বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম আল্লাহর নামে শুরু করলাম
কখনো কি একটু থেমে ভেবে দেখেছেন—মানুষ এত কিছু করার স্বপ্ন দেখে, এত কিছু নিয়ে পরিকল্পনা করে, অথচ এই পৃথিবীতে থাকার সময়টা আসলে কতই না ছোট! ছোটবেলায় মনে হয় জীবন অনেক বড়। তারপর ধীরে ধীরে যখন বয়স বাড়তে থাকে, তখন হঠাৎ মনে হয়—সময় যেন চোখের পলকে চলে যাচ্ছে।
আজ যে মানুষটি আমাদের পাশে আছে, কিছুদিন পর হয়তো সে আর নেই। গতকাল যে মানুষটির সঙ্গে কথা বলেছি, আজ হয়তো তার জন্যই আমাদের দোয়া করতে হচ্ছে। এটাই দুনিয়ার বাস্তবতা।
ইসলাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই পৃথিবীর জীবন চিরস্থায়ী নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, “প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।”
অর্থাৎ মানুষ যত শক্তিশালী হোক, যত ধনী হোক, যত বড় পরিচয়ের অধিকারী হোক—একদিন তাকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে।
তাহলে মানুষের জীবন এত কম কেন?
ইসলামের দৃষ্টিতে দুনিয়ার জীবন মূল গন্তব্য নয়। এই জীবন হচ্ছে পরীক্ষা ও প্রস্তুতির সময়। আল্লাহ দেখছেন, কে ভালো কাজ করছে, কে অন্যায় থেকে নিজেকে দূরে রাখছে, কে বিপদের সময় ধৈর্য ধরছে এবং কে আল্লাহকে স্মরণ করছে।
আল্লাহ বলেন, “যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন—কে কাজে উত্তম।”
তাই জীবনের দৈর্ঘ্যই আসল বিষয় নয়; বরং সেই জীবন কীভাবে কাটানো হলো, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মানুষ হয়তো অনেক বছর বেঁচে থেকেও জীবনে ভালো কোনো কাজ করল না। আবার কেউ অল্প বয়সে মারা গেলেও এমন কিছু ভালো কাজ করে যেতে পারে, যার উপকার মানুষ বহু বছর ধরে পেতে থাকে।
আমরা অনেক সময় বলি, “আরেকটু সময় পেলে এটা করব, ওটা করব, নামাজ শুরু করব, তওবা করব, বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করব।”
কিন্তু সমস্যা হলো—“আরেকটু পরে” কথাটার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
আমরা জানি না আগামীকাল আমাদের জন্য লেখা আছে কি না।
রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের কী শিক্ষা দিয়েছেন?
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন অপরিচিত ব্যক্তি অথবা পথিক।” — সহিহ বুখারি।
একজন পথিক যখন কোথাও যায়, সে সেখানে স্থায়ী বাড়ি বানানোর চিন্তা করে না। তার মূল লক্ষ্য থাকে গন্তব্যে পৌঁছানো।
আমাদের জীবনও অনেকটা তেমন। আমরা এই পৃথিবীতে কিছুদিনের জন্য এসেছি। আমাদের আসল গন্তব্য আখিরাত।
তাই টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ি, ব্যবসা, চাকরি—এসবের প্রয়োজন আছে, কিন্তু এগুলো যেন আমাদের জীবনের আসল উদ্দেশ্য হয়ে না যায়।
মৃত্যুর কথা শুনলে অনেকের মন খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু একজন মুমিনের জন্য মৃত্যুর কথা স্মরণ করা হতাশার বিষয় নয়; বরং নিজেকে সংশোধন করার একটি সুযোগ।
আজ যদি আমরা বুঝতে পারি যে জীবন খুব ছোট, তাহলে হয়তো কাউকে অকারণে কষ্ট দেওয়ার আগে দুবার ভাবব।
হয়তো কারো সঙ্গে ঝগড়া করে থাকলে তাকে ক্ষমা করে দেব।
হয়তো বাবা-মায়ের সঙ্গে একটু ভালোভাবে কথা বলব।
হয়তো নামাজকে আর অবহেলা করব না।
হয়তো গোপনে করা কোনো গুনাহ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর কাছে তওবা করব।
কারণ আমরা জানি না—আমাদের জীবনের শেষ দিনটি কোন দিন।
আসলে জীবন ছোট নয়, আমরা সময়ের মূল্য বুঝি না
আমরা অনেক সময় মনে করি, জীবন ছোট। কিন্তু সত্যি বলতে, আল্লাহ আমাদের যে সময় দিয়েছেন, সেটাই আমাদের জন্য যথেষ্ট—যদি আমরা তার সঠিক ব্যবহার করতে পারি।
একটি দিনের ২৪ ঘণ্টা ধনী-গরিব সবার জন্য সমান।
কেউ সেই সময়ে আল্লাহকে স্মরণ করে, পরিবারকে সময় দেয়, মানুষের উপকার করে এবং নিজের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেয়।
আবার কেউ একই সময় শুধু মোবাইল, ঝগড়া, অহেতুক কথা আর দুনিয়ার চিন্তায় কাটিয়ে দেয়।
দিন শেষে দুজনের কাছেই ২৪ ঘণ্টাই ছিল। পার্থক্য শুধু ব্যবহারে।
তাই আজ থেকেই একটু ভাবুন
আমরা সবাই একদিন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব। আমাদের সঙ্গে যাবে না টাকা, বাড়ি, গাড়ি কিংবা মোবাইল ফোন। সঙ্গে যাবে আমাদের আমল।
তাই জীবন কত বছর বাঁচলাম—শুধু সেটাই বড় কথা নয়। বরং কীভাবে বাঁচলাম, কাকে ভালোবাসলাম, কাকে কষ্ট দিলাম, কতটা আল্লাহকে স্মরণ করলাম এবং কী আমল নিয়ে তাঁর কাছে ফিরে গেলাম—সেটাই আসল।
হয়তো আমাদের জীবন খুব দীর্ঘ হবে না। কিন্তু আল্লাহ চাইলে অল্প জীবনকেও বরকতময় করে দিতে পারেন।
তাই “আরেকদিন থেকে ভালো হয়ে যাব”—এই চিন্তা না করে আজ থেকেই শুরু করা উচিত।
আজ একটি নামাজ ঠিকভাবে পড়ি।
আজ একজন মানুষকে ক্ষমা করি।
আজ বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাই।
আজ কারো উপকার করি।
আর রাতের বেলা ঘুমানোর আগে নিজেকে একটা প্রশ্ন করি—
“আজকের দিনটা যদি আমার জীবনের শেষ দিন হতো, তাহলে কি আমি আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত ছিলাম?”
এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আমাদের জীবন বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
কারণ দুনিয়ার জীবন সত্যিই অল্প। কিন্তু এই অল্প জীবন দিয়েই মানুষ চাইলে এমন একটি আখিরাত তৈরি করতে পারে, যার আনন্দ কখনো শেষ হবে না।
1 টি মন্তব্য