টিআইএন (TIN) আছে কিন্তু আয় করমুক্ত সীমার নিচে—এমন হলেও প্রতি বছর রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য ২০২৬-২৭ করবর্ষের ই-রিটার্ন সেবা ইতোমধ্যে চালু করেছে। ফলে এবার কর অঞ্চলে না গিয়েই ঘরে বসে কম্পিউটার বা স্মার্টফোন দিয়েই জিরো রিটার্ন দাখিল করা যাচ্ছে, তাও মাত্র কয়েক মিনিটে।
অনেকে ভাবেন, আয় নেই বা আয় কম—তাহলে রিটার্ন দেওয়ার দরকারই বা কী। বাস্তবতা হলো, টিআইএন থাকা মানেই প্রতি বছর রিটার্ন দাখিলের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর হিসাবের শেষে প্রদেয় কর শূন্য দাঁড়ালে সেটিই জিরো রিটার্ন (Zero Return)।
জিরো রিটার্ন আসলে কী?
রিটার্ন মানে টাকা দেওয়া নয়; বরং এক আয়বছরে আপনার আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের সরকারি হিসাব জানানো। বছরের সব তথ্য সঠিকভাবে পূরণের পর যদি করযোগ্য আয় শূন্য হয় বা প্রদেয় কর শূন্য দাঁড়ায়, তাহলে সেটি জিরো ট্যাক্স রিটার্ন। অর্থাৎ আপনি রিটার্ন দিলেন, কিন্তু এক টাকাও কর দিতে হলো না।
যেমন—চাকরিজীবী যাঁর বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার নিচে, শিক্ষার্থী, গৃহকর্ত্রী, অবসরজীবী বা নতুন ব্যবসায়ী—যাঁরা টিআইএন নিয়ে রেখেছেন, তাঁদের জন্য জিরো রিটার্ন সবচেয়ে সাধারণ প্রেক্ষাপট।
টিআইএন থাকলে আয় না থাকলেও রিটার্ন কেন?
বাংলাদেশের আয়কর আইন অনুযায়ী টিআইএনধারী প্রতিটি ব্যক্তির জন্য বার্ষিক রিটার্ন দাখিল আইনত বাধ্যতামূলক। নিয়মিত রিটার্ন দিলে টিআইএনটি সক্রিয় থাকে, ব্যাংকিং কার্যক্রম, সরকারি সুবিধা, ভিসা আবেদন, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন কিংবা ঋণের ক্ষেত্রে আয়কর সার্টিফিকেট কাজে লাগে। এছাড়া রিটার্ন না দিলে পরে জরিমানা বা আইনি জটিলতার সম্মুখীন হতে হতে পারে।
রিটার্ন পূরণের আগে যা প্রস্তুত রাখবেন
কাজটি ঘরে বসে দ্রুত শেষ করতে নিচের বিষয়গুলো আগে থেকে হাতের কাছে রাখুন:
- ১২ ডিজিটের টিআইএন নম্বর
- জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)
- আপনার নামে বায়োমেট্রিকভাবে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর
- ব্যাংক হিসাবের স্টেটমেন্ট বা ব্যালেন্সের তথ্য
- চাকরিজীবী হলে বেতনের সনদ বা পে-স্লিপ
- জমি, গাড়ি, সঞ্চয়পত্র বা ঋণ থাকলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র
- পুরো বছরের আনুমানিক জীবনযাত্রার খরচের হিসাব (বাসা ভাড়া, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি)
অনলাইনে জিরো রিটার্ন দাখিলের ধাপ
এনবিআর-এর অফিসিয়াল ই-রিটার্ন পোর্টাল etaxnbr.gov.bd থেকেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়। ধাপগুলো দেখে নিন:
১. পোর্টালে প্রবেশ ও লগইন: ব্রাউজারে etaxnbr.gov.bd খুলুন। পুরোনো ব্যবহারকারী হলে টিআইএন ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন। নতুন হলে টিআইএন, এনআইডি ও নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর দিয়ে অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন।
২. রিটার্ন সাবমিশন অপশন: লগইনের পর ড্যাশবোর্ডে “রিটার্ন সাবমিশন” নির্বাচন করুন। এখানে ব্যক্তিগত তথ্য, নির্ধারণ সংক্রান্ত তথ্য (Assessment Information) ও রিটার্নের ঘরগুলো পর্যায়ক্রমে পূরণ করতে হবে।
৩. আয়ের তথ্য পূরণ: চাকরি, ব্যবসা, বাড়ি ভাড়া, ব্যাংক সুদ—যেকোনো উৎস থেকে আয় থাকলে সংশ্লিষ্ট ঘরে সঠিক পরিমাণ লিখুন। আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলেও তথ্যটি লুকাবেন না।
৪. সম্পদ, দায় ও ব্যয়ের বিবরণী: ব্যাংক ব্যালেন্স, জমি, গাড়ি, স্বর্ণালংকার, ঋণ এবং বছরব্যাপী জীবনযাত্রার ব্যয়ের হিসাব এই অংশে দিতে হবে।
৫. কর হিসাব যাচাই: সব তথ্য দেওয়ার পর সিস্টেম নিজে থেকেই প্রদেয় কর গণনা করবে। আপনার প্রকৃত তথ্য অনুযায়ী যদি ফল শূন্য আসে, তাহলে এটিই আপনার Zero Tax Return।
৬. রিটার্ন ভিউতে পুনঃপরীক্ষা: সাবমিটের আগে অবশ্যই “রিটার্ন ভিউ” অপশনে পুরো ফর্মটি দেখে নিন। নাম, টিআইএন, আয়, সম্পদ, দায়—সব ঘর ঠিকমতো বসেছে কিনা মিলিয়ে দেখুন।
৭. সাবমিট ও স্লিপ সংরক্ষণ: সব ঠিক থাকলে রিটার্ন সাবমিট করুন। সাবমিটের সঙ্গে সঙ্গেই প্রাপ্তিস্বীকার স্লিপ (Acknowledgement Slip) পাওয়া যাবে এবং ট্যাক্স সার্টিফিকেটও ডাউনলোড করা যাবে। ফাইলটি পিডিএফ আকারে ডাউনলোড করে সাবধানে সংরক্ষণ করুন।
সাধারণ ভুলগুলো থেকে সাবধান
- আয় থাকলেও “নেই” ধরে ঘর ফাঁকা রাখা
- ব্যাংক ব্যালেন্স বা সম্পদের কম বা ভুল তথ্য দেওয়া
- ব্যয়ের হিসাব আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ দেখানো
- সাবমিটের পর অ্যাকনোলেজমেন্ট স্লিপ সংরক্ষণ না করা
- মোবাইল নম্বর বা এনআইডির ভুল তথ্যে রেজিস্ট্রেশন
মনে রাখবেন, রিটার্নে ভুল বা গোপন তথ্য দিলে ভবিষ্যতে জরিমানা ও আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে। তাই যেমন আছে তেমনই সঠিক তথ্য দিন।
জিরো রিটার্নের সুবিধা
নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করলে আপনার আর্থিক প্রোফাইল সরকারি রেকর্ডে হালনাগাদ থাকে। ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক ঋণ, পাসপোর্ট ও ভিসা প্রক্রিয়াসহ নানা ক্ষেত্রে রিটার্নের প্রমাণপত্র বা অ্যাকনোলেজমেন্ট স্লিপ জরুরি কাগজ হিসেবে লাগে। এক সঙ্গে একাধিক বছরের রিটার্ন দাখিলের ধারাবাহিকতা করদাতা হিসেবে আপনার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়ায়।
২০২৬-২৭ করবর্ষের রিটার্ন দাখিলের চলতি সময়সীমা ও করমুক্ত আয়ের সর্বশেষ সীমা এনবিআর-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে জেনে নেওয়ার পরামর্শ করবিদরা দিচ্ছেন, কারণ অর্থবছরভেদে এই সীমা ও তারিখে পরিবর্তন আসতে পারে।
শেষ কথা
আয়কর রিটার্ন আর কোনো জটিল বা ভয়ের বিষয় নয়। এনবিআর-এর ই-রিটার্ন সেবার কল্যাণে যাঁর প্রদেয় কর শূন্য, তিনিও মিনিটখানেকের কাজে দায়মুক্ত হতে পারেন। আপনার টিআইএন সক্রিয় রাখতে ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে আজই নিজে বসে রিটার্নটি সম্পন্ন করুন। ধাপে ধাপে বিস্তারিত নিয়ম জানতে চোখ রাখুন—অনলাইনে জিরো রিটার্ন দাখিল ২০২৬-২৭ সম্পর্কে বিস্তারিত গাইড—এ, যেখানে প্রতিটি ধাপ সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

