জীবনের ইঁদুর দৌড়: আমরা আসলে কোথায় ছুটছি এবং কেন?
আপনাকে যদি একটা খুব সহজ প্রশ্ন করি, আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যটা কী? হয়তো বলবেন, পরীক্ষায় একটা ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ পাওয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটে পড়ার সুযোগ, দিনরাত এক করে পড়ে একটা বিসিএস ক্যাডার হওয়া, কিংবা মতিঝিল বা গুলশানের কোনো কর্পোরেট অফিসে অনেক বড় বেতনের একটা চাকরি।
আচ্ছা, আমি যদি আপনাকে বলি এই লক্ষ্যগুলোর সবগুলো অর্জন করার পরও আপনি ভেতর থেকে ঠিক আগের মতোই অসন্তুষ্ট থাকবেন? তাহলে সমস্যাটা কোথায়? আপনার লক্ষ্যগুলোতে, নাকি আমরা যে সিস্টেমে বাস করছি সেই পুরো খেলাটাতেই?
একটু চোখ বন্ধ করে মনে করে দেখুন তো! প্রাইমারি স্কুলে রোল এক হওয়ার জন্য যে ছোট্ট দৌড়টা আপনি শুরু করেছিলেন, সেই দৌড়টা কি আজ ১৫ বা ২০ বছর পরও থেমেছে? না। বরং আজ সেটা রূপ নিয়েছে অফিসের প্রমোশনের দৌড়ে, ঢাকার বুকে একটা ফ্ল্যাট কিনে তার ইএমআই (EMI) শোধ করার দৌড়ে, কিংবা সমাজের চোখে নিজেকে সফল প্রমাণ করার এক অন্ধ দৌড়ে। আপনি দৌড়াচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু কখনো কি খেয়াল করেছেন আপনার এই দৌড়ের কোনো ‘ফিনিশ লাইন’ বা শেষ সীমানা নেই?
কোথা থেকে এলো এই ‘রেট রেস’ বা ইঁদুর দৌড়?
ইঁদুর দৌড় বা ‘র্যাট রেস’ নামটা শুনলে মনে হতে পারে এটা বুঝি আধুনিক কর্পোরেট দুনিয়ার কোনো গালভরা শব্দ। কিন্তু এর শিকড় অনেক গভীরে। আমরা অনেকেই মনে করি, এই অবিরাম ছুটে চলাই আধুনিক জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি। কিন্তু ধারণাটি ভুল।
শিল্প বিপ্লবের আগে মানুষ কিন্তু জীবনের জন্যই কাজ করতো। বেশি পেছনে যেতে হবে না, আমাদের দেশের গ্রামগুলোর দিকে তাকান বা আপনার দাদা-নানার কথাই ভাবুন। তাদের জীবন কেমন ছিল? সূর্য উঠলে ঘুম ভাঙতো, মাঠে বা নিজের কাজে যেতেন, আর সূর্যাস্তের সাথে সাথে পৃথিবীর সব ব্যস্ততা থামিয়ে দিয়ে পরিবারের সাথে সময় কাটাতেন। তাদের জীবনে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টার কোনো ডেডলাইন বা বায়োমেট্রিক হাজিরা ছিল না। তাদের জীবন চলতো প্রকৃতির ছন্দে।
কিন্তু আজকের বাস্তবতা দেখুন। আমাদের জীবন মানেই হলো প্রোডাক্টিভিটি বা উৎপাদনশীলতা। শিল্প বিপ্লবের পর মানুষকে আর মানুষ হিসেবে দেখা হলো না, দেখা হলো যন্ত্রের একটা ক্ষুদ্র অংশ হিসেবে। আমাদের বোঝানো হলো, ঘড়ির কাঁটা দৌড়ানোর সাথে সাথে আমরা যদি না দৌড়াই, তবে আমাদের জীবনই বৃথা। আজ আমাদের পুরো জীবনটাকেই সাজানো হয়েছে শুধু কাজ, টাকা আর সফলতার এক নিরন্তর দাসত্বে।
সুখের খোঁজে কেনাকাটার ফাঁদ
ইতিহাসের এই গল্পটা কি শুধু বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ? একটু নিজের ঘরের দিকে তাকান। আলমারির ড্রয়ারটা খুলুন। সেখানে এমন অনেক জিনিস পড়ে আছে, যেগুলো আপনি গত বছর কিনেছিলেন কেবল ‘সুখী’ হওয়ার জন্য।
মনে করে দেখুন তো আপনার সেই বাইকটার কথা, যেটা কেনার জন্য বাবা-মায়ের সাথে কত তর্কই না করেছিলেন! কিংবা সেই নতুন আইফোনটার কথা, যেটা হাতে পাওয়ার পর মনে হয়েছিল আপনি জগতের সব সুখ পেয়ে গেছেন। কিন্তু আজ? আজ সেই একই ফোন, সেই একই বাইক আপনার আর ভালো লাগছে না। কারণ, এই সিস্টেম বা সমাজ এখন আপনাকে নতুন মডেলের লোভ দেখাচ্ছে।
আর ঠিক এই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় আমাদের আসল পতন। বিজ্ঞাপন যখন আপনার মগজে ঢুকিয়ে দেয় যে, নতুন মডেলের ফোন বা গাড়িটি না থাকলে আপনি ‘স্মার্ট’ বা ‘সফল’ মানুষ নন, তখন আপনি সেই নতুন আপডেটের নেশায় মত্ত হয়ে ওঠেন। হাতে টাকা নেই? সমস্যা নেই! আপনি হয়তো মা-বাবার সারা জীবনের সঞ্চয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। অথবা চাকরিজীবী হলে বসের মন জুগিয়ে প্রমোশনের জন্য নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেন। কারণ আপনার ওই স্ট্যাটাসটা চাই-ই চাই।
বিজ্ঞাপন শিল্পের জনকেরা খুব ভালো করেই জানতেন মানুষকে কোনো কিছু গেলাতে হলে তার যুক্তির কাছে নয়, বরং তার অবচেতন মনের হীনম্মন্যতাকে উসকে দিতে হয়। তারা আমাদের মনে ঢুকিয়ে দিয়েছে, “তুমি এখন যা আছো, তা যথেষ্ট নও।” এরপর থেকে মানুষ আর প্রয়োজন মেটাতে পণ্য কেনে না, কেনে নিজের হীনম্মন্যতাকে ঢাকার জন্য একেকটি মুখোশ।
মনোবিজ্ঞানের খেলা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিষাদ
কোম্পানিগুলো শুধু আমাদের মন নিয়ন্ত্রণ করেই থামেনি, তারা আমাদের ব্যবহৃত পণ্যকেও নিয়ন্ত্রণ করছে। একে বলা হয় ‘পরিকল্পিত স্থায়িত্বহীনতা’ (Planned Obsolescence)। খেয়াল করেছেন, কেন আপনার সাধের ল্যাপটপ বা ফোনটা ২-৩ বছর পরই ধীরগতির হয়ে যায়? ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যায়? এটা প্রযুক্তির কোনো সীমাবদ্ধতা নয়, এটা তাদের বিজনেস মডেল। তারা চায় আপনি বাধ্য হয়ে নতুন মডেলের পেছনে দৌড়ান।
এর সাথে যোগ হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার বিষাক্ত তুলনা। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ তার নিজের মূল্য বিচার করে অন্যের সাথে তুলনা করে। আগে এই তুলনা ছিল পাশের বাড়ির ছেলেটার সাথে। আর এখন? আপনি সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে ক্যারিয়ারের সফলতা সবকিছুর তুলনা করছেন ফেসবুক বা ইন্সটাগ্রামে দেখা পুরো পৃথিবীর মানুষের সাথে।
আমাদের মস্তিষ্ক দুটি ভয়ংকর লুপে আটকে গেছে:
- হেডনিক অ্যাডাপ্টেশন (Hedonic Adaptation): আপনি যা পাচ্ছেন, খুব দ্রুত তাতেই অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছেন। ফলে পুরনো অর্জন আর আপনাকে আনন্দ দিচ্ছে না।
- সোশ্যাল কম্পারিজন (Social Comparison): স্ক্রিনে অন্যের সাজানো, ফিল্টার করা জীবন দেখে আপনার নিজের আসল জীবনটাকে অর্থহীন মনে হচ্ছে।
সোশ্যাল ডিলেমা-র ভাষায়, “আপনি যদি কোনো সার্ভিসের জন্য টাকা না দেন, তবে মনে রাখবেন আপনি নিজেই সেই সিস্টেমের পণ্য।”
বাংলাদেশের বাস্তবতা: “মানুষ কী বলবে?”
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে প্রতিটি পদক্ষেপ যেন অন্যের লিখে দেওয়া স্ক্রিপ্ট। সমাজ ঠিক করে দেয় কখন বিয়ে করতে হবে, কত বছর বয়সে ঢাকায় একটা ফ্ল্যাট কিনতে হবে, আর বিসিএস না হলে জীবনটা যে একেবারেই ব্যর্থ! এর মাঝে ‘মানুষ কী বলবে’ নামক একটা অদৃশ্য প্রহরী সবসময় আমাদের পিছু লেগে আছে।
আমরা দিন-রাত দৌড়াচ্ছি সফল হতে, নয়তো সফল হওয়ার অভিনয় করতে। আমরা প্রায়ই শুনি, অমুক ভাই দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজ করে, পরিবারকে সময় না দিয়ে কোটিপতি হয়েছেন। সমাজ তাকে মাথায় তুলে নাচে। কিন্তু একইভাবে কঠোর পরিশ্রম করেও যারা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি, তাদের খবর কি কেউ রাখে? একে বলা হয় ‘সারভাইভারশিপ বায়াস’ (Survivorship Bias)। আমরা শুধু বিজয়ীদের দেখি, আর এমন এক দৌড়ে নামি যেখানে গাণিতিকভাবেই হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
এমনকি যে চাকরিটা আপনি মনে প্রাণে ঘৃণা করেন, প্রতিদিন সকালে বিরক্ত হয়ে অফিসে যান, সেটাও আপনি ছাড়তে পারেন না। ভাবেন, “এত বছর তো এই পথেই সময় দিলাম, এখন ছাড়লে সব বৃথা হয়ে যাবে!” (Sunk Cost Fallacy)। আপনাকে যদি আজ প্রশ্ন করা হয়, “পেশার বাইরে আপনি কে?” এই উত্তর খুঁজে না পাওয়ার নামই হলো আইডেন্টিটি ক্রাইসিস।
বিসিএস: তিন লাখের দৌড়ে ১,৩২০ জন
এই দৌড়ের সবচেয়ে নির্মম প্রমাণ পেতে বেশি দূরে যেতে হবে না। ৪৭তম বিসিএসে ক্যাডার পদ ছিল মাত্র ৩,৪৮৭টি। অথচ আবেদন জমা পড়েছিল তিন লাখেরও বেশি।
বাকি প্রায় তিন লাখ মানুষের গল্প কেউ বলে না, কেউ মনে রাখে না। আমরা শুধু বিজয়ীদের গল্পই শুনি, হেরে যাওয়া মানুষদের নয় মনোবিজ্ঞানে একে বলে সারভাইভারশিপ বায়াস। আর এই ভুল ধারণাই আমাদের ঠেলে দেয় এমন এক দৌড়ে, যেখানে গাণিতিকভাবে বেশিরভাগ মানুষেরই হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা।
সিসিফাসের পাথর ও আমাদের মুক্তি
গ্রিক মিথোলজিতে সিসিফাস নামের এক ব্যক্তির শাস্তির গল্প আছে। তার শাস্তি ছিল একটি বিশাল পাথরকে পাহাড়ের চূড়ায় ঠেলে নিয়ে যাওয়া। সে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যখনই চূড়ায় পৌঁছাতো, ঠিক শেষ মুহূর্তে পাথরটি গড়িয়ে আবার নিচে পড়ে যেত। অনন্তকাল ধরে তাকে এই কাজ করে যেতে হতো। দার্শনিকদের মতে, সিসিফাসের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা পাথর ঠেলা নয়; তার আসল যন্ত্রণা হলো সে জানে এই কাজের কোনো শেষ নেই, কোনো চূড়ান্ত বিজয় নেই।
আমাদের জীবনটাও কি ঠিক এমন নয়? ছোটবেলায় বলা হলো ভালো রেজাল্ট করো, করলেন। তারপর বলা হলো ভালো ভার্সিটি, হলো। তারপর একটা ভালো চাকরি, প্রমোশন, ঢাকার বুকে ফ্ল্যাট, গাড়ি… লক্ষ্যগুলো বদলেছে ঠিকই, কিন্তু দৌড়টা কি কখনো থেমেছে? অর্জনগুলো সিসিফাসের পাথরের মতোই একদিন গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়, আর আমরা নতুন লক্ষ্যের পাহাড় ঠেলতে শুরু করি।
তাহলে উপায়?
এই রেট রেসের সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো, এখানে কেউ আপনাকে দৌড়াতে বাধ্য করে না। একসময় আপনি নিজেই এই দৌড়টাকে নিজের পরিচয় বানিয়ে ফেলেন। আর সেদিন থেকে খাঁচার দরজা খোলা থাকলেও আপনি আর বাইরে বের হওয়ার কথা ভাবেন না।
তবে মনে রাখবেন, সিসিফাসের সেই পাথরের কোনো বিকল্প ছিল না, কিন্তু আপনার আছে। পাথরটি ছেড়ে দেওয়া মানেই জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া বা সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়া নয়। বরং সেই পাথরটিকে নামিয়ে রেখে পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকানোর সাহস করা। নিজের জীবনের স্টিয়ারিংটা সমাজের হাত থেকে নিজের হাতে নেওয়ার নামই হলো প্রকৃত মুক্তি।
আগামীকাল সকালে ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করুন “আমি যা করছি তা কি আমার নিজের জীবনের গল্পের অংশ, নাকি সমাজ ও কর্পোরেট দুনিয়ার লিখে দেওয়া কোনো স্ক্রিপ্ট?”
মনে রাখবেন, সফলতা মানে সবার চেয়ে দ্রুত দৌড়ানো নয়। সফলতা মানে এমন এক জীবন গড়ে তোলা, যেটির প্রকৃত মালিক আপনি নিজেই।
1 টি মন্তব্য