রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম উম্মাহ যখন কঠিন এক সময় পার করছিল, তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) খলিফার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। চারদিকে তখন নানা বিদ্রোহ, অস্থিরতা ও বিপদের আশঙ্কা। কিন্তু আবু বকর (রা.) ছিলেন দৃঢ়চেতা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন—ইসলামের নিরাপত্তা ও দাওয়াতের জন্য শুধু আরব উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই যথেষ্ট নয়; বাইরের শক্তিগুলোর দিকেও নজর দিতে হবে।
তৎকালীন ইরাক অঞ্চল ছিল শক্তিশালী সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনে। সেখানে মুসলিম বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আবু বকর (রা.) এই অভিযানের দায়িত্ব দেন সাহাবি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-কে। খালিদ (রা.) ছিলেন অসাধারণ সামরিক কৌশলী। তিনি সৈন্যদের নিয়ে ইরাকের দিকে অগ্রসর হন।
শুরু হয় একের পর এক অভিযান।
মুসলিম বাহিনী ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চলে পারস্য বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। যাতুস সালাসিল, আল-মাদার, উলাইস এবং হীরা-সহ বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলিম বাহিনী দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু অঞ্চল মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—মুসলিম বাহিনী শুধু যুদ্ধ করতেই এগিয়ে যায়নি; তারা নতুন অঞ্চলে ইসলামের বার্তাও পৌঁছে দিতে চেয়েছিল। ঐতিহাসিক বর্ণনায় দেখা যায়, যুদ্ধের আগে বিভিন্ন সময়ে প্রতিপক্ষকে ইসলাম গ্রহণ, শান্তিচুক্তি অথবা জিজিয়ার মতো বিকল্প দেওয়া হতো।
এরপর মুসলিম বাহিনী হীরা অঞ্চলে পৌঁছে। হীরা ছিল ইরাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ নগর ও রাজনৈতিক কেন্দ্র। সেখানে মুসলিমদের অগ্রযাত্রা পারস্যের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রা দ্রুতগতিতে চলতে থাকে। কিন্তু এই বিজয়কে ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবে দেখতেন না সাহাবিরা। তাদের বিশ্বাস ছিল—বিজয় আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে।
এদিকে মদিনায় বসে খলিফা আবু বকর (রা.) পুরো পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছিলেন। তিনি একদিকে বিদ্রোহ দমন ও আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছিলেন, অন্যদিকে ইরাকের অভিযানের দিকেও নজর রাখছিলেন।
পরবর্তীতে আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতের শেষদিকে খালিদ (রা.)-কে সিরিয়া অভিযানে পাঠানো হয়। তখন ইরাকের মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে এবং ইরাকের বিজয়-অভিযান পরবর্তী সময়ে খলিফা উমর (রা.)-এর যুগে আরও বিস্তৃত হয়।
তাই মনে রাখতে হবে—ইরাকের পুরো বিজয় একদিনে বা শুধু আবু বকর (রা.)-এর যুগেই সম্পূর্ণ হয়নি। আবু বকর (রা.)-এর সময়ে ইরাকে মুসলিম সামরিক অভিযান ও গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক বিজয়ের সূচনা হয়, আর পরবর্তী সময়ে উমর (রা.)-এর খেলাফতে তা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়।
পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, আল্লাহর ওপর ভরসা, সঠিক নেতৃত্ব, সাহস ও শৃঙ্খলা থাকলে অসম্ভব মনে হওয়া কাজও সম্ভব হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।