমাদের কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে?”
কিন্তু তাঁর জাতি তাঁর কথা শুনল না।
বরং তারা তাদের পূর্বপুরুষদের দোহাই দিয়ে বলল, “আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের যেভাবে করতে দেখেছি, আমরাও সেভাবেই করছি।”
ইবরাহিম (আ.) তাদের বোঝাতে থাকলেন।
তিনি তাদের চিন্তা করতে বললেন। সত্যকে নিজের চোখে দেখতে বললেন।
কিন্তু মানুষ যখন কোনো ভুল বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে, তখন সত্য সামনে থাকলেও অনেক সময় তা মেনে নিতে চায় না।
এরপর ইবরাহিম (আ.) একদিন তাদের মূর্তিগুলোর অসারতা আরও স্পষ্ট করে দেখানোর জন্য একটি ঘটনা ঘটালেন।
তাঁর জাতির লোকেরা একটি উৎসবে বাইরে চলে গেল। ইবরাহিম (আ.) তাদের মূর্তিগুলোর কাছে গেলেন।
সেখানে বড় বড় অনেক মূর্তি ছিল।
তিনি তাদের উদ্দেশে বললেন, তোমরা কেন খাবার সামনে রাখার পর তা খাও না? তোমাদের কী হয়েছে যে তোমরা কথা বলো না?
কোনো উত্তর এল না।
তারপর ইবরাহিম (আ.) সেই মূর্তিগুলো ভেঙে ফেললেন। তবে বড় মূর্তিটিকে রেখে দিলেন।
লোকেরা ফিরে এসে যখন তাদের মূর্তিগুলো ভাঙা অবস্থায় দেখল, তখন তারা প্রচণ্ড রেগে গেল।
তারা বলল, “আমাদের উপাস্যদের সঙ্গে এমন কাজ কে করেছে?”
কেউ বলল, “ইবরাহিম নামের এক যুবকের কথা আমরা শুনেছি।”
তারপর ইবরাহিম (আ.)-কে মানুষের সামনে হাজির করা হলো।
তারা জিজ্ঞেস করল, “ইবরাহিম! তুমি কি আমাদের উপাস্যদের সঙ্গে এই কাজ করেছ?”
ইবরাহিম (আ.) তাদের এমন একটি প্রশ্ন করলেন, যা তাদের নিজেদের বিশ্বাসকেই তাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন।
তিনি বললেন, “বরং এই বড় মূর্তিটিই হয়তো কাজটি করেছে। তোমরা তাদের জিজ্ঞেস করো, যদি তারা কথা বলতে পারে।”
তখন তারা কিছুক্ষণ চুপ হয়ে গেল।
কারণ তারা জানত—এই মূর্তিগুলো কথা বলতে পারে না।
তারা নিজেরাই বুঝতে পারল, মূর্তিগুলো কোনো কথা বলতে পারে না, কোনো কাজ করতে পারে না, এমনকি নিজেদেরও রক্ষা করতে পারে না।
কিন্তু সত্য বুঝে যাওয়ার পরও তারা ঈমান আনল না।
বরং তারা নিজেদের অহংকারে আরও কঠোর হয়ে গেল।
তারা সিদ্ধান্ত নিল—
ইবরাহিমকে আগুনে পুড়িয়ে দিতে হবে।
তারপর শুরু হলো আগুন জ্বালানোর প্রস্তুতি।
অনেক কাঠ সংগ্রহ করা হলো। বিশাল আগুন জ্বালানো হলো। আগুন এত ভয়ংকর ছিল যে মানুষ তার কাছাকাছি যেতেও ভয় পাচ্ছিল।
এরপর ইবরাহিম (আ.)-কে সেই আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করা হলো।
মানুষের চোখে তখন আর কোনো আশা ছিল না।
তারা ভেবেছিল, এবার ইবরাহিম শেষ।
কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল—
আগুনও আল্লাহর সৃষ্টি।
আগুন নিজের ইচ্ছায় কাউকে পোড়ায় না। আল্লাহ চাইলে আগুন তার স্বাভাবিক কাজও করতে পারে না।
তখন আল্লাহ তাআলা আগুনকে নির্দেশ দিলেন—
“হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।”
তারপর কী হলো?
যে আগুন একজন মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে ছাই করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, সেই আগুনই ইবরাহিম (আ.)-এর কোনো ক্ষতি করতে পারল না।
আল্লাহ তাঁর নবীকে রক্ষা করলেন।
যারা তাঁকে শেষ হয়ে যেতে দেখার অপেক্ষায় ছিল, তারা অবাক হয়ে গেল।
ইবরাহিম (আ.) আগুন থেকে নিরাপদে বের হয়ে এলেন।
এই ঘটনাটি শুধু একটি আশ্চর্য ঘটনা নয়। এর মধ্যে আমাদের জন্য গভীর শিক্ষা রয়েছে।
আমরা অনেক সময় বিপদে পড়ে ভাবি—“আমার আর কোনো পথ নেই।”
কখনো মনে হয় টাকা-পয়সার সমস্যা আর শেষ হবে না।
কখনো মনে হয় মানুষের অন্যায় থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই।
কখনো মনে হয় দোয়া করেও কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।
কিন্তু ইবরাহিম (আ.)-এর ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
আল্লাহ চাইলে অসম্ভবকেও সম্ভব করে দিতে পারেন।
যে আগুনের কাজ ছিল পোড়ানো, আল্লাহ সেই আগুনকেই ইবরাহিম (আ.)-এর জন্য নিরাপদ করে দিয়েছিলেন।
তাই বিপদ যত বড়ই হোক, আল্লাহর ওপর বিশ্বাস হারাবেন না।
মানুষ আপনার বিরুদ্ধে গেলেও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
কারণ দুনিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তিও আল্লাহর হুকুমের সামনে কিছুই নয়।
হযরত ইবরাহিম (আ.) আমাদের শিখিয়ে গেছেন—সত্যের পথে চলতে গেলে কখনো কখনো একা হতে হয়, মানুষের বিরোধিতা সহ্য করতে হয়, পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ওপর ভরসা করলে তিনিই বান্দার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিপদের সময় ধৈর্য ধরার, সত্যের পথে অটল থাকার এবং তাঁর ওপর পূর্ণ ভরসা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

