বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার ইকোনোমিক করিডোর: অর্থনীতির নতুন গেম চেঞ্জার নাকি ভূ-রাজনৈতিক ফাঁদ?
ভাবুন তো, একটি মাত্র রাস্তা কীভাবে একটি দেশের পুরো অর্থনীতি, ভবিষ্যৎ এমনকি বিশ্বরাজনীতির মানচিত্র বদলে দিতে পারে! শুনতে হয়তো রূপকথার মতো লাগছে, কিন্তু ঠিক এমনই এক অবিশ্বাস্য সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর একটি নতুন প্রস্তাব শুধু বাংলাদেশেই নয়, গোটা এশিয়ার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আর সেই জাদুকরী প্রস্তাবটির নাম হলো ‘বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার ইকোনোমিক করিডোর (BCMEC)’।
প্রথম দেখায় এটিকে হয়তো দশটা সাধারণ রাস্তা বা কানেক্টিভিটি প্রজেক্টের মতোই মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালে বুঝবেন, এটি শুধু পিচঢালা কোনো পথ নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ পুরোপুরি বদলে দেয়ার এক মাস্টারপ্ল্যান। একই সাথে এই একটি করিডোর বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের যুগ যুগ ধরে চলে আসা ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন করে লিখতে পারে। আর তাই তো, পশ্চিমা বিশ্ব থেকে শুরু করে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর তীক্ষ্ণ নজর এখন বাংলাদেশের দিকে। সবার মনে একটাই প্রশ্ন এটি কি বাংলাদেশের দক্ষিণ এশিয়ার ‘বাণিজ্যিক হাব’ হয়ে ওঠার শুরু, নাকি আমরা পা দিতে যাচ্ছি এক জটিল স্নায়ুযুদ্ধের রণক্ষেত্রে?
কূটনীতির এক নতুন অধ্যায়
গত ২১ থেকে ২৬ জুন অনুষ্ঠিত হয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম অফিশিয়াল বিদেশ সফর। এই সফরটি নানা কারণেই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক কূটনৈতিক মিশন। সফরের শুরুটা হয়েছিল মালয়েশিয়া দিয়ে, যার মূল লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে আমাদের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক দৃঢ় করা। এরপর ২২ জুন তিনি উড়াল দেন চীনের উদ্দেশ্যে। সেখানে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং থেকে শুরু করে চীনের শীর্ষ নেতাদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক হয়।
এই সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, এবং অবকাঠামো উন্নয়নে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক (MOU) ও চুক্তি সই হয়। এর মধ্যে আনোয়ারায় চাইনিজ স্পেশাল ইকোনমিক জোন তৈরি, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং বহুল কাঙ্ক্ষিত তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের মতো মেগা উদ্যোগগুলো ছিল। এমনকি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের নিয়ে ‘টু প্লাস টু’ ডায়লগ চালুরও প্রস্তাব দেয় চীন। কিন্তু এত শত চুক্তির ভিড়ে ২৬ জুনের একটি প্রস্তাব মুহূর্তেই যেন সব আলো কেড়ে নিল। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজ মুখে প্রস্তাব দিলেন চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত একটি সরাসরি ইকোনোমিক করিডোর গড়ে তোলার। কিন্তু কেন এই করিডোর নিয়ে এত মাতামাতি? এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক রোমাঞ্চকর ভূ-রাজনৈতিক গল্প।
চীনের আড়ালে থাকা আসল লক্ষ্য: ‘মালাক্কা ডিলেমা’
চীনের দিক থেকে চিন্তা করলে এই করিডোরটি শুধু একটি রাস্তা নয়, এটি তাদের বেঁচে থাকার এক নতুন লাইফলাইন। চীনের এই তাগিদ বুঝতে হলে আপনাকে জানতে হবে ‘মালাক্কা প্রণালী’ বা ‘Strait of Malacca’ সম্পর্কে।
মালাক্কা প্রণালী হলো মালয় উপদ্বীপ এবং ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের মাঝখানের একটি সরু জলপথ। এটি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি বিশাল জাহাজ এই পথ পাড়ি দেয়। প্রতি বছর প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের গ্লোবাল ট্রেড এই পথেই হয়। কিন্তু চীনের জন্য সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো তাদের মোট বাণিজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ এবং জ্বালানি তেল আমদানির প্রায় ৮৩ শতাংশই এই একটি মাত্র সরু পথের ওপর নির্ভরশীল!
এই ভয় থেকেই চীন দীর্ঘদিন ধরে একটি বিকল্প পথের সন্ধানে মরিয়া। পূর্বে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক করিডোর তৈরির চেষ্টা হলেও, দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূ-রাজনৈতিক রেষারেষির কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। তাই এবার চীন সরাসরি বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারকে নিয়ে এই নতুন রুট তৈরি করতে চাইছে। এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে সরাসরি বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত একটি স্থলপথ তৈরি হবে। ফলে মালাক্কা প্রণালীর ওপর চীনের নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমে আসবে এবং বিশ্ববাণিজ্যে তারা আরও দ্রুত ও নিরাপদে যুক্ত হতে পারবে।
বাংলাদেশের লাভ কোথায়?
চীনের স্বার্থ তো বুঝলাম, কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের কী লাভ? সহজ কথায়, এই করিডোরটি বাংলাদেশের জন্য এক স্বপ্নের চেয়েও বড় কিছু হতে পারে। বাংলাদেশ যদি এই ট্রান্সপোর্ট ও রিজিওনাল ট্রেড নেটওয়ার্কে সফলভাবে যুক্ত হতে পারে, তবে আমরা শুধু দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ হিসেবে আটকে থাকব না। আমরা হয়ে উঠব দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীনের মধ্যকার এক ‘গোল্ডেন হাব’ বা সংযোগস্থল।
একটু বাস্তব ডেটার দিকে তাকাই। বাংলাদেশ বর্তমানে তার ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের কাঁচামালের জন্য সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল চীনের ওপর। আমাদের গর্বের পোশাক শিল্প (RMG), ঔষধ শিল্প, ইলেকট্রনিক্স সবকিছুর কাঁচামাল আসে চীন থেকে। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে প্রতি বছর বাংলাদেশ চীন থেকে প্রায় ১৬ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করছে। বিপরীতে আমাদের রপ্তানি মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
বর্তমানে সমুদ্রপথে চীন থেকে পণ্য আসতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যায়। কিন্তু এই ওভারল্যান্ড করিডোরটি চালু হলে:
- সময় ও খরচ বাঁচবে: কাঁচামাল আমদানির ট্রানজিট টাইম এবং ট্রান্সপোর্টেশন কস্ট ম্যাজিকের মতো কমে আসবে। ফলে বিশ্ববাজারে আমাদের পণ্যের দাম আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
- বিনিয়োগের বন্যা: যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে চীনের অনেক বড় বড় কারখানা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে। আনোয়ারা স্পেশাল ইকোনোমিক জোনের মতো আরও অনেক জোনে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে আমাদের দেশের লাখ লাখ তরুণের।
- নতুন বাজারের হাতছানি: এই পথ ধরে আমরা শুধু চীন নয়, বরং থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম বা লাওসের মতো আসিয়ানের (ASEAN) দেশগুলোর সাথে সরাসরি স্থলবাণিজ্যে যুক্ত হতে পারব। যা আমাদের তৈরি পোশাকের ওপর একক নির্ভরশীলতা কমিয়ে কৃষিজাত পণ্য, ট্যুরিজম ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য রপ্তানির বিশাল সুযোগ তৈরি করবে।
রোহিঙ্গা সংকট ও মিয়ানমারের অস্থিরতা
সবই তো ভালো লাগছে শুনতে, কিন্তু বাস্তবতার মাঠে একটা বিশাল বড় বাধা দাঁড়িয়ে আছে। আর সেটি হলো মিয়ানমার।
প্রস্তাবিত এই করিডোরটি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ওপর দিয়ে যাওয়ার কথা। আর রাখাইন মানেই আমাদের জন্য এক দগদগে ক্ষত। এই রাখাইন থেকেই জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা প্রায় দশ থেকে বারো লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আজ বাংলাদেশের বুকে আশ্রয় নিয়ে আছে। মিয়ানমারের ভেতরের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক জান্তা এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাত এই মেগা প্রজেক্টের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ইমোশন এবং জাতীয় নিরাপত্তার জায়গা থেকে চিন্তা করলে, মিয়ানমারের সাথে কোনো মেগা প্রজেক্টে যাওয়ার আগে রোহিঙ্গা সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান হওয়া অপরিহার্য। ১০ লাখেরও বেশি ভুক্তভোগী মানুষকে আমাদের দেশে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে রাখাইনের ওপর দিয়ে শান্তির বাণিজ্য রুট তৈরি করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে গভীর ভাবনার অবকাশ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই করিডোরের কাজ এগিয়ে নেয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে চীনকে অবশ্যই তাদের প্রভাব খাটিয়ে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধ্য করতে হবে। অন্যথায়, এই করিডোর আমাদের জন্য আশীর্বাদের বদলে এক দীর্ঘস্থায়ী গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পরাশক্তিগুলোর মাথাব্যথা ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
মিয়ানমার ইস্যুর বাইরেও আরেকটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের যে বিশাল সমুদ্রসীমা রয়েছে, তা কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ও পশ্চিমা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই করিডোরের মাধ্যমে চীন মূলত বঙ্গোপসাগরে তাদের সামরিক ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
এর ফলে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এই উদ্যোগকে খুব সহজভাবে নেবে না। বিশ্ব পরাশক্তিগুলো কোনোভাবেই চাইবে না যে বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে চলে যাক। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই পরাশক্তিগুলোর রেষারেষির মাঝে নিজেদের নিরপেক্ষতা ও ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ এই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা। কোনো নির্দিষ্ট বলয়ে ঢুকে না গিয়ে, শুধুমাত্র নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দরকষাকষি করতে হবে বাংলাদেশকে।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার ইকোনোমিক করিডোর কোনো সাধারণ চুক্তি নয়; এটি আগামী দশকের জন্য বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারক একটি প্রকল্প হতে পারে। যদি আমরা ঠিকমতো গুটি সাজাতে পারি, তবে এই করিডোর আমাদেরকে এক নতুন অর্থনৈতিক উচ্চতায় নিয়ে যাবে। কিন্তু এই পথ মোটেও মসৃণ নয়। রোহিঙ্গা সংকটের সম্মানজনক সমাধান এবং বিশ্ব রাজনীতিতে চরম ভারসাম্য বজায় রাখার ওপরই নির্ভর করছে এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন।
আমরা আশা করি, আমাদের নীতিনির্ধারকরা দেশের সার্বভৌমত্ম এবং সাধারণ মানুষের আবেগকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে এই সিদ্ধান্ত নেবেন। যেন এই করিডোর আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ হয়, কোনো পরাশক্তির দাবার গুটি হওয়ার ফাঁদ না হয়।

