অ্যাপল বনাম ওপেনএআই: বন্ধু থেকে শত্রু? স্মার্টফোনের ভবিষ্যৎ কার হাতে?
ভাবুন তো, আপনার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, যার সাথে আপনি দারুণ একটা ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন, হঠাৎ করেই একদিন সে আপনার নামে আদালতে মামলা করে বসল! সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, মামলা চলার পরও আপনারা একই অফিসে বসে একসাথে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ঠিক এমনটাই অদ্ভুত আর শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে প্রযুক্তি দুনিয়ার দুই মহারথী অ্যাপল (Apple) এবং ওপেনএআই (OpenAI)-এর মধ্যে।
এটি শুধু কোনো সাধারণ কর্পোরেট লড়াই নয়; এটি হলো ভবিষ্যতের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) কে নিয়ন্ত্রণ করবে, তার এক নীরব স্নায়ুযুদ্ধ। চলুন, কোনো জটিল প্রযুক্তিগত শব্দ ব্যবহার না করে, খুব সহজে এবং গল্পের মতো করে এই লড়াইয়ের পেছনের আসল কাহিনীটা জেনে নিই।
বন্ধুত্বের শুরু: ২০২৪ সালের সেই দারুণ চুক্তি
সময়টা ২০২৪ সালের জুন মাস। অ্যাপল ঘোষণা দিল, তারা আইফোনের ভেতরে ওপেনএআই-এর তৈরি চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)-কে জায়গা দিচ্ছে। ব্যাপারটা সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য ছিল দারুণ এক চমক! আইফোনের নিজস্ব ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘সিরি’ (Siri) যখন কোনো কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারত না, তখন সে সরাসরি চ্যাটজিপিটির সাহায্য নিত। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল, অ্যাপল ব্যবহারকারীদের আলাদা করে কোনো ওপেনএআই অ্যাকাউন্টও খুলতে হতো না।
ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান এই পার্টনারশিপ নিয়ে তখন দারুণ উচ্ছ্বসিত ছিলেন। চুক্তিটা দুই পক্ষের জন্যই বেশ লাভজনক মনে হচ্ছিল। অ্যাপল তাদের পুরোনো ও ধীরগতির হয়ে যাওয়া সিরি-কে রাতারাতি স্মার্ট করার সুযোগ পেল, আর ওপেনএআই পেয়ে গেল বিশ্বের সবচেয়ে দামি স্মার্টফোন নেটওয়ার্কে বিনা বাঁধায় প্রবেশের টিকিট।
কিন্তু পর্দার আড়ালে একটা বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। চ্যাটজিপিটি পেছনের সব কঠিন কাজ করে দিলেও, আইফোনের স্ক্রিন এবং নিয়ন্ত্রণ ছিল অ্যাপলের হাতে। গ্রাহকরা সব সুবিধা পাচ্ছিল অ্যাপলের দরজা দিয়ে ঢুকে। অর্থাৎ, গ্রাহক চিনত শুধু অ্যাপলকে। আর ঠিক এখানেই ওপেনএআই-এর অস্বস্তি শুরু হয়।
হঠাৎ ছন্দপতন: ২০২৬ সালের আইনি লড়াই
চুক্তির ঠিক দুই বছর পর, ২০২৬ সালের ১০ জুলাই, দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। অ্যাপল সোজা ওপেনএআই-কে টেনে নিয়ে গেল আদালতে! অ্যাপলের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর—তারা বলছে ওপেনএআই তাদের কোম্পানির সাবেক কর্মীদের ব্যবহার করে অ্যাপলের গোপন ফাইল, যন্ত্রপাতির নকশা, সাপ্লায়ারদের তথ্য এবং ম্যানুফ্যাকচারিং টেকনিক চুরি করেছে। উদ্দেশ্য? ওপেনএআই যেন তাদের এই চুরি করা জ্ঞান দিয়ে নিজেদের এআই হার্ডওয়্যার বা ডিভাইস খুব দ্রুত বানিয়ে ফেলতে পারে।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, আদালতে এই ভয়াবহ মারামারি চললেও, আইফোনের ভেতরে কিন্তু এখনো চ্যাটজিপিটির চুক্তি বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে। অ্যাপল চ্যাটজিপিটিকে একটি সফটওয়্যার হিসেবে আইফোনে রাখতে সম্পূর্ণ রাজি, কিন্তু ওপেনএআই যখনই আইফোনের মতো নিজস্ব কোনো ফিজিক্যাল ডিভাইস বানাতে যাচ্ছে, তখনই অ্যাপল ভয় পেয়ে যাচ্ছে। কেন এই ভয়?
ওপেনএআই কেন নিজস্ব হার্ডওয়্যার বানাতে চায়?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে “নিয়ন্ত্রণ” নামক শব্দের মধ্যে। বর্তমানে অ্যাপল চাইলে যেকোনো সময় চ্যাটজিপিটিকে বাদ দিয়ে গুগলের জেমিনি (Gemini) বা অন্য কোনো এআই-কে আইফোনে নিয়ে আসতে পারে। ওপেনএআই চিরকাল অ্যাপলের এই দয়ার ওপর নির্ভরশীল “ব্যাক-অফিস কর্মী” হয়ে থাকতে চায় না। তারা চায় মানুষের সাথে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করতে।
আমাদের দেশের একটি সহজ বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, আপনি ঢাকা থেকে তিন দিনের জন্য কক্সবাজার বা সিলেটে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করছেন। বর্তমানে আপনাকে কী করতে হয়? প্রথমে বাস বা ফ্লাইটের অ্যাপে টিকিট কাটতে হয়, এরপর অন্য ওয়েবসাইটে গিয়ে হোটেল খুঁজতে হয়, গুগল ম্যাপে রাস্তার লোকেশন দেখতে হয়, আর শেষে আলাদা আলাদা প্ল্যাটফর্মে পেমেন্ট করতে হয়। পুরো ব্যাপারটা বেশ ঝামেলার, তাই না?
ওপেনএআই-এর স্বপ্ন হলো, আপনি শুধু তাদের ডিভাইসকে বলবেন, “আমার বাজেটের মধ্যে কক্সবাজারের একটা ৩ দিনের ট্যুর প্ল্যান করে দাও।” এরপর এআই নিজেই আপনার পছন্দ বুঝে টিকিট কাটবে, হোটেল বুক করবে, রুট ঠিক করবে এবং এক ক্লিকেই সব পেমেন্ট করে দেবে।
কিন্তু আইফোনের ভেতরে বসে এই কাজ করা ওপেনএআই-এর পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। কারণ অ্যাপল কখনোই ওপেনএআই-কে আপনার লোকেশন, মেসেজ, ছবি বা পেমেন্টের পুরো নিয়ন্ত্রণ দেবে না। এজন্যই ওপেনএআই-এর এমন একটা নিজস্ব হার্ডওয়্যার দরকার, যেখানে ক্যামেরা, মাইক এবং সিস্টেমের পুরো নিয়ন্ত্রণ শুধু তাদের হাতে থাকবে। এই লক্ষ্যেই তারা ৬.৫ বিলিয়ন ডলার দিয়ে আইফোনের সাবেক বিখ্যাত ডিজাইনার জনি আইভের কোম্পানি কিনে নিয়েছে।
অ্যাপলের আসল ভয়টা কোথায়? ব্ল্যাকবেরি ও নোকিয়ার পরিণতি!
অনেকেই বলতে পারেন, অ্যাপল এত বড় কোম্পানি, তারা কেন ওপেনএআই-এর মতো নতুন কোম্পানির হার্ডওয়্যার নিয়ে ভয় পাবে? আইফোনকে হারানো কি এতই সহজ?
এর উত্তর হলো—ইতিহাস। একসময় নোকিয়া (Nokia) এবং ব্ল্যাকবেরি (BlackBerry)-কেও হারানো অসম্ভব মনে হতো। কিন্তু যখন টাচস্ক্রিন স্মার্টফোনের যুগ এলো, তারা তাল মেলাতে না পেরে হারিয়ে গেল। অ্যাপল ভয় পাচ্ছে যে, এআই হয়তো স্মার্টফোনের পরবর্তী বড় বিপ্লব।
আরেকটি বড় ভয় হলো নব্বইয়ের দশকের মাইক্রোসফটের মতো পরিস্থিতি। তখন মাইক্রোসফট ‘নেটস্কেপ’ ব্রাউজারকে ভয় পেয়েছিল। মাইক্রোসফটের ভয় ছিল, মানুষ যদি সব কাজ ইন্টারনেট ব্রাউজারের মাধ্যমেই করে ফেলে, তাহলে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের আর কোনো দাম থাকবে না। অ্যাপলের ভয়ও ঠিক এটাই। মানুষ যদি আইফোন কেনে ঠিকই, কিন্তু তাদের সব কাজ, সব নির্দেশ, সব সার্ভিস যদি ওপেনএআই-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তবে আইফোন শুধু একটা বোকা হার্ডওয়্যারে পরিণত হবে। ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি চলে যাবে এআই কোম্পানির হাতে। এই ভয় থেকেই মূলত অ্যাপলের এই মামলার জন্ম, যাতে তারা ওপেনএআই-এর গতি কিছুটা হলেও কমিয়ে দিতে পারে।
গুগলের রাজত্ব এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
অ্যাপল আর ওপেনএআই-এর এই লড়াইয়ের মাঝে আমরা কিন্তু বিশাল এক দৈত্যকে ভুলে যাচ্ছি, আর সে হলো গুগল (Google)। গুগলের হাতে রয়েছে ভবিষ্যতের রাজত্ব করার সব বড় বড় অস্ত্র। তাদের নিজস্ব এআই (Gemini), অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম, ক্রোম ব্রাউজার, গুগল ম্যাপস, জিমেইল এবং ইউটিউব—সবই আছে।
এবার একটু আমাদের বাংলাদেশের বাস্তবতায় চিন্তা করে দেখুন। আমাদের দেশে অ্যাপল ব্যবহারকারীর সংখ্যা খুবই সীমিত। বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশেরও বেশি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী সরাসরি গুগলের অ্যান্ড্রয়েড (Android) ফোন ব্যবহার করেন। অ্যাপল বা ওপেনএআই আমেরিকায় যতই লড়াই করুক না কেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতের এই উন্নত এআই প্রযুক্তির স্বাদ সবার আগে পাবে গুগলের হাত ধরেই।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে গুগলের ইকোসিস্টেম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। গুগল যদি তাদের জেমিনি-কে অ্যান্ড্রয়েডের সাথে আরও গভীরভাবে যুক্ত করে ফেলে, তবে বাংলাদেশের মতো বিশাল বাজারে তাদের আধিপত্য ভাঙা অন্য কারো পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। তবে গুগলেরও একটা বড় মাথাব্যথা আছে তাদের আয়ের মূল উৎস হলো সার্চ ইঞ্জিন থেকে আসা বিজ্ঞাপন। এমন কোনো এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট বানানো তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, যা তাদের নিজেদের সার্চ ব্যবসার আয়ই কমিয়ে দেয়।
ভবিষ্যতের পৃথিবীতে বিজয়ী হবে কে?
এই ত্রিমুখী স্নায়ুযুদ্ধে শেষ হাসি কে হাসবে, তা নির্ভর করছে ভবিষ্যতের মানুষ ঠিক কীভাবে এআই ব্যবহার করবে তার ওপর। চলুন সমীকরণটা মিলিয়ে নিই:
- অ্যাপল জিতবে: যদি আগামী দিনে সব কোম্পানির এআই মডেল প্রায় একই রকম হয়ে যায়, তবে অ্যাপল জিতবে। কারণ তাদের শক্তিশালী নিজস্ব ডিভাইস আছে এবং মানুষের বিশ্বস্ততা তাদের সাথে আছে।
- ওপেনএআই জিতবে: যদি মানুষ সব কাজের শুরুতেই চ্যাটজিপিটিকে নির্দেশ দেওয়া অভ্যাসে পরিণত করে ফেলে, তবে ওপেনএআই গেম চেঞ্জার হয়ে উঠবে। কারণ ইতোমধ্যেই প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৯০ কোটির বেশি মানুষ চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করছে।
- গুগল জিতবে: আর যদি মানুষের এমন একটা নিখুঁত ইকোসিস্টেমের প্রয়োজন হয় যেখানে ম্যাপ, মেইল, ভিডিও এবং অপারেটিং সিস্টেম সবকিছু চমৎকারভাবে একসাথে কাজ করবে, তবে গুগল বিজয়ী হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিশাল বাজারে গুগলের শেকড় অনেক গভীরে।
ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ঠিক কার দখলে যাবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটা বিষয় একেবারে নিশ্চিত, সামনের দিনগুলোতে স্মার্টফোন এবং প্রযুক্তির দুনিয়ায় আমরা এমন কিছু অভাবনীয় ম্যাজিক দেখতে যাচ্ছি, যা আজ থেকে কয়েক বছর আগেও আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল!