আপওয়ার্ক (Upwork) একসময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং জনপ্রিয় ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম। হাজারো তরুণের কাছে এটি ছিল রাত জেগে কাজ করে স্বপ্ন বুনে যাওয়ার একটি নিরাপদ জায়গা। কিন্তু আজ? আজ সেই চেনা আপওয়ার্ক যেন ধুঁকছে। তাদের আয়ের রেখা থমকে গেছে, মার্কেট ক্যাপ ৭.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ৮৬% ধসে গিয়ে মাত্র ১ বিলিয়নে ঠেকেছে। বাধ্য হয়ে গণহারে কর্মী ছাঁটাই করছে প্রতিষ্ঠানটি।

আর সবচেয়ে হতাশার ব্যাপার হলো, এই পতনের জন্য বাইরের কোনো প্রতিযোগী নয়, আপওয়ার্ক নিজেই দায়ী। যখন আপনি আপনার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যবহারকারীদের থেকে প্রতিটি পয়সা নিংড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন ঠিক এমনই হয়। চলুন, আজ গল্প করি আপওয়ার্কের পতনের পেছনের অজানা কাহিনি নিয়ে, যা প্রতিটি ফ্রিল্যান্সারের বুকের ভেতরের চাপা ক্ষোভের গল্প।

সোনালী দিনগুলো ও বিশ্বাসের শুরু

একটু পেছনের দিকে ফিরে তাকাই। ২০১০-এর দশকে রিমোট ওয়ার্ক বা ঘরে বসে কাজ করাটা আজকের মতো এত স্বাভাবিক ছিল না। ক্লায়েন্টরা বুঝতে পারতেন না, যে মানুষটা হাজার মাইল দূরে বসে আছে, তাকে কীভাবে ম্যানেজ করবেন! তিনি কি আসলেই ১০ ঘণ্টা কাজ করেছেন, নাকি মাত্র ২ ঘণ্টা করে বাকি সময় অন্য কাজ করেছেন?

এই সমস্যা সমাধানে আপওয়ার্ক (তখন যার নাম ছিল ইল্যান্স-ওডেস্ক) নিয়ে এলো টাইম ট্র্যাকিং, অ্যাক্টিভিটি লগ এবং স্ক্রিনশট ফিচার। অনেকের কাছে এটা একটু বিরক্তিকর মনে হলেও, দিন শেষে এটা ফ্রিল্যান্সারদেরই সুরক্ষা দিত। একজন ফ্রিল্যান্সারের ভাষায়,

“আমার মাত্র একবার ক্লায়েন্টের সাথে কাজের ঘণ্টা নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল। আর আমি জিতেছিলাম কারণ আমার কাজের স্ক্রিনশটগুলো প্রমাণ করেছিল যে আমি সত্যিই তার প্রজেক্টে কাজ করছিলাম।”

তখন ফ্রিল্যান্সারদের জন্য নিয়মটা খুব সহজ আর চমৎকার ছিলযেকোনো কাজের ওপর ফ্ল্যাট ১০% কমিশন। সবাই খুশি! কিন্তু, আপওয়ার্কের এই সুন্দর রূপটা বেশিদিন টিকল না।

২০% ফি এবং ‘কানেক্টস’ বাণিজ্যের নির্মম ফাঁদ

২০১৬ সালের মে মাসে সিইও স্তেফান কাসরিয়েল এক নতুন নিয়ম আনলেন ‘স্লাইডিং ফি’। প্রথম ৫০০ ডলার আয়ের ওপর দিতে হবে ২০% ফি, ৫০০ থেকে ১০,০০০ ডলারের মধ্যে ১০% এবং তার বেশি হলে মাত্র ৫%।

শুনতে হয়তো অনেককে ছাড় দেওয়ার মতো মনে হচ্ছে, তাই না? কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভয়াবহ। আপওয়ার্কের বেশিরভাগ কাজই ছিল ছোট প্রজেক্ট—যেমন একটা লোগো বানানো, ওয়েবসাইট ঠিক করা বা একটা স্ক্রিপ্ট লেখা। ফলে বেশিরভাগ ফ্রিল্যান্সার একটা ক্লায়েন্টের কাছ থেকে ৫০০ ডলার আয়ের গণ্ডি পেরোতেই পারতেন না। তাদের ঘাড়ে আজীবন ওই ২০% ফি-এর খড়গ ঝুলতে থাকল। এখানেই শেষ নয়, ক্লায়েন্টদের ওপরও ২.৭৫% প্রসেসিং ফি চাপিয়ে দেওয়া হলো।

এরপর এলো সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায় ‘কানেক্টস’ (Connects)। আগে ফ্রিল্যান্সাররা ইচ্ছামতো জবে প্রপোজাল পাঠাতে পারতেন। কিন্তু নতুন নিয়মে তাদের কানেক্টস নামের ভার্চুয়াল টোকেন কিনতে বাধ্য করা হলো। ১.৬১ ডলার দিয়ে ১০টি কানেক্টস কিনতে হতো। একটা ভালো চাকরিতে আবেদন করতে ৭ থেকে ২৫টি পর্যন্ত কানেক্টস লাগত! ভাবুন তো, আপনি একটা চাকরির আবেদন করার জন্যই টাকা দিচ্ছেন, অথচ চাকরিটা পাবেন কি না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই!

ধীরে ধীরে ফ্রি কানেক্টসের সংখ্যা ৬০ থেকে নামিয়ে ২০-এ আনা হলো। আর আপওয়ার্ক কর্তৃপক্ষ অদ্ভুত যুক্তি দিয়ে বলতে শুরু করল, “এতে নাকি ফ্রিল্যান্সারদেরই ভালো হবে, প্রতিযোগিতা কমবে!” যেন বিডিজবস-এ সিভি জমা দিতে গেলেই আপনার পকেট থেকে টাকা কেটে নিচ্ছে, আর বলছে এটা আপনারই ভালোর জন্য!

মহামারির জোয়ার এবং নতুন শোষণের শুরু

কোভিড-১৯ মহামারির সময় যখন পুরো পৃথিবী স্থবির হয়ে পড়েছিল, তখন রিমোট ওয়ার্কের এক অভাবনীয় জোয়ার আসে। পরিসংখ্যান বলছে, ওই সময়ে জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্মের প্রায় অর্ধেক তরুণ-তরুণী এই পেশায় পা রাখেন। আপওয়ার্কের রেভিনিউ হু হু করে বাড়তে লাগল—৩০০ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ৫০০ মিলিয়ন ডলার! শেয়ারের দাম বেড়ে ৬০.৭০ ডলারে পৌঁছাল।

বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, আপওয়ার্ক তো সফলতার চূড়ায়! কিন্তু ভেতরের খবর ছিল ভিন্ন। এত এত আয়ের পরও আপওয়ার্ক কোনো লাভের মুখ দেখছিল না। আর বিনিয়োগকারীদের খুশি করতে তারা ফ্রিল্যান্সারদের ওপর শুরু করল নতুন স্টিম রোলার।

২০২৩ সালের এপ্রিলে তারা আবার আগের সেই ফ্ল্যাট ১০% নিয়মে ফিরে এলো। নতুনদের জন্য এটা ভালো খবর হলেও, যারা বছরের পর বছর ঘাম ঝরিয়ে ৫% ফি-এর স্তরে পৌঁছেছিলেন, তাদের মাথায় যেন বাজ পড়ল! তাদের ফি রাতারাতি দ্বিগুণ হয়ে গেল। কারণ আপওয়ার্ক বুঝতে পেরেছিল, এই টপ-রেটেড ফ্রিল্যান্সারদের থেকেই সবচেয়ে বেশি টাকা আসে। আপওয়ার্ক তাদের সবচেয়ে লয়াল ব্যবহারকারীদের সাথেই এক প্রকার বেইমানি করল।

২০২৫ এর অন্ধকার অ্যালগরিদম: ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’

ফ্রিল্যান্সারদের ধৈর্যের শেষ বাঁধ ভেঙে যায় ২০২৫ সালে। আপওয়ার্ক ১০% নিয়মটাও বাতিল করে নিয়ে আসে এক লুকানো অ্যালগরিদম ‘ভ্যারিয়েবল ফি’ (Variable Fee)। এখন ফি হবে ০% থেকে ১৫% এর মধ্যে, যা নির্ভর করবে মার্কেটের চাহিদা, আপনার স্কিল এবং তাদের নিজস্ব এক গোপনীয় অ্যালগরিদমের ওপর।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, জবে প্রপোজাল সাবমিট করার আগে আপনি জানতেই পারবেন না আপনার কাছ থেকে কত শতাংশ ফি কাটা হবে! কোনো স্বচ্ছতা নেই। দুজন ফ্রিল্যান্সার একই কাজের জন্য আবেদন করলেও তাদের ফি আলাদা হতে পারে। তারা বিজ্ঞাপন দিল “০% ফি”-এর, কিন্তু বাস্তবে বেশিরভাগ ফ্রিল্যান্সারকেই ১০-১৫% ফি গুনতে হচ্ছিল। একে তো কানেক্টস কেনার জ্বালা, তার ওপর জবের টাকা তোলার সময় ফি, আবার আয়ের ওপর এই অজানা পার্সেন্টেজের কোপ!

ক্লায়েন্টরাও শান্তিতে ছিল না। একটা জবে ফ্রিল্যান্সার হায়ার করতে গেলে তাদের দিতে হতো সাবস্ক্রিপশন ফি, প্রসেসিং ফি, আর নতুন করে যোগ হওয়া ৪.৯৫ ডলারের কন্ট্রাক্ট ফি। ফলে ক্লায়েন্ট এবং ফ্রিল্যান্সার উভয়ের মধ্যেই এক ধরনের তিক্ততা তৈরি হলো।

শেষ পরিণতি: এআই-এর থাবা এবং এক নতুন অধ্যায়

২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে এসে দেখা গেল, আপওয়ার্কের গ্রোথ মাত্র ১%। তাদের সোনালী দিন শেষ। মে মাসে তারা তাদের কোম্পানির ২৪% কর্মী (প্রায় ১৪৫ জন) ছাঁটাই করার ঘোষণা দেয়।

ভাবুন তো, আপনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নিয়ে একটা সুন্দর প্রপোজাল লিখলেন। নিজের গাঁটের টাকা খরচ করে কানেক্টস ব্যবহার করে সেটা জমাও দিলেন। কিন্তু কয়েক দিন পর দেখলেন, ক্লায়েন্ট আপনার প্রপোজালটা খুলেও দেখেনি!

এদিকে ফ্রিল্যান্সাররাও আর বসে নেই। বাজারে আরও অনেক নতুন এবং স্বচ্ছ প্ল্যাটফর্ম এসেছে। ফ্রিল্যান্সাররা আপওয়ার্ক ছেড়ে সেসব প্ল্যাটফর্মে পাড়ি জমাচ্ছেন। আর কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে এআই (AI)। চ্যাটজিপিটি আসার পর আপওয়ার্কে রাইটিং বা লেখার কাজ কমে গেছে প্রায় ৩২%। প্ল্যাটফর্মের যে এন্ট্রি-লেভেলের কাজগুলো ভিত্তি ছিল, তা আজ প্রায় বিলুপ্ত।

শেষ কথা

আজ আপওয়ার্কের দিকে তাকালে সত্যি কষ্ট হয়। একসময়ের সেরা প্ল্যাটফর্মটি আজ কেবল অতিরিক্ত লোভ এবং ভুল সিদ্ধান্তের চরম মূল্য চোকাচ্ছে। তাদের মার্কেট ক্যাপ তলানিতে, বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ক্লায়েন্ট এবং ফ্রিল্যান্সার উভয়কেই বিরক্ত করে তারা যে ফাঁদ তৈরি করেছিল, আজ সেই ফাঁদেই তারা নিজেরা আটকে গেছে। মানুষ এখন নতুন, স্বচ্ছ এবং ভালো বিকল্পের দিকে ঝুঁকছে। হয়তো এটাই হওয়ার ছিল। কারণ, যারা নিজেদের মেরুদণ্ড অর্থাৎ ফ্রিল্যান্সারদের সম্মান করতে জানে না, তাদের পতন তো অবধারিত।