কোরবানির জরুরি মাসআলা ও শিক্ষা: যা জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক

কোরবানি শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রতীক। জিলহজ মাসের এই বিশেষ ইবাদতটি কবুল হওয়ার জন্য সঠিক নিয়ম ও শুদ্ধ নিয়ত থাকা জরুরি। সংক্ষেপে কোরবানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পয়েন্ট নিচে তুলে ধরা হলো:

১. কোরবানি কার ওপর ওয়াজিব?

  • যোগ্যতা: ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ—এই তিন দিন যার কাছে মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা অথবা সমমূল্যের নগদ টাকা/ব্যবসায়িক পণ্য থাকবে, তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব।

  • ঋণ ও সম্পদ: বর্তমান বাজারে রুপার মূল্য কম হওয়ায় রুপার হিসাব অনুযায়ী অধিকাংশ মধ্যবিত্তের ওপরই কোরবানি ওয়াজিব হয়। তবে হিসাব করার সময় নিজের জরুরি ঋণ বাদ দিয়ে হিসাব করতে হবে।

২. পশুর বয়স ও শারীরিক যোগ্যতা

  • বয়সের সীমা: গরু, মহিষ ও উট অন্তত ২ বছর এবং ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা অন্তত ১ বছর বয়সী হতে হবে। (তবে ৬ মাসের বেশি বয়সের ভেড়া বা দুম্বা যদি দেখতে ১ বছর বয়সীর মতো মোটাতাজা দেখায়, তবে তা দিয়ে কোরবানি জায়েজ)।

  • ত্রুটিমুক্ত পশু: পশুর চোখ অন্ধ, কান বা লেজের অধিকাংশ কাটা, শিং গোড়া থেকে উপড়ে যাওয়া বা অত্যন্ত দুর্বল-খোঁড়া হওয়া যাবে না, যার কারণে সে হেঁটে জবেহ করার স্থান পর্যন্ত যেতে পারে না।

৩. নিয়ত ও অংশীদারিত্বের নিয়ম

  • শুদ্ধ নিয়ত: কোরবানি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। লোকদেখানো বা শুধু গোশত খাওয়ার নিয়ত থাকলে কোরবানি কবুল হবে না।

  • অংশীদার (শরিক): গরু, মহিষ ও উটে সর্বোচ্চ ৭ জন শরিক হতে পারে। ছাগল, ভেড়া ও দুম্বায় ১ জনের বেশি শরিক হওয়া জায়েজ নেই।

  • শরিকদের নিয়ত: ৭ জনের মধ্যে যদি কোনো একজনেরও নিয়ত শুধু গোশত খাওয়া হয় বা উপার্জনে হারাম টাকা থাকে, তবে বাকি ৬ জনের কোরবানিও বাতিল হয়ে যাবে।

৪. জবেহ ও গোশত বণ্টনের সঠিক নিয়ম

  • নিজে জবেহ করা: সম্ভব হলে নিজের কোরবানি নিজে জবেহ করা সুন্নাত। না পারলে জবেহর সময় সামনে উপস্থিত থাকা উত্তম।

  • জবেহর সময়: জিলহজের ১০ তারিখ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত কোরবানি করা যায়। তবে প্রথম দিন করা সবচেয়ে উত্তম।

  • গোশত বণ্টন: কোরবানির গোশত তিন ভাগে বণ্টন করা মুস্তাহাব—এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য।

৫. কসাইয়ের মজুরি ও চামড়ার হক

  • মজুরি: কসাই বা শ্রমিককে কোরবানির গোশত, চামড়া বা মাথার কোনো অংশ মজুরি হিসেবে দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। মজুরি দিতে হবে নগদ টাকায়।

  • চামড়ার টাকা: কোরবানির পশুর চামড়া নিজে ব্যবহার করতে পারেন। তবে বিক্রি করলে সেই পুরো টাকা গরিব, এতিম বা মিসকিনদের দান করে দিতে হবে। মসজিদের উন্নয়ন বা কোনো পারিশ্রমিকে এই টাকা দেওয়া যাবে না।

একটি বিশেষ আমল (যাঁরা কোরবানি দিতে পারছেন না)

যাঁদের কোরবানি দেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য নেই, তাঁরা জিলহজের চাঁদ ওঠার পর থেকে নিজের নখ, চুল বা গোঁফ না কেটে ঈদের দিন নামাজের পর তা পরিষ্কার করলে, আল্লাহ তাআলা তাঁদের একটি পূর্ণ কোরবানির সওয়াব দান করবেন (আবু দাউদ: ২৭৮৯)।