Site icon Trickbd.com

একুশ শতকের সবচেয়ে দামি স্কিল: মাত্র ২০ ঘণ্টায় বদলে ফেলুন নিজের জীবন!

একুশ শতকের সবচেয়ে দামি স্কিল: মাত্র ২০ ঘণ্টায় বদলে ফেলুন নিজের জীবন!

একটু চোখ বন্ধ করে আজ থেকে কয়েক শতাব্দী পেছনের কথা ভাবুন তো! ১৮০০ শতকের দিকে সমাজে নিজেকে একটু স্পেশাল বা ‘এক্সেপশনাল’ হিসেবে প্রমাণ করার জন্য খুব বেশি কাঠখড় পোড়াতে হতো না। আপনার আহামরি কোনো টেকনিক্যাল নলেজ বা বিশাল কোনো ডিগ্রির প্রয়োজন ছিল না। তখন যদি আপনি শুধু ঠিকমতো পড়তে আর লিখতে পারতেন, তবেই আপনি সমাজের টপ ১০% এলিট শ্রেণির একজন হয়ে যেতেন। কারণ তখন শিক্ষার আলো সবার কাছে পৌঁছায়নি।

এরপর সময় পাল্টাল। আমরা যদি একটু নব্বইয়ের দশকের দিকে তাকাই, তখন ইন্টারনেট কেবল মানুষের হাতের মুঠোয় আসতে শুরু করেছে। সেই সময়ে যিনি টুকটাক কোডিং করে একটা বেসিক ওয়েবসাইট বানাতে পারতেন, তাকে রীতিমতো সুপারস্টার ভাবা হতো! অর্থাৎ, প্রতিটি যুগেই এমন একটি নির্দিষ্ট স্কিল বা দক্ষতা থাকে, যা একজন সাধারণ মানুষকে অসাধারণ বানিয়ে দেয়।

কিন্তু এখন আমরা বাস করছি একুশ শতকে। এই ২০২৪-২৬ সালের দিকে এসে কি শুধু পড়তে পারা বা কোডিং জানাই যথেষ্ট? একদমই না! এই যুগেও এমন একটা জাদুকরী স্কিল আছে, যা আপনাকে সবার চেয়ে কয়েক কদম এগিয়ে রাখবে। স্কিলটা কী? চলুন, আজ সেই গল্পটাই করি।

তথ্যের সোনালি যুগে বাংলাদেশ

আমাদের বাবা-চাচাদের আমলের কথা ভাবুন। তারা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, তখন সামান্য একটা রেফারেন্স খোঁজার জন্য তাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধুলোপড়া বই ঘাঁটতে হতো। একটা ছোট ইনফরমেশন জোগাড় করা তখন রীতিমতো যুদ্ধের সমান ছিল।

আর আজ? আজ আমরা বাস করছি ‘দ্য গোল্ডেন এজ’ বা তথ্যের সোনালি যুগে। বর্তমানে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটির কাছাকাছি। আজ কুড়িগ্রামের নিভৃত কোনো গ্রামের একটি ছেলে বা মেয়ে চাইলে তার স্মার্টফোন দিয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার দেখতে পারছে। ‘টেন মিনিট স্কুল’ বা ‘শিখো’-এর মতো দেশীয় প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে শুরু করে ইউটিউব, কোর্সেরা সব জায়গায় নলেজ এখন ছড়ানো ছিটানো।

ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সিক্রেট থেকে শুরু করে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) চালানোর কৌশল সবকিছুই আজ আপনার হাতের মুঠোয়। আপনি কে, কোথা থেকে এসেছেন, আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড কী এসব এখন আর কোনো ম্যাটার করে না। সবার জন্যই নলেজের এই দরজা সমানভাবে খোলা।

একুশ শতকের সবচেয়ে দামি স্কিলটি কী?

আশির দশকে যারা লিখতে-পড়তে পারতেন, তারা ছিলেন হিরো। ২০০০ সালে যারা গুগলের মতো ইঞ্জিন বানাচ্ছিলেন, তারা বিশ্বকে বদলে দিয়েছেন। আর আজকের দিনে সবচেয়ে বড় সুপারপাওয়ার হলো আপনি কত দ্রুত নতুন কিছু শিখতে পারেন এবং কত তাড়াতাড়ি তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারেন! (Learning fast and applying fast).

ধরুন, আপনি ঢাকার কোনো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির বিবিএ-এর ছাত্র। গত সোমবার আপনি প্রথম মিডজার্নি (Midjourney) বা এআই টুল সম্পর্কে জানলেন। আর ঠিক এক সপ্তাহ পর, রবিবার ক্লাসে আপনি সেই টুল ব্যবহার করে এমন একটা প্রেজেন্টেশন দিলেন, যা দেখে আপনার শিক্ষকও অবাক! এই যে দ্রুত একটা জিনিস শিখে সেটাকে কাজে লাগানো এটাই হলো বর্তমান যুগের সবচেয়ে দামি স্কিল।

জানলে অবাক হবেন, অ্যাপল (Apple)-এর মতো বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি তাদের লাভের বিশাল একটা অংশ শুধু প্রোডাক্ট ডিজাইনে খরচ করে না; তারা খরচ করে তাদের এমপ্লয়িদের নতুন কিছু শেখানোর পেছনে। এমনকি যারা সারা বছর সবচেয়ে বেশি নতুন জিনিস শেখে, তাদের ‘Genius of the Year’ অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। কারণ তারা জানে, পৃথিবী যেদিকেই যাক, যে কর্মী দ্রুত নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিয়ে শিখতে পারবে, সেই টিকে থাকবে।

১০,০০০ ঘণ্টার মিথ এবং ২০ ঘণ্টার ম্যাজিক

আমরা যখনই নতুন কোনো স্কিল শিখতে যাই হোক সেটা গ্রাফিক্স ডিজাইন, গিটার বাজানো, ভিডিও এডিটিং বা পাবলিক স্পিকিং শুরুতেই আমরা ভয় পেয়ে যাই। আমাদের ব্রেইন ন্যাচারালি কমফোর্ট জোনে থাকতে চায়। একটা ভয় কাজ করে, “আমার দ্বারা কি এটা হবে? কত বছর লাগবে কে জানে!”

আমাদের মাথায় একটা থিওরি খুব শক্তভাবে গেঁথে আছে, আর তা হলো, কোনো কিছুতে এক্সপার্ট হতে হলে ১০,০০০ ঘণ্টা সময় লাগে। প্রতিদিন ৩ ঘণ্টা করে সময় দিলেও ১০ বছর! এটা ভেবেই বাংলাদেশের হাজারো তরুণ ফ্রিল্যান্সিং বা নতুন স্কিল শেখার স্বপ্ন মাঝপথেই ছেড়ে দেয়।

কিন্তু আসল সত্যটা কী জানেন? ম্যালকম গ্ল্যাডওয়েল বা অ্যান্ডারস এরিকসনের এই ১০,০০০ ঘণ্টার সূত্রটি মূলত ওয়ার্ল্ড ক্লাস গ্র্যান্ডমাস্টার বা অলিম্পিক লেভেলের অ্যাথলিটদের জন্য! সাধারণ মানুষের জন্য, অর্থাৎ কোনো একটি স্কিল মোটামুটি ভালো লেভেলে (Decently Good) আয়ত্ত করার জন্য আপনার ১০ হাজার ঘণ্টা লাগবে না। আপনার প্রয়োজন মাত্র ২০ ঘণ্টা! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। দিনে মাত্র ৪৫ মিনিট করে এক মাস সময় দিলেই আপনি যেকোনো নতুন স্কিলের বেসিক লেভেল পার করে ফেলতে পারবেন।

যেকোনো স্কিল ২০ ঘণ্টায় শেখার ৪টি জাদুকরী ধাপ

স্কিল শেখার প্রসেসকে সহজ করতে এই ৪টি ধাপ ফলো করতে পারেন:

  1. স্কিলটাকে ভেঙে ছোট করুন (Deconstruct the Skill): আপনি হয়তো ‘ডিজিটাল মার্কেটিং’ শিখতে চান। এটা একটা বিশাল জগত। পুরোটায় একসাথে ঝাঁপ দেবেন না। প্রথমে ঠিক করুন আপনি শুধু ‘ফেসবুক অ্যাডস’ শিখবেন। অর্থাৎ, মূল কাজটাকে ছোট ছোট টুকরোতে ভাগ করে ফেলুন এবং সবচেয়ে জরুরি অংশটা আগে শিখুন।
  2. নিজেকে শুধরানোর মতো জ্ঞান অর্জন করুন: ৩-৪টা ভালো ইউটিউব টিউটোরিয়াল বা একটা ভালো কোর্স সিলেক্ট করুন। এমন নয় যে আপনাকে ১০০টা বই পড়তে হবে। শুধু ততটুকু শিখুন, যেন প্র্যাকটিস করার সময় আপনি নিজের ভুলটা নিজেই ধরতে পারেন।
  3. ডিস্ট্রাকশনকে ‘না’ বলুন: আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো হাতের মোবাইলটা। পড়তে বসে বা টিউটোরিয়াল দেখতে বসে একটু পর পর ফেসবুকের নোটিফিকেশন চেক করা বা টিকটক স্ক্রল করার অভ্যাস ছাড়তে হবে। এই ২০ ঘণ্টা হবে ১০০% ফোকাসড!
  4. অন্তত ২০ ঘণ্টা প্র্যাকটিস করুন: শুরুতে সবকিছু খুব কঠিন মনে হবে। মনে হবে, “ধুর! আমাকে দিয়ে হবে না।” এই ফ্রাস্ট্রেশনটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে ২০টা ঘণ্টা পার করুন। দেখবেন, ২০ ঘণ্টা পর ওই কঠিন কাজটাই আপনার কাছে পানির মতো সহজ লাগছে।

আমরা কেন শিখতে ব্যর্থ হই? (৩টি মূল বাধা)

এত কিছু জানার পরও আমরা অনেকেই সফল হতে পারি না। কেন? কারণ আমাদের লার্নিং প্রসেসে ৩টি বড় বাধা আছে:

জ্ঞান শক্তি নয়, ‘অ্যাকশন’ হলো আসল শক্তি

“Knowledge is not power, it is only potential power. Action is the real power.”

বিখ্যাত লেখক নেপোলিয়ন হিল প্রায় ১০০ বছর আগে এই কথাটি বলেছিলেন। আপনি সাইকেল চালানো নিয়ে ১০টা বই পড়তে পারেন, কিন্তু রাস্তায় সাইকেল নিয়ে না নামলে আপনি কখনোই সাইকেল চালাতে পারবেন না। আপনি শেখেন শুধু ইনফরমেশন জমা করার জন্য নয়; আপনি শেখেন নিজের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য, ক্যারিয়ার গড়ার জন্য। তাই যা শিখছেন, আজই তা অ্যাপ্লাই করতে শুরু করুন।

বিশ্বসেরা মানুষদের অনুপ্রেরণা

এলভিন টফলার বলেছিলেন, “একুশ শতকের অশিক্ষিত তারা নয় যারা পড়তে বা লিখতে পারে না, বরং তারা যারা শিখতে, পুরনো ভুল জিনিস ভুলতে এবং নতুন করে শিখতে পারে না (Learn, Unlearn, Relearn)।”

পৃথিবীর সেরা মানুষদের দিকে তাকান। ইলন মাস্কের কোনো অ্যারোস্পেস বা রকেট সায়েন্সের ডিগ্রি ছিল না। ১৯৯৫ সালে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন স্পেস নিয়ে কাজ করবেন। টানা ৬০ দিন তিনি পাগলের মতো বই পড়লেন, রিসার্চ পেপার ঘাঁটলেন। ফলাফল? আজকের ‘SpaceX’ যা নাসাকেও টেক্কা দিচ্ছে!

বিল গেটস বছরে ৫০টির বেশি বই পড়েন। ওয়ারেন বাফেট দিনে ৫-৬ ঘণ্টা পড়ার পেছনে ব্যয় করেন। নেলসন ম্যান্ডেলা জেলখানায় বসে অর্থনীতির বই পড়ে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। এরা সবাই ছিলেন এক্সট্রাঅর্ডিনারি লার্নার বা আজীবন শিক্ষার্থী।

শেষ কথা

আপনি যদি আপনার ক্যারিয়ার, ব্যবসা বা ব্যক্তিগত জীবনকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান, তবে নতুন কিছু শেখার কোনো বিকল্প নেই। ইন্টারনেট আপনার হাতে, দুনিয়ার সব জ্ঞান আপনার চোখের সামনে। এখন শুধু দরকার আপনার ইচ্ছাশক্তিটুকু। নিজেকে প্রশ্ন করুন বাকি জীবন কি আপনি অন্যের আন্ডারে সাধারণ একটা জীবন কাটাবেন, নাকি আজ থেকেই নতুন কিছু শিখে নিজেকে ‘ইরিপ্লেসেবল’ বা অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গড়ে তুলবেন?

সিদ্ধান্ত আপনার। সময় নষ্ট না করে, আজই আপনার পছন্দের স্কিলটি বেছে নিন এবং শুরু করে দিন আপনার সেই ম্যাজিকাল ২০ ঘণ্টার যাত্রা!

Exit mobile version