বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম

রাতে ঘুমানোর পর আমরা অনেকেই বিভিন্ন ধরনের স্বপ্ন দেখি। কখনো সুন্দর স্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে উঠে মন ভালো হয়ে যায়, আবার কখনো এমন ভয়ংকর স্বপ্ন দেখি যে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরও বুক ধড়ফড় করতে থাকে।

তখন আমাদের মনে একটা প্রশ্ন আসে—স্বপ্ন কি সত্যিই কোনো বার্তা বহন করে? ইসলাম স্বপ্ন সম্পর্কে কী বলে?

ইসলামে স্বপ্নকে একেবারে অস্বীকার করা হয়নি। বরং হাদিসে স্বপ্নের বিভিন্ন ধরন সম্পর্কে আলোচনা এসেছে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, স্বপ্ন তিন ধরনের হতে পারে—আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, শয়তানের পক্ষ থেকে ভয় দেখানো স্বপ্ন এবং মানুষের নিজের চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন।

—সহিহ মুসলিম

অর্থাৎ, আমরা যে প্রতিটি স্বপ্ন দেখি তার নির্দিষ্ট কোনো অর্থ আছে—এমনটা মনে করা ঠিক নয়।

ভালো স্বপ্ন দেখলে কী করবেন?

কখনো এমন স্বপ্ন আসতে পারে, যেটা দেখে মন শান্ত হয়ে যায় বা ভালো লাগে। ইসলাম আমাদের এমন স্বপ্নের ব্যাপারে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে উৎসাহিত করে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কেউ পছন্দনীয় স্বপ্ন দেখলে সে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে এবং চাইলে প্রিয় বা বিশ্বস্ত মানুষের কাছে তা বলতে পারে।

—সহিহ বুখারি

তবে স্বপ্ন দেখে নিজের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়ে গেছে—এমন ধারণা করা উচিত নয়।

খারাপ বা ভয়ংকর স্বপ্ন দেখলে কী করবেন?

এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

যদি এমন কোনো স্বপ্ন দেখেন যা আপনাকে ভয় পাইয়ে দেয় বা অস্বস্তিতে ফেলে, তাহলে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই।

হাদিসে এসেছে, এমন স্বপ্ন দেখলে আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় চাইতে হবে, বাম দিকে হালকা তিনবার ফুঁ দিতে হবে এবং সেই স্বপ্ন সবার কাছে বলে বেড়ানো উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন, এভাবে করলে সেই স্বপ্ন তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।

—সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম

তাই খারাপ স্বপ্ন দেখার পর “নিশ্চয়ই আমার জীবনে খারাপ কিছু ঘটবে”—এমন চিন্তা করা ঠিক নয়।

তাহলে কোন স্বপ্ন দেখলে কী হয়?

এখানে আমাদের একটু সাবধান হতে হবে।

অনেক জায়গায় বলা হয়—সাপ দেখলে এটা হবে, দাঁত পড়লে সেটা হবে, বিয়ে দেখলে এমন হবে, মৃত্যু দেখলে এমন হবে। কিন্তু এগুলোর প্রতিটিকে ইসলামের নিশ্চিত ব্যাখ্যা মনে করা ঠিক নয়।

কারণ স্বপ্নের ব্যাখ্যা সব মানুষের জন্য একই হয় না। একই স্বপ্ন একজনের জন্য এক অর্থ বহন করতে পারে, আবার অন্যজনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

কুরআনে আমরা হযরত ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা থেকে জানতে পারি যে স্বপ্নের ব্যাখ্যার জ্ঞান আল্লাহ বিশেষ জ্ঞান হিসেবে দিয়েছিলেন। হযরত ইউসুফ (আ.) স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেছিলেন, কিন্তু এটি সাধারণ মানুষের জন্য ভবিষ্যৎ গণনার কোনো পদ্ধতি নয়।

অনেক স্বপ্ন কেন দেখি?

আমরা সারাদিন যা নিয়ে চিন্তা করি, দুশ্চিন্তা করি বা কোনো বিষয় নিয়ে বেশি ভাবি—সেটার প্রভাবও স্বপ্নে আসতে পারে। হাদিসে স্বপ্নের এমন একটি ধরন উল্লেখ করা হয়েছে যা মানুষের নিজের চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

তাই সারাদিন কোনো বিষয় নিয়ে ভাবার পর রাতে সেটাই স্বপ্নে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে এটাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বিশেষ ইঙ্গিত মনে করা ঠিক হবে না।

স্বপ্ন কি ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে?

কিছু সত্য স্বপ্ন থাকতে পারে। ইসলামে সত্য স্বপ্নের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়নি। কিন্তু প্রতিটি স্বপ্ন ভবিষ্যতের সংবাদ—এমন বিশ্বাস ইসলামের শিক্ষা নয়।

তাই স্বপ্ন দেখে জীবনের বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কুরআন-সুন্নাহ, বাস্তবতা এবং বিশ্বস্ত জ্ঞানী মানুষের পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

সবচেয়ে সুন্দর শিক্ষা হলো—ভালো স্বপ্ন দেখলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন, আর খারাপ স্বপ্ন দেখলে ভয় না পেয়ে আল্লাহর আশ্রয় নিন।

কারণ একজন মুমিনের বিশ্বাস হলো, তার জীবনে যা কিছু ঘটছে এবং ভবিষ্যতে যা ঘটবে—সবকিছুই আল্লাহর জ্ঞানের মধ্যে রয়েছে।

তাই আজ রাতে ঘুমানোর আগে আল্লাহকে স্মরণ করুন, তাঁর কাছে নিরাপত্তা চান এবং ভালোভাবে ঘুমানোর সুন্নাহ আমলগুলো পালন করুন।

স্বপ্ন নিয়ে ভয় নয়—আল্লাহর ওপর ভরসাই একজন মুমিনের আসল শক্তি।

আল্লাহ আমাদের ভালো স্বপ্ন দেখার তাওফিক দিন, খারাপ স্বপ্ন ও শয়তানের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন এবং আমাদের অন্তরকে শান্তি দান করুন। আমিন।