জীবনে অনেক সময় আমরা এমন এক দ্বিধার মুখে পড়ি যেখানে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। চাকরির স্থিতিশীলতা আর ব্যবসা স্বাধীনতার মধ্যে কোনটা বেছে নেব। অনেকেই চাকরি করছেন কিন্তু সেই আয় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে তাই ব্যবসা করার কথা ভাবছেন। আবার কেউ কেউ কিছুই করেন না তবুও ব্যবসা করার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু আপনি কি জানেন ব্যবসায় নামার আগে কি কি করণীয় ধাপ স্মরণ করা উচিত। কারণ একটি সফল ব্যবসা দাঁড় করাতে সময়, ধৈর্য এবং সঠিক পরিকল্পনা লাগে। আজকের গল্পে আমরা শিখবো এমনই একজন পরিশ্রমী যুবকের জীবন সংগ্রামের গল্প যে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে শিখেছিল সঠিক পরিকল্পনা আর ধৈর্যের মাধ্যমে তাহলে চলুন আমরাও গল্পে গল্পে দেখি কি সেই মূল্যবান শিক্ষাগুলো।

একটি ছোট ব্যস্ত শহরে ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি বাস করতো নাম ছিল আকাশ। সে খুবই পরিশ্রমী ব্যক্তি ছিল আর তার হৃদয় ভরা ছিল নানান স্বপ্ন। দিনের বেলা সে একটি কোম্পানিতে সেলস পার্সন হিসেবে কাজ করতেন আর রাতের বেলা তিনি স্থানীয় খাবারের বাজারে ফুডকার্টে করে নানান খাবার বিক্রি করতো। পরিবারের খরচ চালানোর জন্য তাকে ভালোই পরিশ্রম করতে হতো যাতে তার স্ত্রী এবং দুই সন্তান আরামে থাকতে পারে। বেশ কিছুদিন ধরেই আকাশ তার ব্যবসাকে বড় করতে চাইছিল এবং নতুন নতুন আইটেম মেনুতে যোগ করতে চাচ্ছিল। কিন্তু একই তো সময়ের অভাব আর উপর থেকে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি তাকে এগোতে দিত না। আর সম্প্রতি তার অফিসের চাপ তাকে মানসিকভাবে অনেক ক্লান্ত করে তুলেছিল এবং তিনি তার চাকরি ছেড়ে নিজের ব্যবসার দিকে মনোনিবেশ করার কথা ভাবতে শুরু করছিলেন।

তবে তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে তার ব্যবসার আয় তার পরিবারকে সাপোর্ট করার জন্য যথেষ্ট হবে কিনা। এক শুক্রবার ছুটির দিনটি কাজে লাগিয়ে আকাশ তার পরিবারের সাথে গ্রামে গেল তার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে। কিছু আনন্দময় মুহূর্তে কাটানোর পর সে গ্রামে হাঁটতে বের হলো এবং রাস্তায় তার রহিম সাহেবের সাথে দেখা হলো। রহিম সাহেব ছিলেন এক স্থানীয় কৃষক যিনি একসময় অফিসে কাজ করতেন কিন্তু এখন পুরোপুরি তার ব্যবসায় মনোনিবেশ করেছেন। এটি আকাশের মনে অনেক আশার সঞ্চার করল আকাশ তাকে জিজ্ঞেস করলেন রহিম সাহেব আপনার সাথে কি কয়েক মিনিট কথা বলা যাবে।

রহিম সাহেব তখন মুরগির ডিম সংগ্রহ করছিলেন। তিনি আকাশকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানালেন। আকাশের বিষন্ন চেহারা দেখে তিনি বেশ কৌতুহলী হলেন। কারণ আকাশ একসময় খুব হাসি খুশি থাকতো। এরপর আকাশ তার সব সমস্যার কথা বললেন তার চাকরির চাপ থেকে শুরু করে তার ব্যবসায় মনোনিবেশ করার ইচ্ছা পর্যন্ত। রহিম সাহেব আকাশের উদ্বেগ গুলো বুঝতে পারলেন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা শেয়ার করলেন। তিনি বললেন আকাশ তোমার চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় পুরোপুরি মনোনিবেশ করার আগে অন্তত সাতটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই সাতটি বিষয় অবশ্যই ভালোভাবে ভাবা এবং পরিকল্পনা করে নেওয়া অবশ্যই দরকার। আকাশ মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন যেন তিনি কোন কথাই মিস না করেন।

প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ছোট কিছু থেকে শুরু করা। নতুন উদ্যোক্তাদের একটি সাধারণ ভুল হলো কোন অভিজ্ঞতা ছাড়াই তারা বড় পরিসরে শুরু করে ফেলে। এটি ঠিক এমন যেন কেউ পাইলটের প্রশিক্ষণ না নিয়ে প্লেন চালানো শুরু করে কিন্তু জানিনা কিভাবে ল্যান্ড করাতে হবে কারণ ব্যর্থতার ঝুঁকি তখন খুব বেশি বেড়ে যায়। এই ধরো কেউ বড় মুরগির খামার বানিয়ে ফেলে কিন্তু সে কোনদিন একটিও মুরগি পালন করেনি, কয়েকশো আইটেম মজুদ করে ফেলে কিন্তু একটি আইটেমও বিক্রি করেনি বা বিশাল বিনিয়োগে একটি ক্যাফের সব খুলে বসে কিন্তু বেসিক কিছুই জানে না।

নিশ্চয়ই তুমি দেখে থাকবে শহরের অনেক ব্যবসা এক বছরের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায় যদিও তারা বেশ বড় আকারে শুরু করেছিল। আকাশ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো এবং বলল তাহলে আমি এখন কি করবো রহিম সাহেব। রহিম সাহেব জবাব দিলেন নতুনদের জন্য ছোট থেকে শুরু করাই ভালো যেন সিঁড়ি বেয়ে ওঠার মতো হয়। ছোট বিনিয়োগ দিয়ে শুরু করো যেন ঝুঁকি কম হয়। যদি একটি বিক্রি করতে পারো তাহলে তিনটিতে চেষ্টা করো। যদি তিনটিতে সফলতা পাও দশটিতে যাও। যদি এভাবে তুমি এগোতে থাকো তবে শুধু আয় নয় তোমার অভিজ্ঞতাও বাড়বে। পরামর্শটি আকাশের চোখ খুলে দিল কৃতজ্ঞ চিত্র তিনি এটি বুঝতে সময় নিলেন। তারপর রহিম সাহেবকে পরবর্তী বিষয়টি জিজ্ঞাসা করলেন।

দ্বিতীয় বিষয় হলো তোমার পার্টটাইম জবের আয়ের পরিমাণ। যদি তোমার পার্টটাইম জবের আয় তোমার পরিবারের চাহিদা পূরণ করতে পারে এটি ভালো লক্ষণ কিন্তু তবুও ঝুঁকিপূর্ণ। ব্যবসায় সাধারণত ওঠানামা থাকে যা স্থিতিশীল বেতনের মতো নয় চাকরি ছাড়ার জন্য নিরাপদ সীমা হলো যখন তোমার পার্টটাইম জবের আয় তোমার পরিবারের চাহিদার দ্বিগুণ হবে। আকাশ চিন্তা করলো এবং মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো এবং পরবর্তী পাঠ জানতে আকাশ আরো কৌতুহলী হয়ে উঠলো। রহিম সাহেব হাসলেন এবং বললেন একটু অপেক্ষা করো আকাশ আমি একটু কফি নিয়ে আসি কারণ পরের পয়েন্ট গুলো আরো বেশি আকর্ষণীয় হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রহিম সাহেব কফি নিয়ে ফিরে এলেন তারা একটি গাছের নিচে বসলেন যেখানে কাছেই খামারের কাজ চলছিল।

রহিম সাহেব কফি চুমুক দিতে দিতে বললেন তৃতীয় বিষয় হলো একটি জরুরি সঞ্চয় তহবিল তৈরি করা। এমন একটি সঞ্চয় থাকা জরুরি যা কমপক্ষে তোমার ছয় মাসের খরচ মেটাতে পারে। যদি সম্ভব হয় এক বছরের খরচের সঞ্চয় আরো ভালো। এই তহবিল একটি নিরাপত্তা কবজের মত কাজ করবে যা তোমাকে ব্যবসায় মনোযোগ দিতে সাহায্য করবে কোন আর্থিক চিন্তা ছাড়াই। আকাশ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল তিনি মাথা নেড়ে বললেন এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ। আমি এটা হয়তো কখনোই ভাবতে পারতাম না।

রহিম সাহেব মুচকি হাসলেন এবং বললেন চতুর্থ বিষয় হলো ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতা। এটি শুধু ভালো রেসিপি থাকার বিষয় নয় বরং এটি ঠিকভাবে বাজারজাত করা সঠিক সময় নির্ধারণ করা এবং অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে শেখার দক্ষতা। তুমি সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্যদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারো নিশ্চিত হও যে তুমি প্রস্তুত আছো এবং শুধু ভাগ্যের উপর নির্ভর করছো না। রহিম সাহেবের এই সহজ এবং কার্যকর ব্যাখ্যাগুলো আকাশের কাছে খুবই প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছিল। আকাশ বারবার মাথা নেড়ে তার বোঝার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন কফির চুনুক দিতে দিতে তিনি আরো শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।

তারা খামারের দৃশ্য উপভোগ করতে করতে রহিম সাহেব আবার বললেন পঞ্চম বিষয় হলো দৃঢ় সংকল্প একটি ব্যবসা শুরু করতে হলে শক্ত সংকল্প এবং অধ্যবসায়ের প্রয়োজন। প্রতিযোগিতা বিক্রয়ের উঠানামা এবং ছোট বড় সমস্যার মত নানান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি থাকা জরুরি।

ষষ্ঠ বিষয় হলো তোমার পার্টটাইম জবের স্থিতিশীলতা কেমন। নিশ্চিত হও যে তোমার ব্যবসা অন্তত গত তিন মাস ধরে স্থিতিশীল আছে ছয় মাস হলে আরো ভালো। স্থিতিশীলতা দেখায় যে এটি একটি প্রধান আয়ের উৎস হিসেবে টিকে থাকতে পারবে। স্থিতিশীলতার আগে চাকরি ছাড়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত রহিম সাহেব সপ্তম বিষয়টি বললেন সপ্তম বিষয় হলো ঝুঁকির বোঝাপড়া। তোমার বাজার প্রতিযোগিতা এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানো। ঝুমকি বুঝে নিতে পারলে তুমি ক্ষতি কমাতে এবং লাভ বাড়ানোর জন্য কৌশল তৈরি করতে পারবে। তো আকাশ তুমি কি এখন চাকরি ছাড়ার জন্য প্রস্তুত। আকাশ একটু থামলেন এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিলেন আমি আপনার সাতটি বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করব। এখনই আমি কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।

রহিম সাহেব মুচকি হাসি দিয়ে বললেন ঠিক আছে আকাশ আমি খুশি যে তুমি বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেছো। সন্ধ্যায় আকাশ রহিম সাহেবকে ধন্যবাদ জানিয়ে রওনা দিলেন এবং প্রতিশ্রুতি নিলেন যে আজ তার শেখা প্রতিটি পরামর্শ বাস্তবায়ন করবেন। আশা করি এই গল্প থেকে আমরা যারা নতুন ব্যবসা শুরু করতে চাই বা চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় মনোনিবেশ করার কথা ভাবছি তারা অনেক মূল্যবান শিক্ষা নিতে পেরেছি।