স্মার্টফোনের বাজারে ইদানীং এক অদ্ভুত ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে। কোম্পানিগুলো সস্তায় ফোন বানালেও, কোনোভাবেই সেটাকে ‘সস্তা’ বা ‘বাজেট’ ফোন বলতে রাজি নয়! এই যেমন ধরুন, নাথিং (Nothing)-এর নতুন ফোন Nothing Phone 4b এর কথাই। যখন নাথিং-এর মার্কেটিং হেডকে জিজ্ঞেস করা হলো নামের শেষে এই ‘b’ মানে কী? তিনি অনেক ভারী ভারী কথা বলে গেলেন, কিন্তু আসল কথাটা এড়িয়ে গেলেন। তবে চলুন সত্যি কথাটা বলি— ‘b’ মানে হলো একদম খাঁটি ‘Budget’ বা বাজেট!
নাথিং-এর লাইনআপটা কিন্তু এখন বেশ সহজ। তাদের ফ্লাগশিপ লেভেলের ফোন হলো Phone 3, তার চেয়ে একটু কম দামের হলো A সিরিজ, আর এখন সবচাইতে সস্তা হিসেবে এলো এই B সিরিজ। ইউরোপ এবং ভারতের বাজারে এর দাম রাখা হয়েছে ৩৩০ ইউরো বা ৩০০ পাউন্ডের কাছাকাছি। আর আমরা যারা বাংলাদেশে থাকি, তারা তো জানিই যে ভারতের মার্কেট থেকে এই ফোনগুলো খুব সহজেই আমাদের দেশে চলে আসে। তো চলুন, আড্ডা ছলে জেনে নিই এই ফোনটি আসলে কেমন এবং আপনার কষ্টের টাকায় এটি কেনা ঠিক হবে কিনা।
ভেতরের গল্প: এটি কি আসলে CMF Phone 3 Pro ছিল?
ফোনটি এর স্পেসিফিকেশন দেখার পর আমার মাথায় একটা দারুণ থিওরি এসেছে। আপনারা হয়তো জানেন, নাথিং-এর একটি সাব-ব্র্যান্ড আছে ‘CMF’, যারা মূলত ৩০০ ডলারের নিচে বেশ দারুণ সব ফোন বানায়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই Phone 4b ফোনটি আসলে ‘CMF Phone 3 Pro’ হিসেবে বাজারে আসার কথা ছিল!
কিন্তু ঝামেলাটা পাকিয়েছে বর্তমান বাজারের মেমোরি বা র্যাম-স্টোরেজের দাম। হঠাৎ করে এই কম্পোনেন্টগুলোর দাম এতটাই বেড়ে গেছে যে, ফোনটা তৈরি করার খরচ অনেকটাই বেড়ে যায়। ফলে CMF-এর মতো সস্তা ব্র্যান্ডের তকমা লাগিয়ে এই দামে ফোনটা বেচা তাদের জন্য কঠিন হতো। তাই তারা বুদ্ধি করে এটাকে কিছুটা প্রিমিয়াম লুক দিয়ে মূল ‘নাথিং’ ব্র্যান্ডের আন্ডারেই রিলিজ করে দিয়েছে। খারাপ কী! একটু বেশি টাকা দিয়ে হলেও আমরা তো নাথিং-এর অরিজিনাল ভাইবটাই পাচ্ছি।
ডিজাইন এবং ডিসপ্লে: প্লাস্টিকের বডিতে কাঁচের মায়া
বাইরে থেকে দেখলে Phone 4b কে বেশ সাদামাটাই মনে হবে। তবে ৬.৮ ইঞ্চির এই বিশাল ফোনটার উপরের অর্ধেকটায় আছে নাথিং-এর সেই সিগনেচার ট্রান্সপারেন্ট বা স্বচ্ছ লুক। ভেতরের টেক্সচার, স্ক্রু আর মেটালিক পার্টসগুলো বাইরে থেকে দেখা যায়। আর হ্যাঁ, গ্লিফ (Glyph) লাইটগুলো কিন্তু এখনো আছে!
পুরো ফোনটাই প্লাস্টিকের তৈরি, এবং হাতে নিলেও প্লাস্টিকের ফিলটাই পাওয়া যায়। তবে ওই যে উপরের স্বচ্ছ অংশটুকু, ওটা দেখতে বেশ গ্লাসি আর প্রিমিয়াম লাগে। নীল, কালো এবং সাদা এই তিনটি দারুণ কালারে ফোনটি পাওয়া যাচ্ছে। এর ফ্ল্যাট সাইড আর কালো বোতামগুলোর কম্বিনেশন আমার ব্যক্তিগতভাবে বেশ ভালো লেগেছে।
সামনের দিকে তাকালে চোখে পড়বে একটি ৬.৭৭ ইঞ্চির AMOLED ডিসপ্লে। ১২০ হার্টজ রিফ্রেশ রেটের এই ডিসপ্লেটির রেজুলেশন ১০৮০p এর চেয়ে বেশি, কিন্তু ১৪৪০p এর চেয়ে একটু কম। যেহেতু এটি ফ্লেক্সিবল ওলেড নয়, তাই নিচের দিকে একটুখানি বেজেল বা ‘চিন’ চোখে পড়বে। তবে সত্যি বলতে, প্রতিদিনের ব্যবহারে এটা কোনো ব্যাপারই না। ডিসপ্লেটি যথেষ্ট ব্রাইট, কালার কন্ট্রাস্ট চমৎকার এবং এর অ্যান্টি-গ্লেয়ার ফিনিশটা প্রিমিয়াম ফোনগুলোর চেয়ে একটু পিছিয়ে থাকলেও, এই বাজেটে এটি আপনাকে হতাশ করবে না। আর হ্যাঁ, এতে ইন-ডিসপ্লে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর আছে। যদিও সেটা অপটিক্যাল এবং প্লেসমেন্টটা একটু নিচের দিকে, তাই স্পিডটা ফ্লাগশিপের মতো বিদ্যুত গতির না হলেও কাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো।
ক্যামেরা: অপ্রয়োজনীয় লেন্সের নেই
বাজেট ফোন মানেই পেছনের দিকে ২ মেগাপিক্সেলের দুনিয়ার হাবিজাবি ম্যাক্রো বা ডেপথ সেন্সর দিয়ে ভরিয়ে রাখা! কিন্তু নাথিং এখানে বেশ ম্যাচিওর একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফোনটিতে মাত্র দুটি ক্যামেরা আছে— একটি ৫০ মেগাপিক্সেলের প্রাইমারি সেন্সর (যেটিতে OIS আছে) এবং একটি ৮ মেগাপিক্সেলের আল্ট্রাওয়াইড লেন্স।
প্রাইমারি সেন্সরটি স্যামসাংয়ের তৈরি এবং ফিজিক্যালি বেশ ছোট। কিন্তু ভাই, নাথিং-এর সফটওয়্যার প্রসেসিংকে স্যালুট জানাতেই হয়! দিনের আলোতে বা ভালো লাইটিং কন্ডিশনে আপনি এই ক্যামেরা দিয়ে চমৎকার সব ছবি পাবেন। তবে হ্যাঁ, আলো কমে গেলে বা রাতের বেলায় ছবি তুলতে গেলে একটু স্ট্রাগল করতে হয়। সাটার স্পিড কমে যায়, কালার একটু ডাল হয়ে আসে। আর আল্ট্রাওয়াইড লেন্সটি ঠিকঠাক, তবে ছবির কর্নারগুলো খুব একটা শার্প হয় না। সব মিলিয়ে, এই বাজেটে ক্যামেরা নিয়ে খুব একটা অভিযোগ করার জায়গা নেই। তবে আপনি যদি শুধু ক্যামেরার জন্যই ফোন কিনতে চান, তবে হয়তো পিক্সেল (Pixel) সিরিজের পুরনো কোনো ফোন আপনার জন্য ভালো হবে।
পারফরম্যান্স এবং সফটওয়্যার: যেখানে জাদু লুকিয়ে আছে
খাতা-কলমে এই ফোনের প্রসেসর দেখলে আপনি হয়তো একটু নাক সিঁটকোতে পারেন। এতে ব্যবহার করা হয়েছে Snapdragon 6 Gen 4 প্রসেসর। বেঞ্চমার্কে এর স্কোর দেখলে মনে হবে এটি আজ থেকে সাত বছর আগের OnePlus 7 Pro-এর সমান! কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ফোনটি ব্যবহার করার সময় আপনি এই ধীরগতি টেরই পাবেন না। কেন? কারণ এর সফটওয়্যার!
এর ভেতরে আছে একদম লেটেস্ট Nothing OS 4.1। নাথিং তাদের সফটওয়্যারকে এতটা নিখুঁতভাবে অপ্টিমাইজ করেছে এবং এতে নতুন কাস্টম সিপিইউ শিডিউলার ব্যবহার করেছে যে, ফোনটি মাখনের মতো চলে। এর সাথে ১২০ হার্টজ ডিসপ্লে আর ১০০০ হার্টজ টাচ স্যাম্পলিং রেট মিলে ফোনটিকে এই প্রাইস রেঞ্জের অন্যতম রেসপন্সিভ ফোনে পরিণত করেছে। হ্যাঁ, মাঝে মাঝে হয়তো সামান্য স্টাটার বা ল্যাগ দেখা যায়, ভারী গেম খেললে ফ্রেম ড্রপ হতে পারে (এতে বেশ বড় ভ্যাপর চেম্বার কুলিং আছে), তবে দৈনন্দিন কাজে এটি আপনাকে মুগ্ধ করবেই। সবচেয়ে বড় কথা, দামি নাথিং ফোনগুলোর সব সফটওয়্যার ফিচার, উইজেট, এআই টুলকিট— সবই আপনি এই সস্তা ফোনেই পাচ্ছেন!
ব্যাটারি এবং অন্যান্য সুবিধা (যা আপনাকে খুশি করবে)
এই ফোনের সবচেয়ে বড় চমকগুলোর একটি হলো এর ব্যাটারি। গ্লোবাল ভার্সনে ৫২০০ এমএএইচ থাকলেও, ইন্ডিয়ান ভার্সনে দেওয়া হয়েছে বিশাল ৬০০০ এমএএইচ ব্যাটারি! একবার ফুল চার্জ দিলে অনায়াসেই দেড় থেকে দুই দিন পার করে দেওয়া যাবে। ৩৩ ওয়াটের চার্জিং স্পিডটা খুব বেশি ফাস্ট না হলেও, এতো বড় ব্যাটারি ব্যাকআপ সেই দুঃখ ভুলিয়ে দেয়।
এর পাশাপাশি এই বাজেটে ট্রু স্টেরিও স্পিকার পাওয়াটাও একটা বড় পাওয়া। নিচের দিকে মেইন স্পিকার আর উপরে ছোট্ট একটা ডট দিয়ে সেকেন্ডারি স্পিকার দেওয়া হয়েছে, যার সাউন্ড কোয়ালিটি বেশ ভালো। এমনকি এতে IP64 রেটিং আছে, মানে হালকা পানির ছিটেফোঁটায় ফোনের কিচ্ছু হবে না। আর গ্লিফ লাইটগুলো আগের Phone 4a-এর চেয়েও উজ্জ্বল, যা নোটিফিকেশন বা ভিডিও করার সময় বেশ কাজে দেয়।
যে দিকগুলো হতাশ করতে পারে
বাজেট ফোন যখন, তখন কিছু জায়গায় তো ছাড় দিতেই হবে। চলুন দেখে নিই এর কিছু নেতিবাচক দিক:
- ভায়ব্রেশন মোটর: এই ফোনের হ্যাপটিক ফিডব্যাক বা ভায়ব্রেশন মোটরটা বেশ বাজে। টাইপ করার সময় একটা স্পঞ্জি বা ম্যাড়ম্যাড়ে ফিল আসে। সম্ভবত কোম্পানিও এটা জানতো, তাই ডিফল্টভাবে কিবোর্ডের ভায়ব্রেশন অফ করা থাকে!
- প্লাস্টিক বডিতে দাগ: নীল রঙের ফোনটি আমি ব্যবহার করে দেখেছি, এতে খুব সহজেই স্ক্র্যাচ পড়ে যায়। সাদা রঙে হয়তো দাগগুলো কম বোঝা যাবে, তবে লম্বা সময়ের জন্য ব্যবহার করতে চাইলে ভালো একটা কভার মাস্ট।
- স্টোরেজ স্পিড: এতে তুলনামূলক ধীরগতির UFS 2.2 স্টোরেজ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ৫-৬ বছর পর ফোনটা কতটা ফাস্ট থাকবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
- ফিচার ঘাটতি: এতে কোনো ওয়্যারলেস চার্জিং নেই, আর অদ্ভুতভাবে ইন্ডিয়ান ভার্সনটিতে NFC সাপোর্ট দেওয়া হয়নি।
শেষ কথা: কিনবেন নাকি কিনবেন না?
পুরো বিষয়টা যদি সহজ করে বলি— Nothing Phone 4b হলো এমন একটি ফোন, যা আপনাকে কম বাজেটে নাথিং ইকোসিস্টেমের একটা দারুণ স্বাদ এনে দেবে। এর চমৎকার ডিসপ্লে, ফাটাফাটি ব্যাটারি লাইফ, ক্লিন অ্যান্ড স্মুথ সফটওয়্যার আর গ্লিফ ইন্টারফেস ফোনটিকে এই বাজেটের অন্যতম সেরা একটি অপশনে পরিণত করেছে।
আপনার যদি ওয়্যারলেস চার্জিং বা হাই-এন্ড গেমিংয়ের দরকার না থাকে এবং টুকটাক প্লাস্টিক বডি বা নরমাল ভায়ব্রেশন মোটর নিয়ে সমস্যা না থাকে, তবে এই ফোনটি চোখ বন্ধ করে আপনার লিস্টের একদম উপরের দিকে রাখতে পারেন। নাথিং-এর হয়তো ‘বাজেট’ শব্দটাতে অ্যালার্জি আছে, কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এটি আসলেই “বিগ ব্যাং ফর দ্য বাক” বা পয়সা উসুল একটি ফোন!
📱 Nothing Phone 4b-এর সর্বশেষ দাম, সম্পূর্ণ স্পেসিফিকেশন এবং সব ভ্যারিয়েন্টের বিস্তারিত তথ্য —
এখানে দেখুন →

