আসসালামু আলাইকুম

আশা করি সকলেই অনেক ভালো আছেন। আজকে আপনাদের মাঝে সাস্থ সচেতন সম্পর্কে একটা আর্টিকেল নিয়ে হাজির হলাম। আশা করবো এটা আপনাদের কাজে দিবে। সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের মধ্যে নতুন এক ট্রেন্ড ছড়িয়ে পড়েছে তা হলো Fibermaxxing.

বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায়, বিশেষ করে টিকটকে অনেকেই ফাইবারকে “ম্যাজিক ফুড” হিসেবে তুলে ধরছে। অর্থাৎ প্রচুর ফাইবার খেলেই শরীর সাস্থ্য ফিট ইত্যাদি ইত্যাদি প্রচারণা করছে। এর ফলে অনেকেই খাদ্য তালিকায় এখন অতিরিক্ত ফাইবার গ্রহণ করা শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অতিরিক্ত ফাইবার কি আসলেই শরীরের জন্য উপকারী, নাকি এতে উল্টো ক্ষতির ঝুঁকি বেশি?

আজকের আর্টিকেলে এই বিষয়েই আপনাদের ক্লিয়ার করার চেষ্টা করবো। তো চলুন মূল টপিকের দিকে আগানো যাক।

 

Fibermaxxing কী

প্রথমেই আসি Fibermaxxing কী? আসলে Fibermaxxing হলো দৈনিক খাবারে অতিরিক্ত ফাইবার যুক্ত করা। বর্তমানে এটি একটি ট্রেন্ড হয়ে দাড়িয়েছে, ফলে মানুষ খাদ্যে প্রাকৃতিক উৎস ছাড়াও অতিরিক্ত ফাইবার সাপ্লিমেন্ট বা ফাইবার পাউডার ব্যবহার করে দৈনিক ফাইবারের মাত্রা বাড়াচ্ছে।

যদিও এর উদ্দেশ্য মূলত হজমশক্তি উন্নত করা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শরীরকে টক্সিনমুক্ত করা তার পরেও এই অতিরিক্ত ফাইবার গ্রহণ করতে গিয়ে উলটো নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।

 

Fibermaxxing হঠাৎ জনপ্রিয় হলো কেন

বর্তমানে ফাইবার ম্যাক্সিং একটা ট্রেন্ড হয়ে গেছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। আর এই ট্রেন্ডটা জনপ্রিয় হয়ে গেছে কয়েকটি কারণে। তার মধ্য মূল কিছু কারণ আপনাদের মাঝে তুলি ধরি-

ওজন নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা- অনেকের ওজন নিয়ন্ত্রণে না থাকায় (বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী কম বা বেশি থাকা) অনেকে এই ট্রেন্ডে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। যেহেতু এটি হজম শক্তি উন্নত করে তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে এটা কাজে দেয়।

গাট হেলথ সচেতনতা- সাম্প্রতিক সময়ে গাট মাইক্রোবায়োম নিয়ে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে। ফাইবার এটি নিয়ন্ত্রণে ভালো কাজ করে। যারা গাট হেলথ বলতে কি বুঝায় জানেন না তাদের জন্য বলে রাখি হজম তন্ত্র ও অন্ত্রের প্রতি সচেতনতাই হলো গাট হেলথ সচেতনতা।

সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব- কোনো জিনিসকে হাইপে তুলতে এখন সোশ্যাল মিডিয়ার কোনো বিকল্প নাই। হঠাৎ করেই একটা ছোট বিষয়কেও হাইপে তুলা যায় এই সোশ্যাল মিডিয়া দিয়ে। তেমনি এই Fibermaxxing টাও মূলত সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব থেকেই হাইপে এসেছে। TikTok, Instagram-এর হেলথ ইনফ্লুয়েন্সাররা Fibermaxxing-কে “স্বাস্থ্যর শর্টকাট” হিসেবে প্রচার করছে ফলে এর জনপ্রিয়তা বেড়েছে।

সাপ্লিমেন্টের সহজলভ্যতা- বাজারে বিভিন্ন ধরনের ফাইবার পাউডার, ট্যাবলেট সহজেই পাওয়া যায় তাই যখনই এটা ট্রেন্ডে উঠলো তখনই লোকেদের জন্য এটা পাওয়া সহজ থাকায় আরো বেশি জনপ্রিয় হয়ে গেল এই ফাইবার ম্যাক্সিং ট্রেন্ড।

ফাইবার আমাদের শরীরের জন্য আসলেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা অবশ্যই সঠিক মাত্রায় থাকতে হবে। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো না। তাই সবাইকে ফাইবারের আসল উপকারিতা এবং কতটুকু প্রয়োজন সে সম্পর্কে জানতে হবে।

 

ফাইবারের আসল উপকারিতা

পরিমিত পরিমাণ ফাইবার গ্রহণ শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। শরীরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে ফাইবার অনেক সাহায্য করে। ফাইবার হজমে সহায়ক হিসাবে কাজ করে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে।

হৃদরোগ প্রতিরোধে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করেও ফাইবার আমাদের দেহের অনেক সাহায্য করে। ডায়াবেটিস ম্যানেজমেন্টে রক্তে শর্করা ধীরে বাড়ায়, ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। আবার ওজন নিয়ন্ত্রণ ও গাট হেলথ এ এটা যে গুরুত্বপূর্ণ তা তো উপরে বললামই।

 

অতিরিক্ত ফাইবার গ্রহণের ফলাফল

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, “অতি লোভে তাতি নষ্ট” এই সেইম জিনিসটা খাবারের ক্ষেত্রেও বলা যায় যে, “খাওয়া ভালো তবে অতিরিক্ত খাওয়া কখনোই ভালো না।” তেমনি অতিরিক্ত ফাইবার গ্রহণ ও শরীরের জন্য অনেক ক্ষতিকর কিছু ফলাফল নিয়ে আসতে পারে। অতিরিক্ত ফাইবার গ্রহণ শরীরে বেশ কিছু অস্বস্তি ও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে কয়েকটি হলো-

১. অতিরিক্ত গ্যাস ও পেট ফোলাভাব – অনেক বেশি ফাইবার হঠাৎ গ্রহণ করলে পেটে গ্যাস জমে অস্বস্তি তৈরি হয়। (হঠাৎ বলতে আগে যে পরিমাণ ফাইবার শরীরে যেত তার থেকে অনেক গুন বেশি যাচ্ছে এখন তাও হঠাৎ করে এটা বোঝানো হয়েছে। তবে যদি জিনিসটা ধীরে ধীরে বাড়ে তবে এই ঝুঁকি কিছুটা এড়াতে পারবেন)

২. ডায়রিয়া – অতিরিক্ত ফাইবার শরীর মানিয়ে নিতে না পারলে হজমের সমস্যা হয়। ফলে ডাইয়ারিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্যর মতো রোগ হতে পারে।

৩. ভিটামিন ও মিনারেল শোষণে বাধা – অতিরিক্ত ফাইবার শরীরে লোহা (Fe), ক্যালসিয়াম (Ca), জিঙ্ক (Zn) শোষণে সমস্যা করে।

৪. ডিহাইড্রেশন – ফাইবার পানি শোষণ করে, ফলে পর্যাপ্ত পানি না খেলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে।

৫. অতিরিক্ত ওজন কমে যাওয়া – অতিরিক্ত ফাইবার খেলে হজম শক্তি বেশ নিয়ন্ত্রণে আসে, ফলে খাবারের পরিমাণ অনেকে কমিয়ে দেয়। এই কমানোর ফলে অনেকের শরীরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ প্রোটিন, শর্করা, চর্বি সরবরাহ হয় না। ফলে শরীর দুর্বল হয়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে শরীরের ওজন অতিরিক্ত কমে যেতে পারে।

 

দিনে কতটুকু ফাইবার প্রয়োজন

এবার আসি দিনে কতটুকু ফাইবার প্রয়োজন এটা নিয়ে। আগেই বলেছি ফাইবার শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি সঠিক মাত্রায় ফাইবার শরীর পায় তাহলে সেটা অনেক উপকারী। বিশেষজ্ঞদের মতে-

পুরুষদের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৩০–৩৫ গ্রাম ফাইবার প্রয়োজন এবং নারীদের জন্য প্রতিদিন প্রায় ২৫–৩০ গ্রাম ফাইবার। আর শিশু ও কিশোরদের জন্য বয়স ও ওজন অনুযায়ী এর পরিমাণ কম হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই ফাইবার ধীরে ধীরে খাদ্যাভ্যাসে যোগ করতে হবে এবং পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। কারণ একসাথে হঠাৎ পরিমাণ বাড়ালে যেমন ক্ষতি হবে, তেমনি ফাইবার পানি শোষণ করায় শরীরে পানি শূন্যতা যেন না হয় তাই বেশি পানি খেতে হবে।

 

 

সাপ্লিমেন্ট থেকে ফাইবার গ্রহণ কি আসলেই সাস্থ্য ঝুকিপূর্ণ

একজনের জন্য কতটুকু ফাইবার শরীরের লাগবে তা উপরে বলেছি। এখন সেই পরিমাণ আপনি সাপ্লিমেন্ট এর মাধ্যমে না নরমালি খাদ্যাভ্যাস এর মাধ্যমে গ্রহণ করবেন তা আপনার বিষয়। তবে কথা হলো অতিরিক্ত পরিমাণ না গ্রহণ করা। যতক্ষণ পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরিমাণ এর মধ্য থাকবে ততক্ষন আপনার জন্য তা সুফল নিয়ে আসবে। [প্রতিদিন যা প্রয়োজন তা থেকে ২-৫ গ্রাম কম বেশি হলে সমস্যা নেই, তবে অতিরিক্ত বেশি হলে সমস্যা]

 

শেষ কথা

Fibermaxxing নিঃসন্দেহে একটি আলোচিত ও কার্যকরী ট্রেন্ড। কারণ ফাইবার আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী, কিন্তু অতিরিক্ত ফাইবার গ্রহণ করলে হজমে সমস্যা, গ্যাস, ডিহাইড্রেশন এমনকি গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন-মিনারেল ঘাটতির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই চেষ্টা করবেন সব সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ এর মধ্য ফাইবার গ্রহণ করতে। আজকের আর্টিকেল এই পর্যন্তই, দেখা হবে পরবর্তী কোনো আর্টিকেলে। আল্লাহ হাফেজ।