Site icon Trickbd.com

পরী কি সত্যিই পৃথিবীতে আছে? নাকি সবই গল্প—ইসলাম এ বিষয়ে কী বলে?

ছোটবেলায় আমরা অনেকেই পরীর গল্প শুনেছি। কেউ বলেছে, গভীর রাতে নাকি পরীরা আসে, কারও নাকি ডানা আছে, তারা নাকি আকাশে উড়ে বেড়ায়, আবার কেউ কেউ এমন গল্পও শুনেছে—জঙ্গলে, পাহাড়ে কিংবা নির্জন জায়গায় নাকি পরীদের দেখা যায়।

কিন্তু একটা প্রশ্ন কখনো ভেবে দেখেছেন?

আসলে কি সত্যিই পরী বলে কোনো প্রাণী পৃথিবীতে আছে? নাকি এগুলো মানুষের বানানো গল্প?

আর একজন মুসলমান হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কুরআন ও হাদিসে পরী সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?

প্রথমেই একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। আমাদের প্রচলিত গল্পে যে ধরনের “পরী”র কথা বলা হয়—ডানা আছে, সুন্দর চেহারা, মানুষের মতো কথা বলে, আকাশে উড়ে বেড়ায়—এমন কোনো সৃষ্টির কথা কুরআন বা সহিহ হাদিসে সরাসরি বলা হয়নি।

অর্থাৎ ইসলাম আমাদের এমন কোনো আকিদা দেয়নি যে, “পরী নামের এই বিশেষ প্রাণী পৃথিবীতে অবশ্যই আছে।”

তাহলে মানুষ পরীর গল্প পেল কোথা থেকে?

এর বড় একটি অংশ এসেছে বিভিন্ন দেশের লোককথা, রূপকথা ও প্রাচীন কাহিনী থেকে। একেক সংস্কৃতিতে পরীর চেহারা ও বৈশিষ্ট্য একেক রকম। কোথাও পরীকে ডানাওয়ালা সুন্দর নারী হিসেবে দেখানো হয়, আবার কোথাও তাদের অদৃশ্য জগতের কোনো প্রাণী হিসেবে কল্পনা করা হয়।

কিন্তু ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ।

জিনের অস্তিত্ব সত্য।

কুরআনে আল্লাহ তাআলা জিন জাতির কথা স্পষ্টভাবে বলেছেন। এমনকি কুরআনে “সূরা আল-জিন” নামে একটি পূর্ণ সূরাও রয়েছে।

আল্লাহ বলেন—

“আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদতের জন্য।”

অর্থাৎ মানুষ ছাড়াও আল্লাহ এমন সৃষ্টি করেছেন, যাদের আমরা সাধারণভাবে দেখতে পাই না।

জিনদের মধ্যে ভালো-মন্দ উভয় ধরনের সত্তা রয়েছে। তারা আল্লাহর ইবাদত করতে পারে, আবার অবাধ্যও হতে পারে।

এখন এখানেই অনেকের মনে আরেকটি প্রশ্ন আসে—

তাহলে পরী কি আসলে জিন?

এখানে সাবধান হতে হবে।

কুরআন বা সহিহ হাদিসে এমন কোনো স্পষ্ট বক্তব্য নেই যে, “পরী আসলে জিনের একটি নির্দিষ্ট প্রজাতি।” তাই নিশ্চিতভাবে বলা ঠিক হবে না যে পরী মানেই জিন।

হ্যাঁ, মানুষের বিভিন্ন লোককথায় পরী, অদৃশ্য প্রাণী, জিন ইত্যাদি বিষয় একসঙ্গে মিশে গেছে। ফলে অনেক সময় মানুষ অজানা কোনো বিষয়কে “পরী” বলে মনে করেছে।

কিন্তু ইসলাম আমাদের শেখায়—কোনো বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত দলিল না থাকলে সেটাকে ইসলামের নিশ্চিত সত্য হিসেবে প্রচার করা যাবে না।

ধরুন, কেউ বলল—

“আমি রাতে একটা সুন্দর ডানাওয়ালা পরী দেখেছি।”

আমরা সঙ্গে সঙ্গে বলব না যে, “হ্যাঁ, সেটা নিশ্চয়ই পরী ছিল।”

কারণ মানুষ অনেক সময় অন্ধকারে এমন কিছু দেখে ভুল করতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে, ভয় বা কল্পনার কারণে কোনো কিছুকে অন্যরকম মনে হতে পারে।

আবার অদৃশ্য জগতের ব্যাপারেও এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যা আমাদের জ্ঞানের বাইরে।

তাই সবচেয়ে সঠিক কথা হলো—

পরী সম্পর্কে প্রচলিত গল্পের সত্যতা ইসলাম নিশ্চিত করেনি। আর পরী নেই—এ কথাও কুরআন-হাদিসের সরাসরি বক্তব্য হিসেবে বলা যাবে না।

আমাদের বিশ্বাসের ভিত্তি হবে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ।

একটা বিষয় লক্ষ্য করলে ব্যাপারটা আরও সুন্দরভাবে বোঝা যায়।

আমরা ফেরেশতাদের দেখি না।

আমরা জিনদেরও সাধারণভাবে দেখতে পাই না।

কিন্তু মুসলমান হিসেবে আমরা ফেরেশতা ও জিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস করি, কারণ আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ আমাদের এ বিষয়ে জানিয়েছেন।

কিন্তু “পরী” সম্পর্কে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য দলিল নেই।

তাই ফেরেশতা, জিন আর লোককথার পরী—সবকিছুকে একই জিনিস মনে করা ঠিক নয়।

আর একটা বিষয় আমাদের মনে রাখা উচিত।

ইসলাম কল্পকাহিনীকে ধর্মীয় সত্য বানাতে নিষেধ করে।

আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ভিডিও পাওয়া যায়—“পরী ধরা পড়েছে”, “পরীকে ক্যামেরায় দেখা গেছে”, “এই জঙ্গলে পরী থাকে”—এ ধরনের নানা দাবি করা হয়।

কিন্তু কোনো ভিডিও দেখলেই সেটাকে সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়।

ভিডিও সম্পাদনা করা যায়, মানুষ অভিনয় করতে পারে, কোনো প্রাণী বা ছায়াকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তাই প্রমাণ ছাড়া এসব গল্প ছড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়।

তবে এর মানে এই নয় যে অদৃশ্য জগত বলে কিছু নেই।

বরং ইসলাম আমাদের শেখায়, অদৃশ্য জগতের কিছু বিষয় সত্য—কিন্তু সে বিষয়ে যতটুকু আল্লাহ ও রাসুল ﷺ জানিয়েছেন, আমরা ততটুকুই বিশ্বাস করব।

এর বাইরে নিজের কল্পনা দিয়ে নতুন বিশ্বাস তৈরি করব না।

আর এখানেই একজন মুসলমানের বিশ্বাসের সৌন্দর্য।

আমরা সবকিছু জানি না।

আমাদের চোখ সীমিত।

আমাদের জ্ঞান সীমিত।

আমাদের পৃথিবী সম্পর্কে জ্ঞানও সীমিত।

আল্লাহ বলেন—

“তোমাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে অতি সামান্

তাই পৃথিবীতে পরী আছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে গল্প বানানোর চেয়ে আমাদের উচিত সত্যের সন্ধান করা।

হয়তো কোনোদিন বিজ্ঞান এমন কোনো অজানা প্রাণীর সন্ধান পেতে পারে, যেটা মানুষ আগে কখনো দেখেনি। আবার হয়তো পরী বলে যে ধারণা মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে, সেটি পুরোপুরিই লোককথা ও কল্পনার অংশ।

কিন্তু যেটাই হোক, এতে আল্লাহর ক্ষমতার কোনো পরিবর্তন হবে না।

কারণ আমরা যা জানি, তার চেয়েও আল্লাহর সৃষ্টি অনেক বিশাল।

আমরা শুধু এই ছোট্ট পৃথিবীতে বাস করি। অথচ আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন আসমান, জমিন, মানুষ, জিন, ফেরেশতা এবং অসংখ্য সৃষ্টি—যাদের অনেক কিছুই আমাদের অজানা।

তাই রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে যদি কখনো মনে প্রশ্ন আসে—

“সত্যিই কি পরী বলে কিছু আছে?”

তখন উত্তরের জন্য শুধু গল্পের বইয়ের দিকে তাকাবেন না।

কুরআন-সুন্নাহর দিকে তাকাবেন।

আর মনে রাখবেন—

জিনের অস্তিত্ব ইসলামে সত্য, কিন্তু প্রচলিত গল্পের ডানাওয়ালা ‘পরী’কে ইসলামের নিশ্চিত সত্য বলা যায় না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা যেন অদৃশ্য জগতের কৌতূহলে এমনভাবে ডুবে না যাই যে নিজেদের আসল দায়িত্ব ভুলে যাই।

কারণ আমাদের পৃথিবীতে আসার উদ্দেশ্য পরী খোঁজা নয়।

আমাদের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহকে চেনা, তাঁর ইবাদত করা এবং সৎভাবে জীবন কাটানো।

একদিন আমাদের সবাইকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে।

সেদিন আমরা কত পরীর গল্প জানতাম, কত রহস্যের ভিডিও দেখেছিলাম—এসবের কোনো মূল্য থাকবে না।

মূল্য থাকবে আমাদের আমলের।

আমরা নামাজ পড়েছি কি না।

মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছি কি না।

হারাম থেকে বেঁচেছি কি না।

মা-বাবার হক আদায় করেছি কি না।

আল্লাহকে স্মরণ করেছি কি না।

তাই পরী সত্যি কি না—এই রহস্যের উত্তর হয়তো আমাদের কাছে আজও নেই।

কিন্তু একটি সত্যের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই—

এই বিশাল পৃথিবী ও সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহর।

আর আল্লাহ যা জানেন, মানুষ তার সামান্যই জানে।

তাই অজানা বিষয় নিয়ে ভয় বা কল্পনা নয়—কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর জ্ঞানই হোক আমাদের পথনির্দেশ।

আল্লাহ আমাদের সঠিক জ্ঞান দান করুন, মিথ্যা গল্প ও কুসংস্কার থেকে দূরে রাখুন এবং সত্যকে সত্য হিসেবে বোঝার তাওফিক দিন।

আমিন।

Exit mobile version