নিকোলা টেসলা এবং ৩, ৬, ৯ এর মহাজাগতিক রহস্য: এক উপেক্ষিত জিনিয়াসের গল্প

সময়টা ১৯৩৩ সাল। নিউইয়র্ক শহরের বিখ্যাত ‘হোটেল নিউইয়র্কার’। প্রতিদিন রাতে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়। এক ভদ্রলোক তার রুম থেকে বের হন, কিন্তু তিনি কখনোই লিফট ব্যবহার করেন না। সিঁড়ি ভেঙে তিনি সেই ফ্লোরে যান, যেখানে ডাইনিং রুম অবস্থিত। তবে ডাইনিং রুমে ঢোকার আগে তিনি একটি অদ্ভুত কাজ করেন। তিনি ডাইনিং রুমের চারদিকে ঠিক তিনটি চক্কর কাটেন। দুইবার নয়, চারবারও নয় ঠিক তিনবার। এরপর তিনি ভেতরে যান। খাবার খাওয়ার আগে নিজের প্লেটটি ঠিক ১৮টি ন্যাপকিন দিয়ে পরিষ্কার করেন। এক বেশিও নয়, এক কমও নয়। তিনি হোটেলে রুম নেওয়ার সময়ও একটি অদ্ভুত শর্ত জুড়ে দেন তার রুম নম্বর এমন হতে হবে যাকে ৩, ৬ অথবা ৯ দিয়ে ভাগ করা যায়! অন্য কোনো রুমে তিনি থাকতে রাজি নন।

গল্পটা শুনে কি মনে হচ্ছে লোকটি পাগল ছিলেন? তৎকালীন অনেকেই হয়তো তাই ভাবতেন। কিন্তু একবার ভাবুন তো, এই মানুষটিই সেই ব্যক্তি যিনি বিশ্বকে অল্টারনেটিং কারেন্ট (AC Current) উপহার দিয়েছেন, যার দৌলতে আজ আমার-আপনার ঘরের লাইট-ফ্যান চলছে। গুগল সার্চ বা রেডিওর জনক হিসেবে মার্কনির নাম আমরা জানলেও, তার অনেক আগেই রেডিওর মূল তত্ত্ব তিনি দাঁড় করিয়েছিলেন। এক্স-রে, নিয়ন সাইন, রিমোট কন্ট্রোল, রোবোটিক্স এসবকিছুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এই মানুষটিই। আধুনিক বিজ্ঞান ও সভ্যতার এই রূপকারের নাম নিকোলা টেসলা (Nikola Tesla)

টেসলার জীবনের অনেক কিছুই সাধারণ মানুষের বোধগম্য ছিল না। বিশেষ করে ৩, ৬ এবং ৯ এই তিনটি সংখ্যার প্রতি তার এক তীব্র মোহ ছিল। কিন্তু কেন? তার মৃত্যুর পর আমেরিকান সরকার কেন তড়িঘড়ি করে তার সব ব্যক্তিগত নোটবুক বাজেয়াপ্ত করে ৭০ বছরের জন্য গোপন বা ‘ক্লাসিফাইড’ করে দিয়েছিল? একজন মৃত মানুষের ডায়রিতে এমন কী লুকিয়ে ছিল? চলুন, আজ সেই রহস্যের পরতগুলো একটু একটু করে উন্মোচন করি।

ঝড়ের রাতে জন্ম নেওয়া ‘আলোর সন্তান’

১৮৫৬ সালের ১০ জুলাই মধ্যরাতে সার্বিয়ায় প্রচণ্ড এক বজ্রপাত ও ঝড়ের মধ্যে জন্ম নেন নিকোলা টেসলা। জন্মের সময় প্রবল বিদ্যুৎ চমকানো দেখে ধাত্রী ভয় পেয়ে তার মাকে বলেছিলেন, “এই বাচ্চা ঝড়ের রাতে জন্মেছে, এ হবে অন্ধকারের সন্তান!” কিন্তু তার মা দৃঢ় স্বরে জবাব দিয়েছিলেন, “না, ও হবে আলোর সন্তান।” সত্যিই তিনি বিশ্বকে আলোয় ভরিয়ে দিয়েছিলেন।

ছোটবেলা থেকেই টেসলা ছিলেন অন্যদের চেয়ে আলাদা। মাত্র ৭ বছর বয়সে তিনি পোকামাকড় দিয়ে চালিত একটি মোটর বানিয়ে ফেলেন। ১২ বছর বয়সে তিনি নিজের মনের ভেতরই যেকোনো থ্রিডি (3D) মেশিনের ডিজাইন করতে পারতেন। টেসলার সবচেয়ে বড় সুপারপাওয়ার ছিল তার ফটোগ্রাফিক মেমরি বা স্মৃতিশক্তি। বিজ্ঞানের বইগুলোতে সাধারণত লেখা থাকে না যে, টেসলা কোনো মেশিন বানানোর আগে কাগজ-কলম ব্যবহার করতেন না। তিনি পুরো মেশিনটি নিজের কল্পনায় তৈরি করতেন, কল্পনায় সেটি চালাতেন, ত্রুটি বের করতেন এবং সমাধানও করতেন। যখন কল্পনায় সিমুলেশন ১০০ ভাগ নিখুঁত হতো, কেবল তখনই তিনি বাস্তবে সেটি বানাতে হাত দিতেন। আর বাস্তবে তার বানানো যন্ত্রে কখনোই কোনো ভুল হতো না! তিনি আটটি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন এবং যেকোনো বই একবার পড়লেই তা শব্দে শব্দে মনে রাখতে পারতেন।

বঞ্চনার শুরু: এডিসনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা

১৮৮৪ সালে টেসলা নিউইয়র্কে আসেন এবং বিখ্যাত বিজ্ঞানী থমাস এডিসনের সাথে কাজ শুরু করেন। তখন এডিসন ডাইরেক্ট কারেন্ট (DC) নিয়ে কাজ করছিলেন, যা খুব বেশি দূর পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাঠাতে পারতো না। টেসলা তাকে তার অল্টারনেটিং কারেন্ট (AC)-এর ধারণা দেন। এডিসন তা উড়িয়ে দিলেও টেসলাকে তার কোম্পানিতে চাকরি দেন। এডিসন কথা দেন, টেসলা যদি তার ডিসি মোটরগুলোর নকশা উন্নত করে দিতে পারেন, তবে তাকে ৫০ হাজার ডলার (যা বর্তমান হিসেবে মিলিয়ন ডলারের সমান) বোনাস দেবেন।

টেসলা দিনরাত এক করে এক বছরের মধ্যে এডিসনের সিস্টেমকে অভাবনীয় মাত্রায় উন্নত করে দেন। কিন্তু যখন তিনি বোনাসের টাকা চাইলেন, এডিসন হেসে বললেন, “টেসলা, তুমি তো দেখছি আমেরিকান রসিকতা একেবারেই বোঝো না!” এই বঞ্চনায় টেসলার হৃদয় ভেঙে যায়। তিনি চাকরি ছেড়ে দেন এবং পরবর্তীতে নিজের কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে ‘এসি কারেন্ট’ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেন। আজ সারা পৃথিবী এডিসনের ডিসি নয়, বরং টেসলার এসি কারেন্ট ব্যবহার করছে।

বিনামূল্যে বিদ্যুতের স্বপ্ন এবং পুঁজিপতিদের লোভ

টেসলার কাছে অর্থ বা খ্যাতির কোনো মোহ ছিল না, তিনি মানবজাতির জন্য কিছু করতে চেয়েছিলেন। ১৯০১ সালে নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডে তিনি ‘ওয়ার্ডেনক্লিফ টাওয়ার’ (Wardenclyffe Tower) নির্মাণ শুরু করেন। এটি ছিল ৫৭ মিটার উঁচু একটি টাওয়ার, যার ভিত্তি মাটির ৩৬ মিটার গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর উদ্দেশ্য কী ছিল জানেন? পুরো বিশ্বকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ‘ওয়্যারলেস’ বা তারবিহীন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা!

টেসলা বিশ্বাস করতেন যে, আমাদের এই পৃথিবী নিজেই একটি বিশাল ব্যাটারি বা কন্ডাক্টর। যদি সঠিক ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ এই টাওয়ার থেকে পাঠানো যায়, তবে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে, যেকোনো ঘরে কোনো তার ছাড়াই বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এই প্রজেক্টের অর্থায়ন করেছিলেন আমেরিকার তৎকালীন সবচেয়ে বড় ব্যাংকার জে. পি. মরগান। কিন্তু যখন মরগান বুঝতে পারলেন যে, বিদ্যুৎ যদি বাতাসে বিনামূল্যে ভেসে বেড়ায়, তবে তিনি ‘মিটার’ বসাবেন কোথায়? আর মানুষের কাছ থেকে বিল কীভাবে আদায় করবেন? তখন তিনি ফান্ডিং বন্ধ করে দেন।

পুঁজিবাদের নির্মম থাবায় টেসলার টাওয়ারটি নিলামে ওঠে এবং ১৯১৭ সালে ডিনামাইট দিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। মানবজাতির বিনামূল্যে বিদ্যুৎ পাওয়ার স্বপ্ন চিরদিনের জন্য ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

৩, ৬ এবং ৯-এর মহাজাগতিক গণিত (Vortex Math)

মৃত্যুর পর টেসলার যে নোটবুকগুলো এফবিআই (FBI) বাজেয়াপ্ত করেছিল, তা ৭০ বছর পর রিলিজ করা হলে গবেষকরা চমকে যান। টেসলা প্রতিদিন একটি গাণিতিক হিসাব মেলাতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে এই মহাবিশ্বের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে ৩, ৬ এবং ৯ সংখ্যার মাঝে।

একটু খেয়াল করুন। কোষ বিভাজনের প্যাটার্নটি দেখুন: ১ থেকে ২, ২ থেকে ৪, ৪ থেকে ৮, ৮ থেকে ১৬, ১৬ থেকে ৩২, ৬৪, ১২৮… ইত্যাদি। এবার যদি আমরা দুই অঙ্কের সংখ্যাগুলোকে যোগ করে এক অঙ্কে নিয়ে আসি, তবে কী দাঁড়ায়?
১৬ = ১+৬ = ৭
৩২ = ৩+২ = ৫
৬৪ = ৬+৪ = ১০ = ১+০ = ১
১২৮ = ১+২+৮ = ১১ = ১+১ = ২

পুরো প্যাটার্নটি দাঁড়ায়: ১, ২, ৪, ৮, ৭, ৫। এই প্যাটার্নটি অসীম পর্যন্ত চলতে থাকে। কিন্তু লক্ষ্য করুন, এই পুরো প্যাটার্নে ৩, ৬ এবং ৯ সংখ্যা তিনটি অনুপস্থিত! টেসলার মতে, ১,২,৪,৮,৭,৫ হলো আমাদের ত্রিমাত্রিক (3D) পার্থিব জগতের প্যাটার্ন। আর ৩ ও ৬ হলো উচ্চতর মাত্রার, এবং ৯ (নয়) হলো সবকিছুর নিয়ন্তা বা মাস্টার কন্ট্রোলার।

জ্যামিতির দিকে তাকান। একটি বৃত্তের মোট কোণ ৩৬০ ডিগ্রি (৩+৬+০ = ৯)। বৃত্তের অর্ধেক ১৮০ ডিগ্রি (১+৮+০ = ৯)। এর অর্ধেক ৯০ ডিগ্রি (৯+০ = ৯), তার অর্ধেক ৪৫ ডিগ্রি (৪+৫ = ৯)। অসীম পর্যন্ত ভাগ করলেও যোগফল সবসময় ‘৯’ আসবে। ত্রিভুজ (১৮০° = ৯), চতুর্ভুজ (৩৬০° = ৯), পঞ্চভুজ (৫৪০° = ৯)—যেকোনো বহভুজের কোণের যোগফল সবসময় ৯ হয়। ৯ এমন একটি সংখ্যা, যা মহাবিশ্বের সবকিছুর মাঝে আছে, কিন্তু নিজে কখনো বদলায় না। ঠিক যেন কোনো এক ঐশ্বরিক শক্তির গাণিতিক রূপ!

শক্তি, কম্পন এবং প্রাচ্যের দর্শন

ইন্টারনেটে টেসলার নামে একটি উদ্ধৃতি খুব জনপ্রিয় “If you knew the magnificence of 3, 6 and 9, you would have a key to the universe.” মজার ব্যাপার হলো, ব্যাপক গবেষণা করেও টেসলার কোনো নথিতে এই হুবহু লাইনটি পাওয়া যায়নি! তবে তিনি যা বলেছিলেন, তা এর চেয়েও অনেক বেশি গভীর।

“If you want to find the secrets of the universe, think in terms of energy, frequency and vibration.”
(মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন করতে চাইলে শক্তি, কম্পাঙ্ক এবং কম্পনের দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করুন।)

১৮৯৬ সালে নিউইয়র্কে টেসলার সাথে ভারতের প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক গুরু স্বামী বিবেকানন্দের দেখা হয়। বিবেকানন্দ ব্যাখ্যা করেছিলেন যে মহাবিশ্ব মূলত দুটি উপাদানে গঠিত ‘প্রাণ’ (Energy) এবং ‘আকাশ’ (Space)। পদার্থ হলো ঘনীভূত শক্তিরই একটি রূপ। টেসলা অবাক হয়ে দেখলেন, তিনি ল্যাবরেটরিতে গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে যা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন, প্রাচ্যের বৈদিক দর্শন হাজার বছর আগেই তা বলে গেছে!

এরপর থেকে টেসলা তার বৈজ্ঞানিক জার্নালগুলোতে সংস্কৃত শব্দ (যেমন: প্রাণ, আকাশ) ব্যবহার করতে শুরু করেন। শুধু বৈদিক দর্শনই নয়, ইসলামের ‘রূহ’-এর ধারণার সাথেও এর চমৎকার মিল রয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে, “রূহ হলো আমার রবের আদেশ ঘটিত বিষয়।” অর্থাৎ, রূহ বা এনার্জি হলো এক পরম সত্তার নির্দেশে পরিচালিত শক্তি। বিজ্ঞান আর আধ্যাত্মিকতা যেন টেসলার ভাবনায় এক বিন্দুতে এসে মিলেছিল।

রুম নম্বর ৩৩২৭: এক নিঃসঙ্গ প্রস্থান

৭ জানুয়ারি, ১৯৪৩ সাল। নিউইয়র্কারের একটি ছোট হোটেল রুম। রুম নম্বর ৩৩২৭ (৩+৩+২+৭ = ১৫, এবং ১+৫ = )। হ্যাঁ, টেসলা তার জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের জন্যও এমন একটি রুম বেছে নিয়েছিলেন, যার গাণিতিক রুট সেই ৩, ৬, ৯-এর চক্রেই পড়ে।

বিশ্বকে বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত করা এই মানুষটি মারা গিয়েছিলেন একদম একা, নিঃস্ব এবং কপর্দকশূন্য অবস্থায়। মৃত্যুর পর তার হোটেলের ভাড়া মেটানোর মতো অর্থও তার কাছে ছিল না। তার নামে ৩০০টিরও বেশি পেটেন্ট ছিল, অথচ তিনি ছিলেন রিক্ত। মৃত্যুর পরপরই এফবিআই এজেন্ট অটো স্করজেনি তার রুমে ঢুকে সমস্ত গবেষণাপত্র বাজেয়াপ্ত করেন।

পুঁজিপতিরা হয়তো তার ফ্রি এনার্জির স্বপ্নকে ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হয়তো তার নোটবুকগুলোকে তালাবদ্ধ করে ৭০ বছর লুকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু মহাবিশ্বের সেই ৩, ৬ এবং ৯-এর প্যাটার্নকে তারা মুছে ফেলতে পারেনি। সেল বা কোষ আজীবন ১,২,৪,৮ প্যাটার্নেই বিভক্ত হবে, আর বৃত্ত আজীবন সেই ৯-এর ঘরেই ফিরে আসবে। নিকোলা টেসলা হয়তো আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু মহাবিশ্বের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা তার আবিষ্কার করা সেই ‘কোড’ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় কিছু মানুষ তাদের সময়ের চেয়ে এতটাই এগিয়ে থাকেন যে, সমসাময়িক পৃথিবী তাদের ধারণ করার যোগ্যতা রাখে না।