Site icon Trickbd.com

জ্যোতিষশাস্ত্রের মনস্তাত্ত্বিক খেলা : জ্যোতিষীরা কিভাবে আপনার জীবনের ঘটনা বলে দেয়?

জ্যোতিষশাস্ত্রের মনস্তাত্ত্বিক খেলা : জ্যোতিষীরা কিভাবে আপনার জীবনের ঘটনা বলে দেয়?


জ্যোতিষশাস্ত্র বহু শতাব্দী ধরে আমাদের সমাজে চলে আসছে। তাই আমরা ভাবি জ্যোতিষশাস্ত্র একটি বিজ্ঞান। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের মানদণ্ডে এটি কেবলমাত্র একটি ছদ্মবিজ্ঞান। অনেকেই গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানকে মানুষের ভাগ্য বা চরিত্রের নিয়ন্ত্রক বলে মনে করেন। কিন্তু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, জ্যোতিষশাস্ত্র মানুষের মনের দুর্বলতা এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োগ। অনেকেই বলেন অমুক জ্যোতিষী আমাদের অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যত সঠিক ভাবে বলে দেন। দেখে নেয়া যাক, কীভাবে ওনারা এইসব বলে থাকেন, তাই নিয়ে এই লেখনী….

​১. কোল্ড রিডিং :- অদৃশ্য তথ্যের বিভ্রম। জ্যোতিষীদের প্রধান হাতিয়ার হলো ‘কোল্ড রিডিং’। এটি এমন একটি যোগাযোগ কৌশল, যেখানে বক্তা শ্রোতা সম্পর্কে আগে থেকে কিছুই না জেনেও তার সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেন।
​কৌশল: জ্যোতিষীরা অত্যন্ত সাধারণ এবং অস্পষ্ট বাক্য ব্যবহার করেন, যেমন: “আপনার জীবনে বর্তমানে একটি মানসিক চাপ চলছে” বা “আপনি কাউকে খুব বিশ্বাস করে ঠকেছেন” ইত্যাদি।
পরিসংখ্যানগতভাবে এই ঘটনাগুলো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জীবনে অত্যন্ত সাধারণ। এইসব কথা বলে ওনারা সহজেই আমাদের মন জিতে নেন। আমরা ওনাদের বিশ্বাস করতে শুরু করি। এটাই ওনাদের প্রথম মনস্তাত্ত্বিক চাল।
​পর্যবেক্ষণ: তাঁরা ক্লায়েন্টের বাচনভঙ্গি, চোখের চাহনি, পোশাক এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের বক্তব্য পরিবর্তন করতে থাকেন। একে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা মনে হলেও, এটি মূলত অভিজ্ঞলব্ধ পর্যবেক্ষণ দক্ষতা।
অতীত জানার কৌশল :- বিজ্ঞান নয়, তথ্য চুরির খেলা। ভবিষ্যৎবাণীর পাশাপাশি জ্যোতিষীরা অনেক সময় আপনার অতীতের সঠিক কথা বলে চমকে দেন। এটিও কোনো গ্রহের হিসাব নয়। নিরপেক্ষ যুক্তি দিয়ে চিন্তা ভাবনা করে দেখুন, তাহলে নিজেই বুঝতে পারবেন।

২. ​হট রিডিং :- অনেক সময় তারা আগে থেকেই ক্লায়েন্টের তথ্য সংগ্রহ করেন। সোশ্যাল মিডিয়া বা সহকারীদের মাধ্যমে এবং পরে সেটাকেই অলৌকিক ক্ষমতা হিসেবে উপস্থাপন করেন। এবং আমরা সহজেই ওনাদের এই ফাঁদে পা দিয়ে ফেলি। তারপর ওনারা আমাদের মনের দুর্বল দিক গুলো বুঝে নিয়ে ব্যবসা শুরু করে দেন।
​পরিসংখ্যানের ব্যবহার :- “আপনি ছোটবেলায় একবার বড় আঘাত পেয়েছিলেন” পরিসংখ্যান বলে অধিকাংশ দুরন্ত বাচ্চার ক্ষেত্রেই এটি সত্য। এটি গ্রহের জ্ঞান নয়, এটি সাধারণ সম্ভাবনার জ্ঞান। এই সত্যি কথা টা বুঝতে গেলে শুধুমাত্র আপনার নিরপেক্ষ যুক্তিবোধ কে খোলা রাখতে হবে। তাহলে সব কিছু জলের মতোন পরিষ্কার বুঝতে পারবেন।
এইরকম বিভিন্ন সাধারণ কথা বলে ওনারা আমাদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তার করেন। তাই আমাদের মনে হয় ওনারা অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে আমাদের ভূত ভবিষ্যত সব জানতে পারছেন।

​৩. বার্নাম ইফেক্ট :- সাধারণের মধ্যে ব্যক্তিগত প্রতিচ্ছবি। কেন আমরা মনে করি যে রাশিফলের কথাগুলো হুবহু আমাদের সাথেই মিলে যাচ্ছে? মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘বার্নাম ইফেক্ট’ বা ‘ফরার ইফেক্ট’।
সংজ্ঞা :- ​যখন কোনো সাধারণ এবং ইতিবাচক বিবৃতিকে মানুষ নিজের একান্ত ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য বলে মেনে নেয়, তখন এই প্রভাব কাজ করে।
​প্রয়োগ :- উদাহরণস্বরূপ, “আপনি বাইরে থেকে নিজেকে শক্ত দেখালেও, ভেতরে আপনি বেশ আবেগপ্রবণ” এই কথাটি পৃথিবীর প্রায় ৯০% মানুষ নিজের ক্ষেত্রে সত্য বলে মনে করবেন।
জ্যোতিষীরা এই সর্বজনীন সত্যগুলোকে ব্যক্তিগত মোড়কে পরিবেশন করেন, যা মস্তিষ্কে ‘সাবজেক্টিভ ভ্যালিডেশন’ তৈরি করে।

​৪. কনফার্মেশন বায়াস :- নির্বাচিত স্মৃতির খেলা। মানুষের মস্তিষ্কের একটি সহজাত প্রবণতা হলো ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বা নিশ্চিতকরণ পক্ষপাত।
​মনস্তত্ত্ব :- আমরা সেই তথ্যটিকেই গুরুত্ব দিই বা মনে রাখি, যা আমাদের বিশ্বাসকে সমর্থন করে। অন্যদিকে, ভুল বা অমিল তথ্যগুলো আমরা অবচেতনভাবেই ভুলে যাই।
​বাস্তবতা :- একজন জ্যোতিষী হয়তো দশটি কথা বললেন, যার মধ্যে দুটি কাকতালীয়ভাবে মিলে গেল এবং আটটি মিলল না। আমাদের মস্তিষ্ক ওই দুটি সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী মনে রাখে এবং বাকি আটটি ব্যর্থতাকে উপেক্ষা করে। ফলে আমাদের মনে হয় জ্যোতিষী সব সঠিক বলেছেন।

​৫. বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীনতা :- পদার্থবিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের কোনো সূত্রই জ্যোতিষশাস্ত্রকে সমর্থন করে না।
​মৌলিক বলের অভাব :- হাজার আলোকবর্ষ দূরের কোনো গ্রহ বা নক্ষত্রের মহাকর্ষীয় বা তাড়িতচৌম্বকীয় বল মানুষের দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত বা ভাগ্যের ওপর প্রভাব ফেলবে এর কোনো গাণিতিক বা পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ নেই।
​পরীক্ষণ :- ডাবল-ব্লাইন্ড টেস্ট বা নিয়ন্ত্রিত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, জ্যোতিষীদের সাফল্যের হার ‘ল অফ প্রোবাবিলিটি’ বা নিছক সম্ভাবনার চেয়ে বেশি নয়।

সবিশে বলা যায়, জ্যোতিষশাস্ত্র মহাকাশের কোনো বিজ্ঞান নয়, বরং এটি মানুষের মনের অনিশ্চয়তা এবং আশাকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যবসা। একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হিসেবে আমাদের উচিত অলীক কল্পনার আশ্রয় না নিয়ে যুক্তি এবং কার্যকারণ সম্পর্কের ভিত্তিতে জীবনকে বিচার করা।

সকলের জন্যই শুভকামনা রইলো – ভালো থাকুন।
ওয়েব আমন্ত্রণ রইলো : PsychoTech

Exit mobile version