কিভাবে স্ক্রিন টাইম কমানো যায়?
বর্তমানে যেকোনো পাবলিক জায়গায় আপনি ঘুরে দেখুন বেশিরভাগ মানুষই তাদের সময়টা মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়েই ব্যয় করে চলেছে । এটি আমাদের চারিপাশে সর্বত্রই বিস্তৃত। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০% এরও বেশি কিশোর কিশোরী তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় কাজ বাদে চার ঘন্টারও বেশি সময় স্ক্রিনে ব্যয় করে থাকে। স্কিন টাইম যে আমাদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এটা আমরা সকলেই জানি। আমরা সকলেই শুনেছি বা জানি যে ফোনে বেশি সময় কাটানোর ফলে আমাদের ভেতরে উদ্বেগ, বিষন্নতা, ক্লান্তি এবং ঘুমের অবনতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি আপনাদের আমার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু টিপস শেয়ার করতে চাই আশা করি এটা আপনাদের কাজে আসবে।
সব স্ক্রিন টাইম সমান হয় না।
আমরা মোবাইলে একটা ই-বুক পড়ার থেকে টিক টকে স্ক্রলিং করতে কিংবা বন্ধুদের সাথে গেম খেলতে একটু বেশি সময়ই ব্যয় করতে পছন্দ করব। স্ক্রিন টাইম কে আমরা আমাদের খাবারের সাথে তুলনা করতে পারি। কারণ এই আধুনিক জীবনে ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহার করা আমাদের অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। আর এই ডিজিটাল জগত থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে ফেলা বর্তমানে অসম্ভব। খাবার যেমন আমাদের জীবনে একটা অপরিহার্য বিষয় হয়ে উঠেছে তেমনি স্ক্রিন টাইমও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে খাওয়ার সময় আমরা যেমন পরিমিত খাবার গ্রহণ করি তেমনি আমাদেরকে স্ক্রিনও পরিমিত ব্যবহার করা উচিত। কারণ দুটি আমাদের জন্য প্রয়োজন কিন্তু এদের একটিও প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত হলে শরীরের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে গেলে স্ক্রিন টাইম কমানো সত্যিকার অর্থেই অনেক কঠিন। আর এটাকে একেবারেই নির্মূল করা কোন যুক্তিসঙ্গত বিষয় নয়। আপনি হয়তো জানেন অথবা জেনে অবাক হবেন যে প্রতিবছর কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয় এই কারণে যে কিভাবে আপনার ফোনকে আরো আসক্তি কর করে তোলা যায় তার পদ্ধতি খোঁজার জন্য। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, আর এটির বিরুদ্ধে লড়াই করাও সম্ভব নয়। তাই নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হওয়া দরকার। আমি প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চেষ্টা করছি। কিন্তু এখনো আমি আমার কাঙ্খিত জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি। তবে এই বিষয়ে রিসার্চ করতে গিয়ে আমি এমন কিছু পদ্ধতি খুজে পেয়েছি যা কাজ করে এবং এই আর্টিকেলে আমি সেগুলোই আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাচ্ছি।
আমি ইতোমধ্যেই আমার প্রথম টিপসটি শেয়ার করেছিঃ বিভিন্ন ধরনের স্ক্রিন টাইমের মধ্যে পার্থক্য করা। টিক টক কিংবা ফেসবুক স্ক্রল করার পরিবর্তে উইকিপিডিয়াতে একটা বই পড়া বা একটা নিবন্ধ পড়া কিংবা বাস্তবে একটা বই পড়া এবং এর পেছনে প্রতিটা মিনিট সময় ব্যয় করা আপনার জন্য একটা মাইলস্টোনের মত হবে। তবে প্রথমদিকে সেই মাইলস্টোন অর্জন করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। আপনার মস্তিষ্ক এক গেমের সামান্যতম সম্ভাবনা থেকে বাঁচতে আপনার ফোনের উপর নির্ভরশীল হবে এবং আপনাকে অস্থির করে তুলবে। আপনি আপনার মনোযোগের সময়কাল ও হারিয়ে ফেলবেন এবং কোন কাজে মনোযোগী হতে পারবেন না। তবে আপনাকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার।
২. প্রলোভন দূর করুন
আমার দ্বিতীয় পদ্ধতিটা কিছুটা খাবারের সাথে সদৃশ্যতা রয়েছে। এর একটা সাধারণ পরামর্শ হলো যে জাঙ্ক ফুড এড়িয়ে চলার সর্বোত্তম উপায় হল এটিকে বাড়িতে না রাখা। ফলে আপনাকে এটি নেয়ার ভাবতেও হবে না আর আপনার জাঙ্ক ফুটো খাওয়া প্রয়োজন হবে না। ঠিক তেমনভাবেই মোবাইলের আসক্তি কর অ্যাপগুলো কাজ করে। তাই আপনার উচিত এই আসক্তিঘর অ্যাপগুলো ফোন থেকে একেবারে ডিলিট করে ফেলা। আমি জানি এটা অনেকের কাছেই অসম্ভব । তাই ডিলিট করতে না পারলেও এটাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা।
তার আগে আমার কিছু মজার অভিজ্ঞতা আপনাদের কাছে শেয়ার করি। এই পদ্ধতিটা আমিও ব্যবহার করেছিলাম। কিন্তু এই পদ্ধতিটা ততদিনই কাজ করেছিল যতদিন পর্যন্ত আমার মস্তিষ্ক জানতে পারেনি যে এই অ্যাপগুলোর ওয়েবসাইট সংস্করণও ব্যবহার করা যেতে পারে। তাই এই অ্যাপগুলোকে আবার আমার মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ নিতে বেশি সময় লাগে। আর আমি একদম শিওর যে এটা আপনাদের সাথেও ঘটবে। তারপরেও আমি কিছুদিন ব্যবহার করেছিলাম। তবে যখনই আমি ফেসবুকের একটা পোস্ট দেখতাম তখন এটা এতটাই লোভনীয় হয়ে দাঁড়াতো আমার জন্য যে আমি ব্লগারটাকে অফ করে ঘন্টার পর ঘন্টা ফেসবুক স্কলিং করার জন্য ব্যস্ত হয়ে যেতাম।

অবশেষে আমি একটা সমাধান খুঁজে পেয়েছি। এই কাজটা একটু কঠিন এবং লজ্জাজনও হতে পারে কিন্তু আপনি যদি সত্যিই আপনার স্কিন টাইমকে কমাতে চান তাহলে এই কাজটা আপনার জন্য অনেক কার্যকর হবে। আমি আমার আম্মুকে এই অ্যাপগুলোর ব্লক করে রেখে দিতে বলেছিলাম আর এর পাসওয়ার্ড আমাকে বলতে মানা করেছিলাম। তারপরে আমার যখনই প্রয়োজন হতো তখন আম্মুর কাছ থেকে ওই অ্যাপের পাসওয়ার্ড আনলক করে নিতাম কিন্তু আম্মু আমাকে পাসওয়ার্ড বলতো না। আমি এই পদ্ধতিটা কয়েক মাস যাবত ব্যবহার করছি আর সত্যি বলতে এটা অনেকটাই কার্যকর। এখন আপনি চাইলে আপনার কোন বন্ধু বা আপনার স্ত্রী বা আপনার কোন কাছের মানুষ যে আপনার সাথে সবসময় থাকে তাদের দিয়ে কাজটি করিয়ে নিতে পারেন। স্ক্রিন টাইম কমানোর জন্য এর চেয়ে আর কোন ভাল পদ্ধতি আমার জন্য কাজ করেনি।
আর আমার কম্পিউটারের জন্য ফ্রিডম নামক একটি অ্যাপ ব্যবহার করতাম। এই অ্যাপটার একটা সুবিধা কিংবা অসুবিধা যেটাই মনে করেন সেটা হলো এটা যখন লক মুডে রাখা হয় বা লক মোড সক্রিয় থাকা অবস্থায় আপনি এর কোন পরিবর্তন করতে পারবেন না। অর্থাৎ আপনি আপনার কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারবেন না। এটা ব্যবহার করার বা লক খোলার একমাত্র উপায় হল আপনাকে মূল কোম্পানির কাছে ফোন করা। যারা মোবাইল ব্যবহার করেন তারা তো অ্যাপ লকার ব্যবহার করতে পারেন আর যারা কম্পিউটার ব্যবহার করেন তারা এ ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারেন। দুটোই আপনার জন্য কার্যকর।
নিজেকে শান্ত রাখুন
আপনি যখন প্রথম দিকে নিজের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবেন তখন আপনার কাছে অনেকটা অবসর সময় বেঁচে থাকবে। এখন আপনার মস্তিষ্ক এই অবসর সময়টাকে অতিবাহিত করার জন্য বিভিন্ন কাজ করার চেষ্টা করবে। আপনাকে ফোন ব্যবহারের জন্য আরো উৎসাহিত করে তুলবে। তাই আপনাকে এই সময়ে অবসর সময়টাকে কাজে লাগানোর জন্য অন্যান্য কিছু কাজ করা উচিত যেটা আপনাকে অনেক সাহায্য করবে। আর আপনার যদি একান্তই মোবাইল দেখতে ইচ্ছা হয় তাহলে আপনি কোন বড় মুভি কিংবা কোন পডকাস্ট অথবা কোন পাজল গেম খেলতে পারেন। আমি মনে করি এটা আপনার ডুম স্ক্রলিং করার চেয়ে উত্তম।
গত কয়েক মাস ধরে আমি আমার সবার ঘরকে একেবারে ফোন বিহীন অঞ্চলে পরিণত করেছি। শুরুতে এটা আমার জন্য অনেকটা অস্বস্তিকর মনে হলেও সময়ের সাথে সাথে এটা আমার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে এটা আমি প্রতিদিনই ব্যবহার করি এবং এই কাজের জন্য প্রায় ৯৫ পার্সেন্ট টি সফল বলা চলে। এটি আমার ঘুমকে আরো আরামদায়ক এবং কার্যকর করে তুলেছে।
আমি আমার কাজ করার জন্য ল্যাপটপ এবং মোবাইল ফোন কে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দিই। যখন আমার প্রয়োজন হয় তখন আমার ওই জায়গায় বসে কাজ করা লাগে। যার ফলে আমি ঘন্টার পর ঘন্টা স্ক্রিনের পেছনে সময় নষ্ট করতে পারিনা।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনের জন্য অপরিহার্য এবং এটি আমাদের জীবনকে ব্যাপকভাবে উন্নত করে তুলেছে। তবে, আমাদের ডিভাইস গুলির সাথে কিভাবে যোগাযোগ করা যায় সে সম্পর্কে আমাদের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শেয়ার করা এ আর্টিকেলটি আপনার কিছুটা হলেও কাজে এসেছে। আপনার যদি নিজের কোন অভিজ্ঞতা থাকে তাহলে আপনি কমেন্টে জানাতে পারেন। ধন্যবাদ।
আমার ওয়েবসাইট
https://abirahmad1208.wordpress.com