F1 বা Formula1, এই নামটি হয়তো অনেকেই শুনেছেন। হয়তো অনেকে অলরেডি এই স্পোর্টস এর রেগুলার ফ্যান। আবার অনেকেই হয়তো এই স্পোর্টটি সম্পর্কে কিছুই জানেন না বা শুধু এতটুকু জানেন যে এটি রেসিং সম্পর্কিত। এই পোস্টটির উদ্দেশ্য যারা F1 সম্পর্কে অল্প বা কোনো ধারণাই রাখেন না তাদেরকে F1 এর বেসিক Jargon/Terminology(বোল্ড করা টেক্সটগুলো) ও Rules এর সাথে সহজ করে পরিচয় করিয়ে দেওয়া ও এটি কিভাবে কাজ করে, এর পিছনের ইকোনমি কি এই বিষয়গুলো সম্পর্কে কিছুটা অবগত করা; যাতে আপনারা যারা F1 দেখা শুরু করতে চান তারা সহজেই শুরু করতে পারেন। যদি এই পোস্টেই আপনি F1 সম্পর্কে প্রথম জানতে পারেন, তাও সমস্যা নেই হয়তো পোস্ট পড়েই আপনার ইন্টারেস্ট আসতে পারে। আমার ইন্টারেস্ট এসেছিল 2025 এর F1 মুভি দেখার পর, তো চাইলে মুভিটিও দেখতে পারেন।
F1 কি?
F1 পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ রেসিং কম্পিটিশন। এটি একটি টিম স্পোর্ট, প্রত্যেক টিম থেকে ২ জন রেসার একেকটি রেস এ অংশ নিতে পারেন। তবে প্রত্যেকটি টিম এর পরিধি এই ২ জন রেসার থেকে অনেক বেশি বড়। ড্রাইভার ছাড়াও প্রতি টিমে আছে টেকনিকাল, রেস অপারেশন্স, লজিস্টিকস, মার্কেটিং, ম্যানুফ্যাকচারিং ও সাপোর্ট স্টাফ এর মত ডিপার্টমেন্ট। বড় বড় টিম গুলোতে মোট employees এর সংখ্যা কয়েক শত থেকে হাজারের উপর পর্যন্ত থাকতে পারে।
ফর্মুলা ওয়ানের যাত্রা শুরু হয় ১৯৫০ সালে। প্রথম বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ রেস অনুষ্ঠিত হয় সিলভারস্টোন সার্কিটে(প্রতিটি রেস ট্র্যাক কে সার্কিট বলা হয়), যা যুক্তরাজ্যে অবস্থিত। তখন থেকেই F1 ধীরে ধীরে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় মোটরস্পোর্টসে পরিণত হয়েছে।
F1 এ দুইটি চ্যাম্পিয়নশিপ এর জন্য লড়াই হয়, একটি হলো F1 Drivers’ Championship যা একক ভাবে একজন ড্রাইভার এর জন্য বরাদ্দ আর আরেকটি হলো F1 Constructors’ Championship যা একটি টিম এর জন্য বরাদ্দ।
রেসকারের গঠন ও ব্যবহৃত প্রযুক্তি
F1 গাড়িগুলো সাধারণ গাড়ির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এগুলো তৈরি করা হয় বিশেষভাবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
ইঞ্জিন
বর্তমানে F1 গাড়িতে 1.6 লিটার V6 টার্বো হাইব্রিড ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। এই ইঞ্জিনগুলো প্রায় 1000 হর্সপাওয়ার উৎপন্ন করতে সক্ষম, যা গাড়িকে ঘণ্টায় 300 কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে ছুটতে সাহায্য করে। টিমগুলো নিজের ইঞ্জিন নিজে তৈরি করতে পারে অথবা অন্য টিমের ফ্যাক্টরি থেকে আউটসোর্স করতে পারে। এক্ষেত্রে নিয়ম অনুসারে যেই টিমটি ইঞ্জিন সাপ্লাই দিবে তাকে অবশ্যই তারা নিজে যেটা ব্যবহার করবে ঠিক সেই specs এর ইঞ্জিন ই সাপ্লাই দিতে হবে। বড় বড় টিমগুলো(যেমন ferrari, mercedes) নিজের ইঞ্জিন নিজেই তৈরি করে।
এরোডাইনামিক্স
F1 গাড়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর এরোডাইনামিক ডিজাইন। গাড়ির সামনে ও পেছনের উইং, ডিফিউজার এবং বিভিন্ন এরোডাইনামিক উপাদান গাড়িকে রাস্তার সাথে আটকে রাখে, যা উচ্চ গতিতেও নিয়ন্ত্রণ রাখতে সাহায্য করে। প্রতিটি টিম FIA(F1 এর গভর্ণিং বডি) এর ঠিক করে দেওয়া নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের অধীনে থেকে তাদের গাড়ির এরোডাইনামিক্স নিজে ডিজাইন করে তাদের গাড়িকে সবচেয়ে দ্রুত করে বানানোর চেষ্টা করে যাতে তাদের ড্রাইভার অন্যদের উপরে সর্বোচ্চ বেনিফিট টুকু পেতে পারে। ১ সেকেন্ড এর মত ব্যবধান তৈরি করতেও মিলিয়ন ডলার এর মত খরচ করে টিম গুলো। FIA এর ঠিক করে দেওয়া এই নিয়মগুলোর সেট ই হলো “ফর্মুলা” এবং এজন্যই একে Formula1 বলা হয়। “1” কারণ Formula2 এবং Formula3 ও আছে, যেখানে এই নিয়মের সেটটি বা ফর্মুলা টি আলাদা অর্থাৎ আলাদা নিয়ম(ইঞ্জিন, এরোডাইনামিক্স, বিভিন্ন কম্পোনেন্টস রিলেটেড) মেনে গাড়ি তৈরি করতে হয়। সাধারণত F2 ও F3 এর চ্যাম্পিয়ন বা ডেকরেটেড ক্যারিয়ার সম্পন্ন রেসার রা সুপার লাইসেন্স(FIA অনুমোদিত বিশেষ লাইসেন্স যা ছাড়া F1 এ অংশগ্রহণ সম্ভব নয়) পেয়ে F1 এ আসেন।
চ্যাসিস ও মনোকক
F1 গাড়ির চ্যাসিস তৈরি করা হয় কার্বন ফাইবার দিয়ে, যা অত্যন্ত শক্তিশালী কিন্তু হালকা। মনোকক (ড্রাইভারের ককপিট) ড্রাইভারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়।
টায়ার
F1 গাড়িতে ব্যবহৃত টায়ারগুলো স্পেশালি ডিজাইন করা হয়। পিরেলি হলো F1-এর অফিসিয়াল টায়ার সরবরাহকারী। বিভিন্ন ধরনের টায়ার আছে – সফট, মিডিয়াম, হার্ড, ইন্টারমিডিয়েট এবং ওয়েট টায়ার; আবহাওয়া ও ট্র্যাক এর অবস্থার উপর ভিত্তি করে উপযুক্ত টায়ার ব্যবহার করা হয়।
F1 রেস উইকেন্ড
F1 রেস একটি সপ্তাহান্ত/weekend(শুক্র, শনি আর রবিবার) ধরে চলে, যার তিনটি প্রধান অংশ:
১. অনুশীলন (Practice)
শুক্রবার দুটি এক ঘণ্টাব্যাপী প্র্যাকটিস সেশন, ফ্রি প্র্যাকটিস 1(FP1) আর ফ্রি প্র্যাকটিস 2(FP2) অনুষ্ঠিত হয়। এই সময় ড্রাইভার এবং টিম ট্র্যাকের সাথে পরিচিত হয়, গাড়ির সেটিং ঠিক করে এবং রেস কৌশল নির্ধারণ করে। শনিবার আরো একটি প্র্যাকটিস সেশন ফ্রি প্র্যাকটিস 3(FP3) অনুষ্ঠিত হয়। FP3 এর পরে “parc ferme conditions” এর সময় শুরু হয়, অর্থাৎ টিমগুলো কর্তৃক তাদের গাড়িতে কোনো প্রকার মডিফিকেশন করা ব্যান করে দেওয়া হয়।
২. কোয়ালিফাইং (Qualifying)
FP3 এর পর শনিবার বিকেলে কোয়ালিফাইং সেশন অনুষ্ঠিত হয়, যা তিনটি অংশে বিভক্ত:
Q1: ১৮ মিনিট, যেখানে সব ড্রাইভার অংশগ্রহণ করে। সবচেয়ে ধীর ৫ জন বাদ পড়ে।
Q2: ১৫ মিনিট, বাকি ১৫ জন ড্রাইভার অংশগ্রহণ করে। আবার সবচেয়ে ধীর ৫ জন বাদ পড়ে।
Q3: ১২ মিনিট, শীর্ষ ১০ জন ড্রাইভার পোল পজিশনের(১ম পজিশন) জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।
কোয়ালিফাইংয়ের ফলাফল অনুসারে রবিবারের রেসে গ্রিড পজিশন(কে কোন পজিশন থেকে রেস শুরু করবে) নির্ধারিত হয়। Q1 আর Q2 এ যেই ১০ জন বাদ পরে তারা তাদের ফিনিশ লাইনে পৌঁছানোর পজিশন অনুসারে গ্রিডে ১১ থেকে ২০ তম স্থান পায়। Q3 এ অংশ নেওয়া ১০ জন তাদের পজিশন অনুসারে গ্রিডে ১ম ১০ টি স্লট থেকে রেস শুরু করার সুযোগ পায়। উল্লেখ্য, F1 এর কোয়ালিফাইং এ কেউ বাদ পড়েনা, কোনো পয়েন্ট ও দেওয়া হয়না। এটি শুধু রেস ডে (রবিবার) এর স্টার্টিং পজিশন নির্ধারণ করে।
৩. রেস (Race)
রবিবার বিকেলে মূল রেস অনুষ্ঠিত হয়। রেস শুরু হয় একটি ওয়ার্ম-আপ ল্যাপের পর, যাকে “ফরমেশন ল্যাপ” বলা হয়। এরপর পাঁচটি লাল আলো নিভে গেলে রেস শুরু হয়। প্রতিটি রেস কে একেকটি গ্র্যান্ড প্রিক্স (Grand Prix) বলা হয় এবং প্রতিটি গ্র্যান্ড প্রিক্স ভিন্ন ভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত হয়। একটি রেস যেই দেশে অনুষ্ঠিত হবে অবশ্যই সেই রেসের প্র্যাকটিস, কোয়ালিফাইং রেস ও একই স্থানেই অনুষ্ঠিত হয়।
রেসের দৈর্ঘ্য সাধারণত মিনিমাম ৩০৫ কিলোমিটার তবে সার্কিট ভেদে এর চেয়ে কিছু বেশি বা কম হতে পারে। সর্বনিম্ন যতটি ল্যাপ(একবার পুরো ট্র্যাক/সার্কিট ঘুরে আসলে একটি ল্যাপ সম্পন্ন হয়) দিয়ে ৩০৫ km বা কাছাকাছি ডিসটেন্স অতিক্রান্ত হয়, ততটি ল্যাপ নিয়ে রেস অনুষ্ঠিত হয়। ড্রাইভারদের অবশ্যই রেসের মাঝে অন্তত একবার পিট স্টপ (রেসের মাঝখানে টায়ার পরিবর্তন বা অন্য কোনো মডিফিকেশনের জন্য ড্রাইভার বা যে স্থানে এসে থামেন তা হলো পিট) টায়ার পরিবর্তন করতে হয়।
স্কোরিং সিস্টেম
F1-এ পয়েন্ট দেওয়া হয় শীর্ষ ১০ জন ড্রাইভারকে:
– ১ম স্থান: ২৫ পয়েন্ট
– ২য় স্থান: ১৮ পয়েন্ট
– ৩য় স্থান: ১৫ পয়েন্ট
– ৪র্থ স্থান: ১২ পয়েন্ট
– ৫ম স্থান: ১০ পয়েন্ট
– ৬ষ্ঠ স্থান: ৮ পয়েন্ট
– ৭ম স্থান: ৬ পয়েন্ট
– ৮ম স্থান: ৪ পয়েন্ট
– ৯ম স্থান: ২ পয়েন্ট
– ১০ম স্থান: ১ পয়েন্ট
এছাড়াও, রেসে দ্রুততম ল্যাপ সম্পন্নকারী ড্রাইভারকে (যদি সে শীর্ষ ১০-এ থাকে) অতিরিক্ত ১ পয়েন্ট দেওয়া হয়। একটি সিজন শেষে(সাধারণত একটি সিজনে ২৪টি রেস/গ্র্যান্ড প্রিক্স থাকে) যেই ড্রাইভারের পয়েন্ট সবচেয়ে বেশি থাকে তিনি হন F1 World Drivers’ Champion আর সিজন শেষে একটি টিমের ২ জন ড্রাইভারের সম্মিলিত পয়েন্ট যেই টিমের সবচেয়ে বেশি থাকে সেই টিম হয় F1 World Constructors’ Champion । উল্লেখ্য Drivers’ Championship এ কোনো প্রাইজ মানি দেওয়া হয়না, প্রাইজ মানি থাকে শুধু Constructors’ Championship এ।
টিম এবং ড্রাইভার
F1-এ সাধারণত ১০টি টিম থাকে, প্রতিটি টিমে দুজন করে ড্রাইভার। অর্থাৎ ২০ জন ড্রাইভার রেসে অংশ নেন। প্রতিটি টিম তাদের নিজস্ব গাড়ি তৈরি করে, কিন্তু কিছু উপাদান (যেমন ইঞ্জিন) অন্য সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কিনতে পারে।
ড্রাইভারদের অবশ্যই সুপার লাইসেন্স থাকতে হয়, যা FIA (Fédération Internationale de l’Automobile) দ্বারা প্রদত্ত একটি বিশেষ ড্রাইভিং লাইসেন্স।
কিছু মৌলিক নিয়মাবলী
F1 রেস পরিচালিত হয় FIA কর্তৃক নির্ধারিত কঠোর নিয়মাবলীর অধীনে। এর মধ্যে রয়েছে:
– গাড়ির স্পেসিফিকেশন: গাড়ির ওজন, আকার, ইঞ্জিনের ক্ষমতা ইত্যাদির উপর কঠোর বিভিন্ন নিয়ম প্রণয়ন করা হয়, যেগুলো সম্মিলিত ভাবে “ফর্মুলা” নামে পরিচিত।
– রেস নিয়ম: ওভারটেকিং, পিট স্টপ, ট্র্যাক লিমিট ইত্যাদির জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।
– পেনাল্টি: নিয়ম ভঙ্গের জন্য বিভিন্ন ধরনের পেনাল্টি দেওয়া হয়, যেমন টাইম পেনাল্টি, গ্রিড পেনাল্টি ইত্যাদি।
কৌশল এবং টিমওয়ার্ক
F1 শুধু ড্রাইভারের দক্ষতার উপর নির্ভর করে না, এটি একটি টিম গেম। টিমের কৌশল, পিট স্টপের সময়, টায়ার ম্যানেজমেন্ট, ফুয়েল ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি রেসের ফলাফলের উপর বড় প্রভাব ফেলে। প্রতিটি টিমের দুইজন রেসার ফাইটার জেট নিয়ে উড়ন্ত দুইজন পাইলট এর মত যাদের একজন লিড পজিশন এ থেকে রেস জেতার চেষ্টা করে আর আরেকজন wingman এর মত তাকে সহযোগিতা করে, যেমন অন্য রেসার দের কে প্রেসার এ রাখা। টেকনিকাল টিম সবসময় ড্রাইভার দের সাথে যোগাযোগ এ থাকে, যা আমাদের ফাইটার জেট এর এনালোজি তে কন্ট্রোল স্টেশন এর মত। তবে অনেক সময় ই নিজের টিমের দুইজন ড্রাইভারদের মধ্যেই তীব্র rivalry দেখা যায়, কারণ তারা দুইজন ই রেস জিততে চায়, অর্থাৎ কেউ ই উইংম্যান হতে চায়না। এজন্য টিমগুলো সবসময় একজন ড্রাইভার কে বেশি এক্সপেরিয়েন্সড আর সিনিয়র রাখে(so-called ড্রাইভার 1), আর আরেকজন কে রুকি রাখে(so-called ড্রাইভার 2) যাতে সে রেস জেতার চেষ্টা না করে অর্থাৎ টিম এর আদেশ পালন করে তাদের পূর্বনির্ধারিত স্ট্র্যাটেজি মত রেস করে। কারণ ড্রাইভারদের মধ্যে বিফ সৃষ্টি হোক সেটি অবশ্যই টিমের ইনভেস্টর রা দেখতে চান না, যদিও দর্শক রা এসব ড্রামা দেখতেই বেশি পছন্দ করেন। একজন ড্রাইভার লয়াল উইংম্যান এর মত তার ফেলো ড্রাইভার কে সাহায্য করা, যেমন নিজের পজিশন ছেড়ে দিয়ে তাকে সামনে যেতে দেওয়া অথবা নিজ টিম ড্রাইভার দের মধ্যে rivalry আমার f1 এ টপ ২ টি favourite মোমেন্ট।
ফর্মুলা ওয়ান হলো প্রযুক্তি, কৌশল এবং ড্রাইভারের স্কিলস এর এক অনন্য সমন্বয়। এটি শুধু স্পিডের খেলা নয়, একটি জটিল এবং উত্তেজনাপূর্ণ স্পোর্টস, যা বিশ্বব্যাপী লাখো মানুষকে আকৃষ্ট করে। আজকের পোস্টটি এই পর্যন্তই। আশা করি পোস্টটি আপনাদের ভালো লেগেছে। সবাই ভালো থাকবেন<3






3 টি মন্তব্য