বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যেন এটি সব রোগের একমাত্র সমাধান এটিই। সর্দি, জ্বর, এমনকি হালকা গলা ব্যথা হলেও অনেকেই নিজের মতো করে অ্যান্টিবায়োটিক খেতে শুরু করেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় ভুল হয় যখন রোগের উপসর্গ একটু কমলেই কেউ কেউ কোর্স শেষ না করেই ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন।
এই অভ্যাস শুধু নিজের শরীরের জন্য নয়, বরং পুরো সমাজের জন্যই ভয়াবহ বিপদ তৈরি করে। যা অনেকেই জানেন, অনেকেই জানেননা।
অ্যান্টিবায়োটিক কীভাবে কাজ করে
অ্যান্টিবায়োটিক হলো এমন ওষুধ যা শরীরের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে বা বৃদ্ধি রোধ করে। কিন্তু ভাইরাসজনিত রোগ (যেমন সর্দি, ফ্লু বা ডেঙ্গু) এর ক্ষেত্রে এগুলো কোনো কাজই করে না।
চিকিৎসকরা নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট ডোজে অ্যান্টিবায়োটিক দেন যাতে ব্যাকটেরিয়াকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা যায়। এই কোর্স মাঝপথে বন্ধ করলে শরীরে কিছু ব্যাকটেরিয়া বেঁচে যায়, যেগুলো ধীরে ধীরে ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
সর্দি সাধারণত ভাইরাসজনিত রোগ, তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের দরকার হয় না। উপসর্গ অনুযায়ী কিছু সাধারণ ওষুধ ব্যবহার করা যায়। যেমন, নাক বন্ধ বা নাক দিয়ে পানি পড়লে Pseudoephedrine, Phenylephrine বা Otrivin (Oxymetazoline) ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে অনেকেই না বুঝে এন্টিবায়োটিক নিয়ে নেন, এবং কমে গেলেই তা খাওয়া বন্ধ করে দেন৷
তাহলে আসুন নিচে থেকে জেনে নিই, এর অসম্পূর্ণ কোর্স আপনার কি ক্ষতি হতে পারে।
কোর্স অসম্পূর্ণ রাখলে কী ঘটে
১. রোগ সম্পূর্ণ সারে না
উপসর্গ কিছুটা কমলেও ভেতরে সংক্রমণ থেকে যায়, ফলে কিছুদিন পর একই রোগ আবার ফিরে আসে।
২. ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয় (Antibiotic Resistance)
যে ব্যাকটেরিয়াগুলো অ্যান্টিবায়োটিকের মাঝারি ডোজেও বেঁচে যায়, তারা পরবর্তীতে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তখন আগের ওষুধ কাজ করে না। এটা একটা ভয়ঙ্কর ব্যপার।
৩. রোগ জটিল হয়ে পড়ে
একই সংক্রমণ পরবর্তীতে নিউমোনিয়া, কিডনি ইনফেকশন বা সেপসিসের মতো জটিল অবস্থায় পৌঁছাতে পারে।
৪. নতুন ওষুধের প্রয়োজন হয়
পুরোনো ওষুধ কাজ না করায় নতুন, শক্তিশালী এবং ব্যয়বহুল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হয়।
৫. সামাজিক ঝুঁকি বাড়ে
একজনের শরীরে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া থাকলে তা অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে — ফলে এটি জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়।
কেন অনেকেই কোর্স শেষ করেন না
- উপসর্গ দ্রুত কমে যায়
- ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে ভয়
- আর্থিক অসুবিধা
- সচেতনতার অভাব
এই অভ্যাস পরিবর্তন করা না গেলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণও মারাত্মক রূপ নিতে পারে।
সঠিকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের নিয়ম
আসুন এবার তাহলে জেনে নিই, কিভাবে এন্টিবায়োটিক সঠিকভাবে নিবেন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক কখনোই শুরু করবেন না।
- নির্ধারিত সময় পর্যন্ত নিয়মিত সেবন করুন।
- ডোজ বাদ পড়লে একসাথে দ্বিগুণ ডোজ খাবেন না।
- কোর্স শেষ হওয়ার পরও যদি সমস্যা থাকে, চিকিৎসককে জানিয়ে পুনর্মূল্যায়ন করুন।
- বাচ্চা বা বয়স্কদের ক্ষেত্রে ডোজ কখনো অনুমান করে দেবেন না।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বর্তমান অবস্থা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ (Antimicrobial Resistance) এখন বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকটের পর্যায়ে। প্রতি বছর প্রায় ৭ লক্ষ মানুষ এ কারণে মারা যায়, আর ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশেও অনেক ব্যাকটেরিয়া এখন সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। ফলে ছোট সংক্রমণও চিকিৎসকদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
শেষ কথা: অ্যান্টিবায়োটিক জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, কিন্তু এটি ভুলভাবে ব্যবহার করলে বিপরীত ফল হতে পারে। রোগ পুরোপুরি সারানোর জন্য কোর্স সম্পূর্ণ করা, চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলা, এবং অপ্রয়োজনে ওষুধ না খাওয়াই সবচেয়ে বড় সচেতনতা।
7 টি মন্তব্য