Site icon Trickbd.com

গ্যাজেটের দাম কেন হু হু করে বাড়ছে? নেপথ্যে অ্যাপল নাকি এআই-এর রাজত্ব?

গ্যাজেটের দাম কেন হু হু করে বাড়ছে? নেপথ্যে অ্যাপল নাকি এআই-এর রাজত্ব?

খুব শখ করে হয়তো টাকা জমাচ্ছিলেন নতুন একটা স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ কিনবেন বলে। বাজেটও ঠিক করে রেখেছেন। কিন্তু হঠাৎ বাজারে গিয়ে দেখলেন, যে ডিভাইসটার দাম কিছুদিন আগেও আপনার বাজেটের মধ্যে ছিল, সেটা এখন নাগালের বাইরে চলে গেছে! আপনি হয়তো ভাবছেন, ডলারের দাম বেড়েছে বা ট্যাক্স বসিয়েছে। কিন্তু পর্দার পেছনের গল্পটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

কিছুদিন আগের কথা। প্রযুক্তি দুনিয়ার জায়ান্ট অ্যাপল এমন একটা কাজ করে বসল, যা তারা সচরাচর একেবারেই করে না। বাজারে নতুন কোনো প্রোডাক্ট বা মডেল না এনেই তারা হুট করে তাদের বেশ কিছু প্রোডাক্টের দাম বাড়িয়ে দিল! ম্যাকবুক নিও (MacBook Neo)-এর দাম ৫৯৯ ডলার থেকে এক লাফে ৬৯৯ ডলার হয়ে গেল। সবচেয়ে কম দামি আইপ্যাডের দাম ৩৪৯ ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়াল ৪৪৯ ডলারে। এমনকি ছোট অ্যাপল টিভি বক্সের দামও ১২৯ ডলার থেকে বেড়ে ১৯৯ ডলার হয়ে যায়।

সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, প্রোডাক্টের ভেতরে বিন্দুমাত্র কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। শুধু দামের ট্যাগটা বদলে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় মার্কেট এতটাই ধাক্কা খেয়েছিল যে, সেদিনই অ্যাপলের শেয়ারের দাম ৫ থেকে ৬ শতাংশ পড়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে অ্যাপলের সিইও টিম কুক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “দুর্ভাগ্যবশত, দাম বাড়ানোটা আমাদের জন্য অপরিহার্য ছিল।”

এখন আপনার মনে হতেই পারে, অ্যাপলের মতো এত বড় একটা কোম্পানি হয়তো স্রেফ লোভের বশবর্তী হয়েই বেশি মুনাফা কামানোর জন্য এই খোঁড়া অজুহাত দিচ্ছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ঘটনা মোটেও তা নয়। যে কারণে অ্যাপল দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে, ঠিক একই কারণে খুব শিগগিরই আপনার পরবর্তী স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, এমনকি আপনার ঘরের স্মার্ট টিভি বা ফ্রিজটার দামও অনেক বেড়ে যেতে পারে। আর এই পুরো ঘটনার পেছনে কলকাঠি নাড়ছে একটি মাত্র ছোট জিনিস ‘মেমোরি’ (Memory)।

৭০ বছরের পুরোনো নিয়মের হঠাৎ পতন

 

গত প্রায় ৭০ বছর ধরে প্রযুক্তি দুনিয়ায় একটি অলিখিত নিয়ম ছিল সময়ের সাথে সাথে কম্পিউটারের মেমোরির দাম সবসময় কমবে। পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৫৭ সাল থেকে শুরু করে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতি ৫ বছরে মেমোরির দাম প্রায় ১০ গুণ করে কমেছে। কিন্তু সম্প্রতি ৭০ বছরের এই পুরোনো ঐতিহ্য হঠাৎ করেই ভেঙে গেছে। কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো মেমোরি সস্তা হওয়ার বদলে উল্টো দামি হতে শুরু করেছে।

আর এর পেছনের কারণটা শুনলে আপনি চমকে যাবেন। কারণটা হলো ‘এআই’ (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা! হ্যাঁ, দূর দেশের কোনো বিশাল ডেটা সেন্টারে বসে থাকা এআই আপনার পকেটের ফোনটাকে দামি করে তুলছে। পৃথিবীর সমস্ত মেমোরি যেন এআই একাই গিলে খাচ্ছে! কিন্তু কীভাবে? চলুন সেটাই আজ একটু সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করি।

মেমোরি আসলে কী এবং কীভাবে কাজ করে?

কেন মেমোরির দাম বাড়ছে, সেটা বোঝার আগে আমাদের খুব সহজে বুঝতে হবে মেমোরি জিনিসটা আসলে কী। চিন্তার কিছু নেই, আপনাকে একদম প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হতে হবে না। আমি খুব সহজ একটা উদাহরণ দিচ্ছি।

ধরুন, আপনার ফোন বা ল্যাপটপের ভেতরে একটি ‘মগজ’ বা ব্রেন আছে, যা সব চিন্তাভাবনা করে। একে আমরা বলি প্রসেসর। কিন্তু শুধু ব্রেন দিয়ে তো আর কাজ হয় না। কাজ করার জন্য ব্রেনের সামনে একটা ‘পড়ার টেবিল’ দরকার, যেখানে সে শুধু বর্তমান কাজের জিনিসপত্র রাখবে। আর পেছনের দিকে একটা ‘আলমারি’ দরকার, যেখানে সে তার যাবতীয় জিনিস নিরাপদে জমিয়ে রাখতে পারবে।

এই ‘টেবিল’টাই হলো র‍্যাম (RAM)। আপনি যখন ফোনে কোনো অ্যাপ খোলেন, তখন ফোন সেটা আলমারি থেকে বের করে টেবিলে রাখে, যাতে ব্রেন খুব দ্রুত সেটা নিয়ে কাজ করতে পারে। কিন্তু টেবিলের জায়গাটা অস্থায়ী। ফোন বন্ধ করলেই টেবিল একেবারে পরিষ্কার হয়ে যায়। অন্যদিকে, ‘আলমারি’টা হলো আপনার স্টোরেজ। এখানেই আপনার প্রিয় ছবি, ভিডিও বা দরকারি মেসেজগুলো স্থায়ীভাবে জমা থাকে।

মজার ব্যাপার হলো, এই টেবিল এবং আলমারি দুটোই তৈরি হয় ছোট ছোট মেমোরি চিপ দিয়ে। টেবিল বা র‍্যাম তৈরি হয় ‘DRAM’ নামের চিপ দিয়ে, আর আলমারি বা স্টোরেজ তৈরি হয় ‘NAND’ চিপ দিয়ে। যখন খবরে বলা হয় যে মেমোরির সংকট চলছে, তার মানে হলো এই দুই ধরনের চিপেরই দাম একসাথে বেড়ে গেছে। সহজ কথায়, আপনার ডিজিটাল টেবিল আর আলমারি বানানোর কাঁচামাল হঠাৎ করেই খুব দামি হয়ে গেছে।

এআই-এর কেন এত মেমোরি লাগে?

এআই-এর ব্রেন বা চিপও কিন্তু সাধারণ ব্রেনের মতোই, শুধু সেটা আকারে বিশাল এবং অসম্ভব শক্তিশালী। আর বড় ব্রেনের সমস্যাও অনেক বড়। এটি এত দ্রুত ডেটা প্রসেস করে যে, একটা সাধারণ ‘টেবিল’ বা র‍্যাম তাকে যথেষ্ট দ্রুত ডেটা সাপ্লাই দিতে পারে না। ফলে, ডেটার অভাবে এআই-এর শক্তিশালী ব্রেন অলস বসে থাকে।

এই সমস্যার সমাধানে মেমোরি কোম্পানিগুলো একটা দারুণ বুদ্ধি বের করল। সাধারণ মেমোরি চিপ দেখতে অনেকটা একটা পাতলা শিট বা কাগজের মতো। কোম্পানিগুলো কী করল, ৮ থেকে ১৬টি র‍্যাম শিটকে একটার ওপর আরেকটা বসিয়ে একটা উঁচু টাওয়ার বা মিনার তৈরি করল। আর এই টাওয়ারটাকে বসিয়ে দিল এআই চিপের ঠিক পাশে। এখন আর একটা মাত্র শিট নয়, বরং পুরো টাওয়ার একসাথে চোখের পলকে ডেটা সাপ্লাই দেয়। এই টাওয়ারের নাম হলো ‘এইচবিএম’ (HBM – High Bandwidth Memory)। আজকের দিনে এনভিডিয়া (Nvidia)-র মতো বড় কোম্পানিগুলোর যত শক্তিশালী এআই সিস্টেম আছে, তার সবই চলে এই এইচবিএম টাওয়ারের ওপর ভিত্তি করে।

বাংলাদেশের বাজারে গ্যাজেটের দাম কেন বাড়বে?

পৃথিবীর সব মেমোরি চিপ তৈরি হয় সিলিকনের গোল চাকতি বা ‘ওয়েফার’ (Wafer) থেকে। সমস্যা হলো, একটি ফ্যাক্টরি বছরে নির্দিষ্ট সংখ্যক ওয়েফারই বানাতে পারে। নতুন ফ্যাক্টরি বানাতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। তাই ফ্যাক্টরিগুলোকে বাধ্য হয়ে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয় তারা কি ওই ওয়েফার দিয়ে সাধারণ ফোনের জন্য পাতলা মেমোরি শিট বানাবে, নাকি এআই-এর জন্য সেই উঁচু টাওয়ার বানাবে?

টাওয়ার বানাতে অনেক বেশি সিলিকন খরচ হয় এবং কাজটা অত্যন্ত কঠিন হওয়ায় অনেক চিপ নষ্টও হয়। যে ওয়েফার দিয়ে হয়তো শত শত ফোনের মেমোরি বানানো যেত, সেটা দিয়ে এখন মাত্র একটা এআই টাওয়ার বানানো হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, সারা পৃথিবীতে মাত্র তিনটি কোম্পানি (Samsung, SK Hynix, এবং Micron) বিশ্বের প্রায় ৯০-৯৫ শতাংশ মেমোরি তৈরি করে। যেহেতু এআই মেমোরিতে লাভের পরিমাণ অনেক বেশি, তাই তারা সবাই এআই-এর দিকেই ঝুঁকছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালের মধ্যে সারা বিশ্বের উন্নত র‍্যামের প্রায় ৭০ শতাংশই চলে যাবে বড় বড় ডেটা সেন্টারগুলোর পেটে। ফলে সাধারণ ফোন বা ল্যাপটপের জন্য মেমোরির তীব্র হাহাকার দেখা দিচ্ছে।

আর এখানেই বাংলাদেশের সাধারণ ক্রেতাদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গাটা তৈরি হয়েছে। দামি ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলোতে মেমোরির দাম মোট খরচের খুব সামান্য অংশ। কিন্তু কম দামি বা বাজেট ফোনগুলোতে এই মেমোরির দামই পুরো ফোনের দামের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। আমাদের বাংলাদেশের স্মার্টফোন বাজার পুরোপুরি বাজেট ফোন-নির্ভর। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে আইফোন ব্যবহারকারীর হার প্রায় ৬০%, সেখানে বাংলাদেশে আইফোনের মার্কেট শেয়ার মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশের কাছাকাছি। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ Xiaomi, realme, vivo, Samsung বা Symphony-এর মতো বাজেট ফোনগুলোর ওপর নির্ভরশীল। তাই বিশ্ববাজারে মেমোরির দাম যখন বাড়ে, তখন সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লাগে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের পকেটেই।

কোম্পানিগুলো কীভাবে আপনার পকেট কাটছে?

মেমোরির দাম বাড়ার এই বিশাল খরচ কোম্পানিগুলো নিজে বহন করবে না, বরং তিনটি উপায়ে খুব চালাকির সাথে তারা এই বোঝা আপনার কাঁধেই চাপিয়ে দেয়:

ভয়ের বিষয় হলো, শুধু ফোন বা ল্যাপটপ নয়, আপনার স্মার্ট টিভি, ওয়াইফাই সংযুক্ত স্মার্ট ফ্রিজ, বা এসির ভেতরেও আজকাল এই মেমোরি চিপ থাকে। তাই মেমোরির সংকট আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সব স্মার্ট ইলেকট্রনিক্সের দামই বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এই সংকটের কি কোনো শেষ আছে?

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাহলে আজীবন দামি গ্যাজেট কিনেই যাব? সস্তা গ্যাজেটের যুগ কি শেষ? বর্তমান অবস্থা দেখলে তা-ই মনে হয়। তবে আশার আলোও আছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে গুগল এমন একটি নতুন প্রযুক্তির আভাস দিয়েছে, যা এআই-এর মেমোরি খরচ অনেক কমিয়ে আনবে। এটি ঘোষণার পরই মেমোরি কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম ধপাস করে পড়ে যায়। এছাড়া, অনেক মেমোরি কোম্পানি এখন নতুন ফ্যাক্টরি বানাচ্ছে, যেগুলোর উৎপাদন শুরু হবে ২০২৭ বা ২০২৮ সালের দিকে। তখন বাজারে মেমোরির বন্যা বয়ে গেলে দাম আবারও আগের মতো কমে আসতে পারে।

তবে এটা কি নতুন স্বাভাবিক অবস্থা নাকি শুধুই সাময়িক একটা বুদবুদ যা ফেটে যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে একটা ব্যাপার একেবারে নিশ্চিত—আপাতত এই এআই বিপ্লবের চরম মূল্য চুকাতে হচ্ছে আপনার-আমার মতো সাধারণ ক্রেতাদেরকেই।

Exit mobile version