এআই দিয়ে তৈরি লেখা চিনবেন যেভাবে!

আচ্ছা আপনি একটু চিন্তা করুন তো ধরুন আপনি গভীর রাতে ইন্টারনেটে কিছু একটা পড়ছেন। হতে পারে সেটা কোনো স্বাস্থ্যবিষয়ক ব্লগ, কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার বিশ্লেষণ, কিংবা ট্রিকবিডিতে আপনার পছন্দের কোনো পণ্যের রিভিউ। লেখাটা এতটাই গোছানো, এতটাই নিখুঁত যে আপনার মনোযোগ আটকে গেছে। প্রতিটি বাক্য নির্ভুল, প্রতিটি শব্দ যেন মেপে মেপে বসানো। কিন্তু পড়তে পড়তে আপনার মনের গভীরে কোথাও একটা খটকা লাগলো। এমনটা মনে হচ্ছে যেন এই লেখার পেছনে কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নেই। শব্দের আড়ালে থাকা লেখকের মুখটা কি আসলেই মানুষের, নাকি কোনো শীতল অ্যালগরিদমের জটিল বুনন?

এই প্রশ্নটটিই আমাদের ডিজিটাল জীবনের এক কঠোর বাস্তবতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI এখন লেখালেখির জগতে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে। ব্লগ পোস্ট, মার্কেটিং কপি, সংবাদ প্রতিবেদন, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের টার্ম পেপার কোথায় নেই তার পদচারণা! এই প্রযুক্তি একদিকে যেমন আমাদের কাজকে সহজ করে দিচ্ছে, তেমনই তৈরি করছে এক নতুন চ্যালেঞ্জ। মানুষ আর যন্ত্রের লেখার মধ্যেকার সূক্ষ্ম রেখাটি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে।

তাহলে উপায় কী? কীভাবে আমরা এই ডিজিটাল কুয়াশার মধ্যে আসল আর নকলের পার্থক্য করব? কীভাবে বুঝব, যে লেখাটি আমাদের ভাবাচ্ছে, হাসাচ্ছে বা কাঁদাচ্ছে, তার উৎস কোনো মানুষের হৃদয় নাকি মেশিনের ডেটাবেস?

তবে একটা কথা মনে রাখবেন যন্ত্র যতই নিখুঁত হোক, তার কিছু স্বাক্ষর সে ছেড়েই যায়। এই লেখায় আমরা সেই অদৃশ্য কালি শনাক্ত করার গোয়েন্দা হয়ে উঠব। আমরা এমন কিছু কার্যকর কৌশল নিয়ে কথা বলব, যা আপনাকে একজন সচেতন পাঠক হিসেবে যন্ত্রের লেখাকে আলাদাভাবে চিনতে সাহায্য করবে। চলুন, তাহলে এমন ৭ টি বিষয় জেনে নিই যেগুলো জানলে আপনি বুঝতে পারবেন লেখা এআই দিয়ে তৈরি, নাকি মানুষের দিয়ে তৈরি।

১। অতিমাত্রায় নিখুঁত গঠন ও ভাষা।

ছোটবেলায় আমরা সবাই পরীক্ষার খাতায় সুন্দর করে লেখার চেষ্টা করতাম। চাইতাম, লেখায় যেন কোনো কাটাকাটি না থাকে, বানান ভুল না হয়, আর ব্যাকরণের নিয়ম যেন অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়। কিন্তু শত চেষ্টার পরেও কি লেখাটা একেবারে নিখুঁত হতো? কোথাও না কোথাও একটা ছোট ভুল, একটা অসাবধানী শব্দ বা একটা এলোমেলো বাক্য চলেই আসত? এটাই স্বাভাবিক। কারণ মানুষ হিসেবে আমরা নিখুঁত নই। আমাদের চিন্তার মতোই আমাদের ভাষাও কখনও সরল, কখনও বা জটিল ও অগোছালো হয়।

এবার এমন একটি লেখার কথা ভাবুন যা একেবারে নিখুঁত। এতটাই নিখুঁত যে, মনে হবে কোনো দক্ষ সম্পাদক ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে প্রতিটি শব্দকে ছাঁচে ফেলে তৈরি করেছেন। কোনো বানান ভুল নেই, কমা-দাড়ির ব্যবহার একেবারে পাঠ্যবইয়ের মতো, আর প্রতিটি বাক্য যেন স্বর্ণকারে গড়া। এমন লেখা দেখলে প্রথম দর্শনে মুগ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে: মানুষ কি এতটা নিখুঁতভাবে লিখতে পারে?

এটাই হলো এআই-জেনারেটেড লেখা চেনার প্রথম এবং সবচেয়ে বড় সূত্র।

এআই মডেলগুলো, যেমন ধরুন GPT, লক্ষ লক্ষ বই, আর্টিকেল এবং ওয়েবসাইটের ডেটা বিশ্লেষণ করে ভাষা শেখে। এই বিশাল ডেটাবেসের ওপর ভিত্তি করে তারা এমন একটি বাক্য গঠন তৈরি করে যা পরিসংখ্যানগতভাবে সবচেয়ে সঠিক। ফলে তাদের লেখায় ব্যাকরণগত ভুল প্রায় থাকেই না। তাদের বাক্যগুলো হয় অত্যন্ত যৌক্তিক, সুগঠিত এবং পরিষ্কার। প্রতিটি অনুচ্ছেদের একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা, মূল অংশ এবং উপসংহার থাকে, যা দেখতে অনেকটা রোবটের মতো নিখুঁত হাতের লেখার মতো।

উদাহরণস্বরূপ, একজন মানুষ হয়তো লিখবেন, সত্যি বলতে, ব্যাপারটা আমার কাছে একটু গোলমেলে লাগছে, ঠিক গুছিয়ে বলতে পারছি না। এখানে একটা দ্বিধা, একটা ব্যক্তিগত অনুভূতির ছাপ রয়েছে।

 

অন্যদিকে, একটি এআই সম্ভবত লিখবে, প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে, বিষয়টি কিছুটা বিভ্রান্তিকর বলে প্রতীয়মান হচ্ছে এবং এর একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করা এই মুহূর্তে কঠিন। দেখুন, দ্বিতীয় লেখাটি কতটা ফরমাল, কতটা আবেগহীন এবং কতটা নিখুঁত!

সুতরাং, পরেরবার যখন কোনো লেখা পড়তে গিয়ে তার অস্বাভাবিক নিখুঁত গঠন আর ব্যাকরণের নির্ভুলতায় চমকে যাবেন, তখন একবারের জন্য হলেও থামবেন। নিজেকে প্রশ্ন করবেন, এই নিখুঁত মুখোশের আড়ালে কি কোনো অপূর্ণতা লুকিয়ে আছে, নাকি পুরোটাই একটি যন্ত্রের শীতল দক্ষতার প্রদর্শনী? কারণ মাঝে মাঝে, অতিরিক্ত পারফেকশনই সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা।

২। আবেগ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ঘাটতি।

ভাষার নিখুঁত কাঠামোর গভীরে তাকালেই আমরা দ্বিতীয় সূত্রটি খুঁজে পাই, যা মানুষ আর যন্ত্রকে আলাদা করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। আর তা হলো আবেগ, অনুভূতি এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ছোঁয়া।

লেখালেখি কেবল তথ্যের আদান-প্রদান নয়। এটি লেখকের আত্মার একটি প্রতিচ্ছবি। মানুষের লেখায় তার হাসি-কান্না, হার-জিত, প্রথম প্রেমের স্মৃতি বা শেষ বিকেলের বিষণ্ণতার মতো হাজারো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ছাপ লেগে থাকে। একজন লেখক যখন তার ভ্রমণের গল্প বলেন, তিনি কেবল জায়গার বর্ণনা দেন না, তিনি সেই জায়গার ভেজা মাটির গন্ধ, হঠাৎ আসা বৃষ্টির অনুভূতি বা কোনো অচেনা মানুষের উষ্ণ হাসির কথাও বলেন। এই ছোট ছোট ব্যক্তিগত ছোঁয়াই একটি লেখাকে প্রাণবন্ত এবং বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

কিন্তু এআইয়ের কি কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে? সে কি কখনো বৃষ্টিতে ভিজেছে? প্রিয়জন হারানোর কষ্ট অনুভব করেছে? কিংবা কোনো ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় মুগ্ধ হয়েছে?

(উত্তরটা হলো, না।)

এআই লক্ষ লক্ষ গল্প পড়তে পারে, ভালোবাসা শব্দটি কোন কোন শব্দের সাথে ব্যবহৃত হয় তা শিখতে পারে, এমনকি কষ্ট নিয়ে একটি আস্ত কবিতাও লিখে ফেলতে পারে। কিন্তু সে জানে না, বিচ্ছেদের পর বুকের ভেতরটা ঠিক কেমন ফাঁকা লাগে। সে জানে না, সন্তানের মুখ প্রথমবার দেখে একজন বাবার চোখে জল আসার অনুভূতিটা কী। কারণ এআইয়ের কোনো শরীর নেই, কোনো স্মৃতি নেই, কোনো চেতনা নেই। সে কেবল ডেটা প্রসেস করতে পারে, অনুভব করতে পারে না।

এই ঘাটতি তার লেখায় স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এআই-জেনারেটেড লেখাগুলো প্রায়শই হয় সাধারণ এবং উপর-উপর। তারা কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলার সময় তথ্য এবং পরিসংখ্যান তুলে ধরবে, কিন্তু সেই তথ্যের পেছনের মানবিক গল্পটা বলতে পারবে না।

যেমন ধরুন, একজন মানুষ তার প্রথমবার প্যারিস ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখছেন। তিনি হয়তো লিখবেন: আইফেল টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছিল যেন স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। হিমেল বাতাসে যখন চারপাশের সব আলো জ্বলে উঠল, তখন অজান্তেই আমার চোখ ভিজে গিয়েছিল। সেই মুহূর্তটা কেবল আমার ছিল।

এর বিপরীতে একটি এআই লিখবে: প্যারিসের আইফেল টাওয়ার একটি বিখ্যাত স্থাপনা, যা ১৮৮৯ সালে নির্মিত হয়। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক এটি পরিদর্শন করতে আসেন। রাতে টাওয়ারটি আলোকসজ্জায় সজ্জিত থাকে, যা এক মনোরম দৃশ্যের সৃষ্টি করে।

পার্থক্যটা খেয়াল করেছেন? প্রথম লেখাটিতে রয়েছে লেখকের ব্যক্তিগত অনুভূতি, যা পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে। দ্বিতীয় লেখাটি একটি নিখুঁত, তথ্যসমৃদ্ধ রিপোর্ট, কিন্তু তাতে কোনো আত্মা নেই।

তবে এখানেই একটা টুইস্ট আছে। আধুনিক এআই মডেলগুলো এখন আবেগ অনুকরণ করতে শিখছে। তারা লেখায় আমি অনুভব করছি, আমার মনে হয় বা এটি সত্যিই হৃদয়বিদারক এর মতো বাক্যাংশ ব্যবহার করতে পারে। একে বলা হয় কৃত্রিম সহানুভূতি । কিন্তু এই অনুকরণ করা আবেগ প্রায়শই জেনেরিক এবং অগভীর হয়। একজন সচেতন পাঠক হিসেবে আপনাকে সেই কৃত্রিমতার পর্দা ভেদ করে দেখতে হবে। লেখাটি কি আসলেই কোনো গভীর অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত, নাকি এটি কেবল কিছু আবেগসূচক শব্দের ফাঁকা বুলি?

যদি কোনো লেখায় তথ্যের ছড়াছড়ি থাকে কিন্তু ব্যক্তিগত গল্পের উষ্ণতা না থাকে, তবে ধরে নিতে পারেন, সেই লেখার পেছনে কোনো মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন নেই।

৩। পুনরাবৃত্তি ও শব্দচয়ন।

আবেগহীনতা এবং যান্ত্রিক নিখুঁততার হাত ধরেই আসে তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি শব্দের ব্যবহার এবং পুনরাবৃত্তির ধরণ। মানুষ যখন কথা বলে বা লেখে, তখন তার শব্দভাণ্ডারে থাকে বৈচিত্র্য। আমরা একই কথা বোঝানোর জন্য নানা রকম শব্দ, বাক্যাংশ এবং উপমা ব্যবহার করি। এটা আমাদের লেখাকে সজীব ও আকর্ষণীয় করে তোলে।

কিন্তু এআই মডেলগুলো প্রায়শই একটি নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খায়। তাদের শব্দচয়ন হতে পারে সীমিত এবং পুনরাবৃত্তিমূলক।

এর পেছনের কারণটা বেশ মজার। এআই মডেলগুলো মূলত সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। একটি শব্দ লেখার পর, পরের শব্দটি কী হবে, তা সে তার বিশাল ডেটাবেস থেকে সবচেয়ে সম্ভাব্য বিকল্পটি বেছে নেয়। এই প্রক্রিয়াটি তাকে নিরাপদ এবং সাধারণ শব্দ ব্যবহারে উৎসাহিত করে। ফলে, একটি এআই-জেনারেটেড লেখায় আপনি প্রায়শই কিছু নির্দিষ্ট শব্দ বা বাক্যাংশ বারবার ফিরে আসতে দেখবেন।

ধরুন, কোনো একটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ বোঝাতে এআই This is very important, It plays a significant role, বা It is crucial এর মতো কিছু বাঁধা গতের বাক্য ব্যবহার করবে। একজন ভালো মানব লেখক হয়তো লিখবেন, এর অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য, বিষয়টি আমাদের অস্তিত্বের মূলে আঘাত করে, অথবা একে উপেক্ষা করাটা হবে এক ঐতিহাসিক ভুল। মানুষের ভাষার এই শৈল্পিক বৈচিত্র্য এআইয়ের লেখায় প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে।

শুধু শব্দের পুনরাবৃত্তিই নয়, বাক্য গঠনের ধরনেও এই একঘেয়েমি চোখে পড়ে। এআই প্রায়শই একই ধরনের বাক্য গঠন যেমন: Subject-Verb-Object ব্যবহার করে পুরো লেখাটি শেষ করে। এতে লেখাটি পড়তে একঘেয়ে ও যান্ত্রিক মনে হয়।

বিশ্বের অন্যতম সেরা এআই ডিটেকশন টুল Originality.AI এর প্রতিষ্ঠাতা জন গিলহ্যাম একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, এআই প্রায়ই একই রকম ট্রানজিশন বা সংযোগকারী শব্দ যেমন: However,’

Therefore, In conclusion ব্যবহার করে। তাদের লেখায় একটা অনুমানযোগ্য প্যাটার্ন থাকে, যা মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত লেখার থেকে আলাদা।

তবে এখানেও একটি পাল্টা টুইস্ট রয়েছে। কখনও কখনও, নিজেকে পুনরাবৃত্তিমূলক দেখানো থেকে বাঁচাতে এআই কিছু অদ্ভুত বা অপ্রচলিত প্রতিশব্দ ব্যবহার করে বসে, যা মূল প্রসঙ্গের সাথে ঠিক খাপ খায় না। যেমন, বড় বোঝাতে সে হয়তো এমন এক কঠিন শব্দ ব্যবহার করবে যা লেখাটিকে সহজ করার বদলে আরও জটিল করে তুলবে। এই ধরনের অস্বাভাবিক এবং বেমানান শব্দচয়নও একটি বড় সংকেত হতে পারে যে, লেখাটি কোনো মানুষের কলম থেকে আসেনি।

সুতরাং, যখন কোনো লেখা পড়বেন, তখন তার শব্দ এবং বাক্যের প্রবাহের দিকে মনোযোগ দিন। লেখাটি কি নদীর মতো স্বচ্ছন্দ গতিতে এগিয়ে চলেছে, নাকি একটি ভাঙা রেকর্ডের মতো একই জায়গায় আটকে যাচ্ছে? শব্দের ব্যবহারে কি নতুনত্ব এবং সৃজনশীলতা আছে, নাকি পুরোটাই কিছু পরিচিত শব্দের পুনরাবৃত্তিমূলক প্রদর্শনী? উত্তরগুলোই আপনাকে লেখকের আসল পরিচয় বলে দেবে।

৪। অসম্পূর্ণ বা ভুল তথ্য।

আমরা এতক্ষণ এআইয়ের নিখুঁত হওয়ার সমস্যা নিয়ে কথা বললাম। এবার মুদ্রার অপর পিঠ দেখা যাক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মাঝে মাঝে এমন সব ভুল তথ্য দেয়, যা কেবল অদ্ভুতই নয়, রীতিমতো বিপজ্জনকও হতে পারে। এই ঘটনাকে প্রযুক্তি জগতে বলা হয় AI Hallucination বা এআইয়ের মতিভ্রম।

ব্যাপারটা বুঝতে হলে জানতে হবে, এআই আসলে কীভাবে কাজ করে। এআই কোনো কিছু জানে না, সে কেবল প্যাটার্ন শনাক্ত করে এবং সেই অনুযায়ী পরবর্তী সম্ভাব্য শব্দটি অনুমান করে। সে এমন একজন স্বপ্নবিলাসী, যে কখনো বাস্তবে জেগে ছিল না। সে লক্ষ লক্ষ লেখা পড়েছে, কিন্তু কোনো কিছুই নিজে যাচাই করে দেখেনি। ফলে, সে যখন কোনো প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে, তখন তথ্যের সত্যতা নয়, ভাষাগতভাবে কতটা বিশ্বাসযোগ্য শোনাচ্ছে, সেদিকেই বেশি মনোযোগ দেয়।

এর ফলাফল হতে পারে খুবই হাস্যকর অথবা মারাত্মক। ধরুন, আপনি এআইকে জিজ্ঞাসা করলেন, শাকিব খান অভিনীত বাংলার বাঘ সিনেমাটি কে পরিচালনা করেছেন? এআই হয়তো আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দেবে, বাংলার বাঘ সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন বিখ্যাত পরিচালক আশফাক নিপুণ এবং এটি ২০১৯ সালে মুক্তি পেয়ে বক্স অফিসে আলোড়ন সৃষ্টি করে। বাস্তবে, বাংলার বাঘ নামে কোনো সিনেমার অস্তিত্বই হয়তো নেই, অথবা থাকলেও তার পরিচালক বা মুক্তির সাল পুরোটাই কাল্পনিক। এআই এই উত্তরটি তৈরি করেছে, কারণ তার ডেটাবেস অনুযায়ী শাকিব খান’, সিনেমা, পরিচালক এবং বক্স অফিস এই শব্দগুলো একসাথে খুব ভালোভাবে খাপ খায়।

এই ঘটনা কেবল কাল্পনিক উদাহরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৩ সালে নিউইয়র্কের একজন আইনজীবী আদালতের কাছে একটি নথি জমা দেন, যেখানে তিনি ChatGPT ব্যবহার করে কিছু কেস-ল বা পূর্ববর্তী মামলার উদাহরণ তুলে ধরেন। পরে দেখা যায়, সেই মামলাগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই! এআই সেগুলো বানিয়ে বানিয়ে লিখেছিল। এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি করে এবং প্রমাণ করে দেয় যে, এআইয়ের দেওয়া তথ্যকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

একজন মানুষ লেখার আগে তথ্য যাচাই করার চেষ্টা করেন, অন্তত নিজের জ্ঞানের সীমার মধ্যে থেকে কথা বলেন। কিন্তু এআইয়ের সেই সীমাবদ্ধতা নেই। সে যা জানে না, তা বানিয়ে বলতে দ্বিধা করে না। তাই কোনো লেখায় যদি এমন কোনো তথ্য পান যা অস্বাভাবিক, অবিশ্বাস্য বা যাচাই করে যার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না, তবে খুব সম্ভবত সেই লেখার কারিগর কোনো যন্ত্র।

৫। প্রসঙ্গবহির্ভূত জ্ঞান।

ভাবুন তো, আপনার স্কুলের দশম শ্রেণীর একজন ছাত্র ফরাসি বিপ্লব নিয়ে একটি রচনা লিখেছে। সে সেখানে শুধু মূল ঘটনাগুলোই বর্ণনা করেনি, করছে ফরাসি বিপ্লবের ওপর জার্মান দার্শনিক কান্ট ও হেগেলের চিন্তার প্রভাব নিয়েও গভীর বিশ্লেষণ করেছে। এমনকি সে অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসি অর্থনীতির কিছু অখ্যাত পরিসংখ্যানও উল্লেখ করেছে। আপনি কি মুগ্ধ হবেন, নাকি সন্দেহ করবেন?

অধিকাংশ শিক্ষকই সন্দেহ করবেন। কারণ একজন দশম শ্রেণীর ছাত্রের পক্ষে এত গভীর এবং প্রসঙ্গবহির্ভূত জ্ঞান থাকাটা প্রায় অসম্ভব। এটাই হলো এআই-জেনারেটেড লেখা চেনার আরেকটি চমৎকার সূত্র।

এআইয়ের জ্ঞান কোনো নির্দিষ্ট বয়স, প্রেক্ষাপট বা অভিজ্ঞতার গণ্ডিতে বাঁধা নয়। তার কাছে রয়েছে ইন্টারনেটের বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার। তাই সে যখন কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে লেখে, তখন মাঝে মাঝে এমন সব তথ্য দিয়ে ফেলে যা লেখকের পরিচয়ের সাথে একেবারেই বেমানান।

উদাহরণস্বরূপ, একজন ফুড ব্লগার তার লেখায় হয়তো কোনো রেসিপির পাশাপাশি সেই খাবারের রাসায়নিক গঠন বা তার আণবিক পর্যায়ে কী পরিবর্তন হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিল। অথবা একজন ভ্রমণ বিষয়ক লেখক কোনো গ্রামের বর্ণনা দিতে গিয়ে সেই গ্রামের ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং মাটির নিচে থাকা খনিজ উপাদান নিয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখা লিখে ফেলল। এই অতিরিক্ত জানা ভাবটাই সন্দেহের উদ্রেক করে।

মানুষের জ্ঞান তার অভিজ্ঞতা, পড়াশোনা এবং পরিবেশের দ্বারা সীমাবদ্ধ। আমরা যা জানি, তার একটা প্রেক্ষাপট থাকে। কিন্তু এআই হলো সেই ছাত্রের মতো, যে ক্লাসে না গিয়েই পুরো লাইব্রেরি মুখস্থ করে ফেলেছে। সে সব জানে, কিন্তু কোন জ্ঞানটা কোন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করতে হবে, সেই কাণ্ডজ্ঞান তার নেই।

তাই কোনো লেখা পড়ার সময় লেখকের পরিচয়ের দিকেও খেয়াল রাখুন। লেখাটির জ্ঞান এবং গভীরতা কি লেখকের সম্ভাব্য বয়সের, পেশার বা অভিজ্ঞতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? যদি উত্তর না হয়, তবে হতে পারে সেই জ্ঞানী লেখকের মুখোশের আড়ালে বসে আছে একটি সর্বজ্ঞানী, কিন্তু কাণ্ডজ্ঞানহীন অ্যালগরিদম।

৬। অনলাইন টুলের সহায়তা।

এতক্ষণ আমরা খালি চোখে, অর্থাৎ নিজেদের বুদ্ধি এবং পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা দিয়ে এআইয়ের লেখা শনাক্ত করার কৌশল নিয়ে কথা বললাম। এগুলো অনেকটাই শিল্প বা অনুভবের বিষয়। কিন্তু প্রযুক্তি যেমন সমস্যা তৈরি করেছে, তেমনই তার সমাধানের জন্যও কিছু হাতিয়ার আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে। এই হাতিয়ারগুলো হলো এআই ডিটেকশন টুলস।

এই টুলগুলোকে আপনি ডিজিটাল গোয়েন্দা বা লেখার জন্য এক ধরনের লাই ডিটেক্টর বলতে পারেন। তারা একটি লেখাকে বিশ্লেষণ করে গাণিতিক এবং ভাষাগত প্যাটার্নের ওপর ভিত্তি করে বলে দিতে পারে, সেটি মানুষের লেখা নাকি এআইয়ের তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

কিছু জনপ্রিয় টুল হলো:

GPTZero: প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র, এডওয়ার্ড টিয়ান, এই টুলটি তৈরি করেন। এটি লেখার পারপ্লেক্সিটি এবং বার্স্টিনেস পরিমাপ করে। মানুষের লেখায় বাক্যের দৈর্ঘ্য এবং গঠনে অনেক বৈচিত্র্য থাকে , যা এআইয়ের লেখায় কম থাকে।

Turnitin: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কুম্ভীলকবৃত্তি ধরার জন্য এই টুলটি বহুল ব্যবহৃত। সম্প্রতি তারা তাদের সফটওয়্যারে এআই ডিটেকশন ফিচার যুক্ত করেছে, যা শিক্ষকদের জন্য খুবই সহায়ক।

Originality.AI: কনটেন্ট মার্কেটার এবং পাবলিশারদের জন্য তৈরি এই টুলটি দাবি করে যে, এটি সবচেয়ে নির্ভুলভাবে এআই লেখা শনাক্ত করতে পারে।

তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ টুইস্ট রয়েছে। এই প্রযুক্তিগত যুদ্ধটা অনেকটা চোর-পুলিশের খেলার মতো। একদিকে যেমন ডিটেকশন টুলগুলো আরও উন্নত হচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে জিপিটি-৪ বা তার পরবর্তী প্রজন্মের এআই মডেলগুলো এমনভাবে লেখা তৈরি করতে শিখছে, যা এই টুলগুলোকে সহজেই ফাঁকি দিতে পারে। তারা এখন ইচ্ছে করেই লেখায় কিছু অসামঞ্জস্য, ছোটখাটো ভুল বা মানুষের মতো ভাষার ধরণ অনুকরণ করছে।

তাই মনে রাখবেন, এই টুলগুলো শতভাগ নির্ভুল নয়। এগুলোকে একটি সহায়ক নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করা উচিত, চূড়ান্ত রায় হিসেবে নয়। একটি লেখা যদি টুলের স্ক্যানারে মানুষের লেখা হিসেবেও দেখায়, কিন্তু আপনার মানবিক পর্যবেক্ষণ যদি ভিন্ন কথা বলে, তবে আপনার অনুভূতিকেই বেশি গুরুত্ব দিন। কারণ যন্ত্রকে ফাঁকি দেওয়া গেলেও, একজন সচেতন মানুষের চোখকে ফাঁকি দেওয়া এখনও কঠিন।

৭। লেখার সময় ও উৎপাদনক্ষমতা:

শেষ সূত্রটি লেখার ভেতরে নয়, লেখকের কার্যকলাপের মধ্যে লুকিয়ে আছে। এটি একটি পারিপার্শ্বিক সূত্র, যা আপনাকে একজন লেখকের সামগ্রিক কার্যক্রম দেখে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

ভাবুন, একজন ব্লগার বা লেখক রাতারাতি আবির্ভূত হলেন এবং প্রতিদিন তিনটি করে ৫০০০ শব্দের, নিখুঁতভাবে গবেষণা করা, গভীর বিশ্লেষণমূলক আর্টিকেল প্রকাশ করতে শুরু করলেন। প্রতিটি লেখাই এসইও-অপটিমাইজড, ব্যাকরণগতভাবে নির্ভুল এবং তথ্যবহুল। এটা কি মানবিক দিক থেকে সম্ভব?

একজন মানুষের পক্ষে একটি উচ্চমানের, গবেষণালব্ধ আর্টিকেল লিখতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন সময় লেগে যায়। তাকে বিষয় নিয়ে ভাবতে হয়, গবেষণা করতে হয়, খসড়া তৈরি করতে হয়, সম্পাদনা করতে হয় এবং সবশেষে প্রকাশ করতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ এবং শ্রমসাধ্য।

কিন্তু একটি এআই মডেলের জন্য কয়েক হাজার শব্দের একটি আর্টিকেল তৈরি করতে কয়েক মিনিটের বেশি সময় লাগে না।

তাই যখন আপনি দেখবেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে এবং বিপুল পরিমাণে কনটেন্ট তৈরি করছে, তখন সন্দেহ হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে যদি সেই লেখাগুলোর মানও হয় অসাধারণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মানুষের কাজে একটা উত্থান-পতন থাকে। কোনোদিন লেখা ভালো হয়, কোনোদিন হয়তো ততটা ভালো হয় না। কিন্তু মেশিনের পারফরম্যান্স প্রায় সবসময়ই একরকম থাকে।

এই বিষয়টি বিশেষভাবে প্রযোজ্য ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস, কনটেন্ট এজেন্সি এবং ব্লগিংয়ের ক্ষেত্রে, যেখানে গতির একটি বড় মূল্য রয়েছে। কম সময়ে অনেক বেশি কাজ ডেলিভারি দেওয়ার চাপ অনেককে এআই ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। তাই কোনো লেখকের উৎপাদনক্ষমতা যদি আপনার কাছে অতিমানবিক মনে হয়, তবে তার পেছনে কোনো অমানবিক শক্তিই কাজ করছে।

সর্বশেষ কথা যা বলতে চাই:

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই অগ্রযাত্রা অপ্রতিরোধ্য। এটি আমাদের জীবনকে বদলে দিচ্ছে এবং নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতেও দেবে। লেখালেখির জগতে এআই একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে, যা আমাদের গবেষণায় সাহায্য করতে পারে, আমাদের চিন্তাকে গুছিয়ে দিতে পারে এবং আমাদের সময় বাঁচাতে পারে।

কিন্তু সমস্যাটা তৈরি হয় তখন, যখন যন্ত্রের লেখাকে মানুষের লেখা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। যখন স্বচ্ছতার অভাব থাকে, যখন আমরা বুঝতে পারি না কার সাথে কথা বলছি একজন অনুভূতিপ্রবণ মানুষের সাথে, নাকি একটি অনুভূতিহীন প্রোগ্রামের সাথে।

এই আর্টিকেলে আমরা যে সাতটি বিষয়ের কথা বললাম, ভাষার অতি নিখুঁত গঠন, আবেগের অনুপস্থিতি, পুনরাবৃত্তিমূলক শব্দচয়ন, ভুল তথ্য, প্রসঙ্গবহির্ভূত জ্ঞান, অনলাইন টুল এবং অস্বাভাবিক উৎপাদনক্ষমতা এগুলো কোনোটিই হয়তো এককভাবে চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। কিন্তু যখন বেশ কয়েকটি সূত্র একসাথে একই দিকে ইঙ্গিত করে, তখন আপনি প্রায় নিশ্চিত হতে পারেন যে, লেখাটির পেছনে কোনো মানুষের হাত নেই।

দিনশেষে, আমাদের লক্ষ্য এআইকে ভয় পাওয়া বা বর্জন করা নয়, বরং একজন সচেতন এবং বিচক্ষণ পাঠক হয়ে ওঠা। আমাদের জানতে হবে, যন্ত্রের তৈরি নিখুঁত কিন্তু প্রাণহীন তথ্যের ভিড়ে কীভাবে মানুষের কলমের সেই অসমাপ্ত, এলোমেলো কিন্তু জীবন্ত আঁচড়টিকে খুঁজে বের করতে হয়।

কারণ একটি যন্ত্র হয়তো একটি নিখুঁত বাক্য লিখতে পারে, কিন্তু কেবল একজন মানুষই পারে সেই বাক্যের গভীরে তার হৃদয়ের একটি টুকরো রেখে যেতে। আর সেই হৃদয়ের ছোঁয়াই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী স্বাক্ষর।