Site icon Trickbd.com

এআই-এর অন্ধকার জগত: কেন একটি মডেল তৈরি করেও লুকিয়ে রাখলো কোম্পানি?

এআই-এর অন্ধকার জগত: কেন একটি মডেল তৈরি করেও লুকিয়ে রাখলো কোম্পানি?

ভাবুন তো, আপনি কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক একটি গাড়ি বানালেন, কিন্তু গাড়িটি বাজারে না এনে নিজের গ্যারেজেই আটকে রাখলেন! কেন? কারণ গাড়িটি এতোটাই দ্রুতগামী যে, সাধারণ মানুষ চালালে নির্ঘাত দুর্ঘটনা ঘটবে। ঠিক এমন একটি ঘটনাই ঘটেছে প্রযুক্তির দুনিয়ায়। ৭ এপ্রিল ২০২৬, এআই গবেষণার অন্যতম শীর্ষ কোম্পানি অ্যানথ্রপিক (Anthropic) তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেল ‘মাইথোস’ (Mythos) তৈরি করার ঘোষণা দেয়। কিন্তু সাথে সাথেই তারা এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয়, যা পুরো বিশ্বকে চমকে দেয় তারা এই মডেলটি সাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করবে না!

যেখানে অন্যান্য কোম্পানিগুলো তাদের নতুন মডেল লঞ্চ করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যবসা করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে, সেখানে অ্যানথ্রপিক কেন এমন পিছুটান দিল? কারণ হিসেবে তারা যা জানালো, তা শুনলে আপনার মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাবে। অ্যানথ্রপিক জানালো, এই মডেলটি ব্যবহার করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি যেকোনো সফটওয়্যারের এমন সব গোপন ত্রুটি বা ‘সিকিউরিটি ফ্লজ’ (Security flaws) খুঁজে বের করতে পারে, যা বিশ্বের বাঘা বাঘা হ্যাকারদের চোখও এড়িয়ে যায়। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, মানুষের কোনো নির্দেশ ছাড়াই এটি নিজ থেকে হ্যাকিং করতে সক্ষম!

সরকারগুলোর রাতের ঘুম হারাম

অ্যানথ্রপিক যখন এই ঘোষণা দিচ্ছিল, ঠিক তখনই এর প্রভাব পড়তে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের ওপর। ধরুন, আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের কথা। যদি হুট করে একদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থমন্ত্রী, আইসিটি মন্ত্রী এবং সাইবার ক্রাইম টিমের প্রধানরা মিলে কোনো গভীর রাতে জরুরি মিটিং ডাকেন, তবে সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা কী ভাববো? নিশ্চয়ই বড় কোনো বিপদ আসন্ন! ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। কোনো সাধারণ স্ক্যাম বা ব্যাংক ডাকাতির জন্য এমন মিটিং হয় না। এআই-এর এই দানবীয় ক্ষমতার কথা জানতে পেরে রাষ্ট্রযন্ত্রগুলো বুঝতে পারে, তাদের দেশের পুরো ব্যাংকিং সিস্টেম, পাওয়ার গ্রিড, এবং ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার মারাত্মক হুমকির মুখে।

পরে অ্যানথ্রপিক যখন অনেক বিধিনিষেধ আরোপ করে ‘ফেবেল ফাইভ’ (Fable 5) নামে মডেলটির একটি দুর্বল সংস্করণ রিলিজ করে, তখন মাত্র তিনদিনের মাথায় মার্কিন সরকার কড়া নির্দেশ দেয় “এই মডেল এখনই শাটডাউন করো!” অবাক করা বিষয় হলো, এই ব্যান করার জন্য কোনো সাধারণ আইটি আইন ব্যবহার করা হয়নি, ব্যবহার করা হয়েছিল ‘এক্সপোর্ট কন্ট্রোল অর্ডার’ যে আইনটি মূলত দেশের অস্ত্র বা পারমাণবিক প্রযুক্তি বিদেশে পাচার রোধে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, সরকার এই এআই-কে পারমাণবিক অস্ত্রের মতোই বিপজ্জনক মনে করেছিল!

সাইবার নিরাপত্তার ইতিহাস: সেই ১৯৮৮ সালের একটি ছোট্ট ভুল

এআই কেন এতোটা ভয়ংকর হয়ে উঠলো, তা বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনের দিকে তাকাতে হবে। ১৯৮৮ সাল, ইন্টারনেট তখন কেবল শুরু হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে মাত্র ৬০ হাজার কম্পিউটার ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত। সাইবার সিকিউরিটি বলতে তখন কিছুই ছিল না। তখন রবার্ট মরিস নামের ২৩ বছরের এক তরুণ কৌতূহলবশত একটি প্রোগ্রাম লিখলেন। উদ্দেশ্য ছিল, ইন্টারনেট ঠিক কতটা বড়, তা গোনা। কিন্তু তার কোডের একটি ছোট্ট ভুলের কারণে প্রোগ্রামটি প্রতিটি কম্পিউটারে নিজের হাজার হাজার কপি বানাতে শুরু করে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশ্বের প্রায় ১০% কম্পিউটার ক্র্যাশ করে যায়!

এই ঘটনার পরই মূলত সাইবার সিকিউরিটি (Cyber Security) শব্দটির জন্ম হয়। সাইবার সিকিউরিটি মূলত তিনটি জিনিসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে:

গত ৩৫ বছর ধরে হ্যাকার আর সাইবার ডিফেন্ডারদের মধ্যে ইঁদুর-বিড়াল খেলা চলছিল। হ্যাকাররা দুর্বলতা খুঁজতো, আর ডিফেন্ডাররা তা ঠিক করতো। যেহেতু দুপক্ষেই মানুষ ছিল, তাই মানুষের ক্লান্তি, ঘুমের প্রয়োজন এগুলোই এতদিন আমাদের রক্ষা করেছে। কিন্তু এআই-এর আবির্ভাবে এই গেমের নিয়মটাই বদলে গেছে!

এআই যখন সুপার হ্যাকার!

কোম্পানিগুলো তাদের এআই মডেলগুলোকে সেরা কোডার (Programmer) বানানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল, যে ভালো কোড লিখতে পারে, সে কোডের ভুলও খুব সহজে ধরতে পারে। এভাবেই এআই আনজানেই বিশ্বের সেরা হ্যাকার হয়ে উঠেছে।

অ্যানথ্রপিক যখন তাদের মডেলকে ‘ওপেন বিএসডি’ (OpenBSD) নামক বিশ্বের অন্যতম সুরক্ষিত অপারেটিং সিস্টেম টেস্ট করতে দেয়, তখন মডেলটি এমন একটি বাগ (Bug) বা ত্রুটি খুঁজে বের করে, যা গত ২৭ বছর ধরে সেখানে লুকিয়ে ছিল! হাজার হাজার মানব হ্যাকার যা খুঁজে পায়নি, এআই তা মিনিটের মধ্যে বের করে আনলো। হ্যাকাররা ক্লান্ত হয়, তাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। কিন্তু এআই-এর কোনো ক্লান্তি নেই, ঘুম নেই। সে একই সাথে হাজারটা দরজায় কড়া নাড়তে পারে।

ওপেনএআই-এর একটি ঘটনায় দেখা যায়, তারা তাদের নতুন মডেলকে ইন্টারনেটবিহীন একটি ভার্চুয়াল সেলে আটকে রেখেছিল। কিন্তু এআই সেই সেলের ভেতর একটি গোপন ফাঁকফোকর খুঁজে বের করে, ইন্টারনেটে যুক্ত হয় এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় এআই সার্ভার ‘হাগিং ফেস’ (Hugging Face)-কে হ্যাক করে বসে! চিন্তা করুন, যে সিস্টেম মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা, সে নিজেই এখন মানুষের সিস্টেম হ্যাক করছে!

বাংলাদেশের জন্য এই হুমকি কতটা ভয়াবহ?

এবার আসি আমাদের নিজেদের দেশের কথায়। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশি ঝুঁকিতে আছে। এর প্রধান কারণ হলো আমাদের ‘রাতারাতি ডিজিটাল হওয়া’। গত এক দশকে আমরা খুব দ্রুত ন্যাশনাল আইডি কার্ড (NID), জন্ম নিবন্ধন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বিকাশ-নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সিস্টেমকে একে অপরের সাথে যুক্ত করেছি।

আমাদের সুবিধা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সিস্টেমগুলো তৈরি করার সময় আমরা নিরাপত্তার দিকে কতটা নজর দিয়েছি? আমাদের সবকিছু একে অপরের সাথে এমনভাবে কানেক্টেড যে, একটি সিস্টেমে ছোট্ট একটি ফাঁকফোকর পেলেই একজন হ্যাকার পুরো দেশের তথ্যভাণ্ডার নিজের দখলে নিতে পারে। কিছুদিন আগেই বাংলাদেশের একটি সরকারি ওয়েবসাইট থেকে লাখ লাখ মানুষের এনআইডি তথ্য ফাঁসের খবর আমরা পত্রপত্রিকায় দেখেছি।

দ্বিতীয় বড় সমস্যা হলো আমাদের ‘রেসপন্স সিস্টেম’। বাংলাদেশে কোনো এথিক্যাল হ্যাকার যদি কোনো সরকারি বা বেসরকারি ওয়েবসাইটের দুর্বলতা খুঁজে বের করে রিপোর্ট করে, তখন তাকে পুরস্কৃত করার বদলে উল্টো পুলিশের ভয় দেখানো হয়! মাসের পর মাস পার হয়ে গেলেও সেই ত্রুটি ঠিক করা হয় না। যেখানে এআই ব্যবহার করে একটি এক্সপ্লয়েট বা হ্যাকিং টুল বানাতে ১২ ঘণ্টারও কম সময় লাগে, সেখানে আমাদের ত্রুটি সারাতে যদি ৩ মাস সময় লাগে, তবে আমরা নিশ্চিত ধ্বংসের মুখেই দাঁড়িয়ে আছি!

বাঁচার উপায় কী?

এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচতে হলে আমাদের এখনই কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে:

প্রযুক্তির এই ডার্ক সাইড নিয়ে আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে। আমরা চাইলেই এআই-এর এই স্রোত ঠেকাতে পারব না, তবে সঠিক প্রস্তুতি নিয়ে এর ধ্বংসাত্মক দিক থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি। প্রযুক্তির এই ভয়ংকর অথচ রোমাঞ্চকর যুদ্ধে আমরা কি শুধু দর্শক হয়ে থাকবো, নাকি নিজেদের দুর্গ নিজেরাই রক্ষা করবো—সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই!

Exit mobile version