সাফল্য বা সফলতা মূলত কোন আকস্মিক ব্যাপার নয় । সাফল্য ক্রমান্বয়ে অর্জিত মানুষের মৌলিক কিছু গুনাবলীর সমষ্টি । সাফল্যের সংজ্ঞা এক একজনের কাছে এক এক রকম । একজন কৃষকের ছেলের কাছে সাফল্য হতে পারে পড়াশুনা শেষ করে জীবন পরিচালনা করার জন্য নূনতম একটি চাকুরী পাওয়া । কিন্তু অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধশালী একটি পরিবারের সন্তানের কাছে সাফল্য হলো পড়াশুনা শেষ করে  ব্যাবসা করে গাড়ী, বাড়ী ,অঢেল টাকা আয় করা ।

সুতারাং একজনের কাছে যা সাফল্য অন্য জনের কাছে তা ব্যর্থতা । সাফল্যের সার্বজনীন রুপরেখা নির্ণয় করা খুবই কষ্টকর । তবুও সাফল্যের সংজ্ঞা এভাবে দেয়া যেতে পারে …..

“আপনি জীবনে যা চান তা পাওয়াই সাফল্য যদি এ পাওয়ার মাঝেই আপনার সুখ ‍নিহিত থাকে । ”

জীবনে যে সকল ব্যাক্তিবর্গ সফলতা পেয়েছেন তাদের ইতিহাস পাঠ করলে দেখা যায় যে অনেক শ্রম, সাধনা, আর অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে তারা সাফল্যের শিখরে আরোহন করতে পেরেছে । যে সকল বিষয়বস্তু মানুষকে সফল হতে সাহায্য করে তা নিম্নরুপ :

১ । লক্ষমাত্রাঃ

আপনি যে কাজই করুন না কেন তার প্রত্যেকটি কাজের লক্ষমাত্রা নির্ধারন না করলে আপনি কাংক্ষীত অবস্থানে পৌছুতে পারবেন না । তাই কাজে সফলতা পাবার জন্য আপনাকে অবশ্যই আপনার প্রথমে  কাজের লক্ষমাত্রা নির্ধারন করে নিতে হবে । আর আপনাকে সেই লক্ষমাত্রায় পৌছানোর ইচ্ছাটাও প্রবল রাখতে হবে তবেই আপনি সফলতার দুয়ারে পৌছুতে পারবেন ।

২ । আকাঙ্খাঃ

কোন কিছু লাভের জন্য আপনার ঐকান্তিক আকাঙ্খা থাকতে হবে । আপনি যা পেতে চান তা যদি যুক্তিসঙ্গত হয় এবং পাওয়ার জন্য যথার্থ চেষ্টা করেন তাহলে তা পাওয়া আপনার পক্ষে সম্ভব । তবে চাওয়ার আগ্রহ থাকতে হবে প্রবল ।

৩ । কঠোর পরিশ্রমঃ

 

দৈবক্রমে সাফল্য পাওয়া যায় না । সাফল্য লাভের জন্য দরকার নিরলস প্রচেষ্টা ও কঠোর পরিশ্রম । আমরা অনেকেই আছি জীবনে সফলতা চাই কিন্তু পরিশ্রম করতে রাজী নই । তাই আমরা সফলতার মুখও দেখতে পাই না । কঠোর এবং অতিরিক্ত শ্রম দেওয়ার মানসিকতা থাকলে সাফল্যের ছোঁয়া আপনি স্পর্শ করতে পারবেন ।  অনেক মহৎ প্রতিভা ও কঠোর পরিশ্রর না করার কারনে তা নষ্ট হয়ে যায় । তাই আপনাকে সফলতা পেতে হলে অবশ্যেই কঠোর পরিশ্রম এবং পরিকল্পনা মাফিক কাজ করতে হবে ।

৪ । অঙ্গীকারঃ

সাফল্য ও সমৃদ্ধির জন্য যে কোন কাজের জন্য দরকার অঙ্গীকার । কোন জায়গায় পৌছতে হলে লক্ষহীন ভাবে চললে হবে না কিংবা নোঙ্গরে বাধা থাকলে চলবে না । এর জন্য চাই পরিকল্পনা মাফিক জীনব । খেলোয়াড়েরা যখন মাঠে খেলতে নামে তখন তারা অঙ্গিকার করে জেতার জন্য । তবুও একদল হেরে যায় । এই হেরে যাবার কারন তাদের ক্ষমতা কিংবা দক্ষতার অভাব নয় বরং তাদের অঙ্গীকার বা আবেগের ব্যাপারটি । অঙ্গীকার বা আবেগের ব্যাপারটি খেলোয়াড়দের মনে যতই প্রবল থাকে ততই তারা সফলতার দ্বারপ্রান্তে থাকে । তাই প্রত্যেকটি কাজে থাকতে হবে সঠিক পরিকল্পনা এবং অঙ্গীকারবদ্ধতা ।

৫ । দায়িত্ববোধঃ

জীবনে সফলতা পাবার জন্য দায়িত্বশীল হতে হবে । আপনি দায়িত্ব না নিয়ে প্রচুর বিত্ত বৈভরে মালিক হবেন, নাম-যশ পাবেন এবং সুন্দর জীবন যাপন করবেন তা সম্ভব নয় । সফলতা পাবার জন্য আপনাকে ঝুঁকি নিতে হবে । তবে ঝুকি বা দ্বায়িত্ব নেবার অর্থ এই নয় যে সকল কাজ আপনি একা করবেন কিংবা অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নিবেন । আপনি দায়িত্ব নিবেন সুবিবেচনা করে এবং আপনার কাজের যাবতীয় সফলতার দিক খুটিনাটি পরিক্ষা করে ।

৬ । চরিত্রঃ

জীবনে যারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তাদের প্রতিষ্ঠার পেছনে মূলত তাদের উত্তম চরিত্র কাজ করেছে । যারা চরিত্রবান তারা সবাই পৃথিবীতে স্মরনীয় হয়ে আছেন । উত্তম চরিত্র মুল্যবান রত্নের চেয়েও দামী । এক চরিত্রের গুনাবলি জন্য আপনার জীবনে অনেক কিছুই অর্জন করা সম্ভব । আপনার চরিত্র যদি সুন্দর ও মধুময় হয় তাহলে পৃথিবীর সকল লোক আপনাকে সম্মান জানাতে বাধ্য থাকবে । তাই সফলতা এবং চরিত্র একে অপরের পরিপূরক ।

৭ । আত্ববিশ্বাসঃ

কাজে সাফল্য লাভের জন্য আপনাকে অবশ্যই দৃঢ় বিশ্বাসের অধিকারি হতে হবে । আপনার মনের মাঝে যদি বিশ্বাস থাকে যে আপনি আপনার কজে সফলতা পাবেন তাহলে সেটাই হবে আপনার জীবন পাল্টে যাবার মূল চাবিকাঠি । আত্মবিশ্বাস ব্যতীত কোন কাজেই সফলতা অর্জন করা সম্ভন নয় । তাই হতাশাকে আত্মবিশ্বসে রুপান্তরিত করুন । ইনশাআল্লাহ আপনি অবশ্যই সফল হবেন ।

৮ । অধ্যবসায়ঃ

আপনি জীবনে কি হবেন তা শুধু আপনার বুদ্ধির উপর নির্ভর করে না । নির্ভর করে আপনি কাজটির ব্যাপারে কতটুকু অধ্যবসায়ী তার উপর । প্রতিভা বা শিক্ষা থাকলেই সফল হওয়া যায় না । পৃথিবীতে শিক্ষিত অসফল লোকের অভাব নেই । প্রত্যেক সফল ব্যক্তি তার লক্ষ্যকে স্থির রেখে সামনে অগ্রসর হয়েছেন । জীবন যুদ্ধ নামক ভূমি থেকে তারা পলায়ন করেন নি । জীবন নিয়ে যার যার ক্ষেত্রে সংগ্রাম চালিয়ে সম্মূখ পানে অগ্রসর হয়েছেন এবং ইতিহাস বিজয়ী বীর হিসাবে পরিচিতি পেয়েছেন ।

৯ । শেখার আগ্রহঃ

সাফল্য লাভের অন্যতম প্রধান শর্ত হল নিয়মিত শিক্ষা লাভ বা জ্ঞান অর্জনে নিজেকে ব্যাপৃত রাখা । অনেক জেনে ফেলেছি আর দরকার নেই এই মনোভাব কখনও পোষন করা যাবে না । অন্যের কাছ থেকে শেখার প্রবল আগ্রহ থাকতে হবে । যতদিন বাঁচি ততদিন শিখব এটাই আপনার আদর্শ হওয়া উচিত । মনে রাখবেন শেখার সময় কাল হলো “ দোলনা থেকে নিয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত:”।  নিজেকে সব সময় একজন শিক্ষার্থী হিসেবে কল্পনা করতে হবে । যারা সারা জীবন শিখেছে বা শিখতে চেষ্টা করেছে তারাই সকল ক্ষেত্রে সফলতা পেয়েছে ।

১০ । ইতিবাচক মনোভাবঃ

সফলতার জন্য আপনার দরকার সঠিক দৃষ্টিভঙ্গী এবং ইতিবাচক মনোভাব । সমাজে যে যাই বলুক, হাসাহাসি করুক তাতে কিছু যায় আসে না । আপনি চান আপনার  সুখ, সমৃদ্ধি আর সফলতা । এগুলো পাওয়া যায় সঠিক পথ অনুসরন করে । নিজের লক্ষ্যমাত্রাকে ঠিক রেখে । জীবনে আপনি কি চান , কতদিনে চান এ সবের একটি ছক তৈরী করে পরিকল্পনা মাফিক অগ্রসর হোন । এভাবে যখন আপনার দৃষ্টিভঙ্গী একটি নিদৃষ্ট লক্ষ্যের দিকে ক্রমাগত একনিষ্ট ভাবে অগ্রসর হবেন তখনই সফলতা এসে ধরা দিবে আপনার কছে ।

পরিশেষে অতি স্বল্প পরিসরে সফলতার কিছু টিপস্ শেয়ার করলাম আপনাদের সাথে । সফলতা পেতে হলে বিভিন্ন সফল ব্যক্তিদের জিবনী পড়া উচিত । বিশেষ করে আলীবাবা ডট কম এর প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা এর কথা বলবো । তিনি জিবনে বারবার ব্যার্থ হয়েও তার নিদৃষ্ট লক্ষ্যের কারনে কিভাবে আজ তিনি সফল এবং পৃথিবীর অন্যতম প্রতিষ্ঠিত ব্যাক্তিদের একজন । আর জিবনে সফল হতে হলে নিদৃষ্ট পরিকল্পনা, প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর সাহসিকতার সাথে সামনে এগিয়ে যেতে হবে । তবেই আপনি সফল হবেন এবং মানুষের কাছে অনুসরনীয় হয়ে থাকবেন ।

Leave a Reply