[লেখাটি ২০২০ সালের আগস্টে প্রথম নিয়নবাতিতে প্রকাশিত এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী কিছুটা সম্পাদনা হয়েছে। বর্তমানে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ বিষয়ক বিতর্কে এটি প্রাসঙ্গিক মনে হওয়াতে ট্রিকবিডিতে প্রকাশ করা।]

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়াবারকাতুহু। অজ্ঞতাবশত অনেকের মধ্যে ধারণা প্রচলিত আছে, বিজ্ঞান ও ধর্ম বিপরীতধর্মী কথা বলবে, দুটো একসাথে চলতে পারে না। এ থেকে কেউ কেউ বিজ্ঞান ও ধর্মকে প্রতিপক্ষরূপে উপস্থাপন করে। অর্থাৎ, বিজ্ঞান ও ধর্মের একটা বেছে নিতে হবে।

ইসলাম নিয়েও কারো ধারণা এমনটাই। কিছুটা ইসলাম চর্চা করেন, এমন অনেকের মধ্যেও ধারণা দেখা যায়, বিজ্ঞান বিজ্ঞানের স্থানে, ইসলাম ইসলামের স্থানে। বিজ্ঞান ও ইসলামকে মিক্স আপ করা যাবে না। দুটো আলাদাভাবে থাকবে। ব্যক্তিজীবনে একজন সালাত, সাওম এরকম ইবাদত পালন করতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানের কোন কথা ইসলামের মাধ্যমে যাচাই করা যাবে না।

অনেক বিষয়ে বাস্তবিক ভাবেই ইসলাম ও বিজ্ঞান কিছুটা ভিন্ন কথা বলে। তাহলে, এখানে আমাদের মনোভাব কেমন হওয়া উচিৎ?

ইসলাম: একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন

ধর্ম বলতে আমরা অনেকে একজন ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া, তার উপাসনা ও আনুসঙ্গিক কিছু আনুষ্ঠানিকতা অনেকটা এরকম বুঝে থাকি। কোন কোন ধর্মের ক্ষেত্রে এই সংজ্ঞা প্রযোজ্য হতে পারে, কিন্তু ইসলাম এর চেয়ে বেশি কিছু।

ইসলাম ব্যাপারটার সাথে সবচেয়ে বড় অবিচার হলো একে ‘ধর্ম’ বলা

– শামসুল আরেফিন শক্তি

ইসলাম অর্থ আত্মসমর্পন। একজন মুসলিম একমাত্র আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পন করে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশনা মেনে চলে। ইসলাম হলো আল্লাহ তায়ালার মনোনীত দ্বীন। এখানে আছে একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা।

আজান হলে আমি মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে আসবো, আবার নামাজ শেষে মদ-গাঁজা নিয়ে পড়ে থাকবো, ইসলাম এরকম কোন ধর্ম নয়। বরং এখানে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের দিকনির্দেশনা রয়েছে।তাই জীবনের কোন কাজই ইসলামের বাহিরে নয়। হোক সেটা সালাতে দাঁড়ানো কিংবা জ্ঞানচর্চা। আমাদের প্রতিটি কাজ হতে হবে আল্লাহর জন্য।

আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।

সূরা আল মায়িদাহ – আয়াত ৩

বিজ্ঞান কী?

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান অর্থ বিশেষ জ্ঞান, আর ইংরেজি ভাষায় Science শব্দটি ল্যাটিন শব্দ scientia থেকে, যার অর্থ জ্ঞান। তবে সব ধরণের জ্ঞানকে বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। কোন জ্ঞানকে বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত বিবেচনা করা হবে, তা নিয়ে কিছু জায়গায় ভিন্নমত রয়েছে, যেটা স্বাভাবিক।

প্রচলিতভাবে, গবেষণা ও পরীক্ষণের ভিত্তিতে কোন বিষয় সম্পর্কে অর্জিত প্রমাণিত জ্ঞান ও যুক্তিযুক্ত পূর্বাভাসকে আমরা বিজ্ঞান হিসেবে ধরে থাকি। আমরা যদি উইকিপিডিয়ার সংজ্ঞা দেখি, সেখানে বলা হয়েছে, ” Science is a systematic enterprise that builds and organizes knowledge in the form of testable explanations and predictions about the universe ।”

এই সংজ্ঞা যদি আমরা গ্রহণ করি, তাহলে বিজ্ঞানকে কেবল নিশ্চিত প্রমাণিত বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বিভিন্ন হাইপোথিসিস, প্রেডিকশন বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত হবে।

এখন ব্লাক হোলের অস্তিত্ব প্রমাণিত। আমরা কিছুদিন আগে ব্লাক হোলের ছবি পেয়েছি। তবে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব থেকে প্রথম যখন ব্লাক হোলের ধারণা করা হয়েছিলো, তখন কিন্তু এটা প্রমাণিত ছিলো না।

মানুষের সীমাবদ্ধতা ও পরিবর্তনশীল বিজ্ঞান

বিজ্ঞান যেহেতু কিছু শর্তসাপেক্ষে মানুষের অর্জিত জ্ঞানেরই সংগ্রহশালা, তাই মানুষের সীমাবদ্ধতাগুলো বিজ্ঞানের জন্যও প্রযোজ্য। মহাবিশ্বে যে কতশত রহস্য লুকিয়ে আছে, তার খুব অল্পই আমরা জানি।

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

‍আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সুপ্রতিষ্ঠিত ধারক। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। তাঁর জন্যই আসমানসমূহে যা রয়েছে তা এবং যমীনে যা আছে তা। কে সে, যে তাঁর নিকট সুপারিশ করবে তাঁর অনুমতি ছাড়া? তিনি জানেন যা আছে তাদের সামনে এবং যা আছে তাদের পেছনে। আর তারা তাঁর জ্ঞানের সামান্য পরিমাণও আয়ত্ব করতে পারে না, তবে তিনি যা চান তা ছাড়া। তাঁর কুরসী আসমানসমূহ ও যমীন পরিব্যাপ্ত করে আছে এবং এ দু’টোর সংরক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। আর তিনি সুউচ্চ, মহান।

সূরা আল বাকারা – আয়াত ২৫৫ (আয়াতুল কুরসী)

এই আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন স্পষ্ট ঘোষণা করে দিয়েছেন, আল্লাহ তায়ালা সকল বিষয়ে জানেন। অন্যদিকে, মানুষ শুধুমাত্র সে জ্ঞানটুকুই অর্জন করতে পারেন, যতটুকু তিনি চান।

মানুষের জ্ঞানের এই সীমাবদ্ধতা বিজ্ঞানও স্বীকার করে। কোয়ান্টাম মেকানিক্স থেকে আমরা জানতে পেরেছি, প্রকৃতির সব রহস্য আমরা কখনোই জানতে পারবো না। একটা পর্যায়ে গিয়ে বিজ্ঞানীরা আর বলতে পারবেন না যে, এটা এরকম, বরং সর্বোচ্চ এমনটা বলতে পারবেন, এটা এরকম হতে পারে।

সময়ের সাথে আমরা নতুন নতুন তথ্য জানছি। আমাদের জ্ঞানের পরিধি একটু একটু করে বাড়ার সাথে সাথে বিজ্ঞানও আধুনিক হচ্ছে। বিজ্ঞানের পুরনো ধারণাগুলো ভুল প্রমাণিত হয়ে নতুন ধারণা সে স্থান নিচ্ছে। আবার একদিন হয়ত সেটাও বদলে যাচ্ছে।

টলেমি জন্ম নিয়েছিলেন ১০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে। তিনি বলেছিলেন, পৃথিবী আছে জগতের কেন্দ্রে, আর গ্রহ-নক্ষত্র যা কিছু আছে সবকিছু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। তখন মানুষেরাও এটাই বিশ্বাস করেছে।

কিন্তু তারপর কেউ কেউ দেখলেন আকাশের কিছু তারার গতিপথের দিকে তাকিয়ে কথাটা ঠিক মেলানো যাচ্ছে না। ষোড়শ শতকের দিকে নিকোলাস কোপারনিকাস বললেন, সূর্য কেন্দ্রে, পৃথিবীসহ গ্রহগুলো সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। প্রায় দেড় হাজার বছর যেটা ছিলো বিজ্ঞান, সেটা বদলে গেলো। আচ্ছা, এখন যদি কেউ পৃথিবীকেন্দ্রিক মডেলে বিশ্বাসী হয়, তাকে কি বিজ্ঞানমনস্ক বলা যাবে?

বিজ্ঞানী নিউটন বললেন, আলো এক ধরণের কণা। বিজ্ঞানী হাইগেন বললেন, না, আলো এক ধরণের তরঙ্গ, যেটা ইথার মাধ্যমে বিচরণ করে। বিজ্ঞানী মাইকেলসন ও মোরলে পরীক্ষা করে জানিয়ে দিলেন ইথার বলে কিছু নাই। বিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েল বললেন, আলো আসলে তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ। মাধ্যম ছাড়া চলে। বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাঙ্ক বললেন, আলো আসলে গুচ্ছ গুচ্ছ কনা আকারে নির্গত হয়। এটাই সাইন্স, এটা ধ্রুব কিছু নয়। মানুষের নতুন কিছু জানার সাথে যেটা বদলে যেতে থাকে।

বিশ্বজগতের যে অংশটুকু থেকে পৃথিবীতে আলো পৌঁছেছে, তা হলো পৃথিবীর চারিদিক থেকে প্রায় চার হাজার ছয়শ পঞ্চাশ কোটি আলোকবর্ষ। এই এরিয়াটুকুকে বলা হয় দৃশ্যমান মহাবিশ্ব। যত শক্তিশালী টেলিস্কোপই হোক না কেন, মানুষ এর বাইরে দেখার ক্ষমতা রাখে না।

কসমিক ইনফ্ল্যাশন তত্ত্ব বলছে, সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বের 1.5*10^23 গুণ আর হতে পারে তা অসীম। এর বাহিরে মাল্টিভার্স বা প্যারালাল ইউনিভার্স, এসবের কথা না-ই বা বলি। সম্পূর্ণ মহাবিশ্বও না ধরি, শুধু দৃশ্যমান মহাবিশ্বের কতটুকু মানুষ জানে? বলা হয়, পৃথিবীর সমুদ্র তলদেশের মাত্র ৫% মানুষ উম্মোচন করতে পেরেছে। এই পৃথিবীরই কত রহস্য জানা বাকি রয়ে গেছে!

পক্ষপাতী বিজ্ঞান

বিজ্ঞানীরাও কিন্তু মানুষ। তারা মানবীয় দোষত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। বিজ্ঞানের অন্ধকার দিকও রয়েছে। কখনো বিজ্ঞানীরা নিজেরাই পক্ষপাতী হয়েছেন, অথবা কখনো সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় চাপ তাদেরকে পক্ষপাতী করেছে। কখনো ফলাফল নির্ধারিত হয়ে গেছে গবেষণার আগেই, আর কখনো সত্যকে গোপন করা হয়েছে। কখনো পূর্বের বদ্ধমূল ধারণাকে ঠিক রাখতে গবেষণা এদিক-ওদিক করে ফেলা হয়েছে।

ইদানীং আমরা যে IQ টেস্ট করি সেই পদ্ধতিটি ১৯৫০-এর দশকে Dr. D Wechsler-এর বানানো। শুরুতে তিনি পেলেন, ৩০-এরও বেশি টেস্ট নারী-পুরুষের মাঝে ‘একজনের’ পক্ষে ‘বৈষম্য’ করছে। যেন, টেস্টেরই দোষ, সে কেন একই রেজাল্ট দিচ্ছে না। কেন দুই লিঙ্গ দুই রকম পারফর্ম করবে? উভয়ে তো সমান। অতএব, টেস্টই ঠিক নেই। বুইঝেন ব্যাপারটা।

পারফর্মেন্স গ্যাপ যেগুলোতে বেশি, সেই টেস্টগুলো বাদ দিয়ে দিলেন Wechsler সাহেব। ‘সমস্যা’টা সমাধান করা দরকার। এরপরও যখন দুই লিঙ্গকে সমান দেখানো যাচ্ছে না, তখন যেটা করা হল: কিছু টেস্ট রাখা হল যেগুলোতে পুরুষ ভালো করে, নারী খারাপ করে। আর কিছু টেস্ট রাখা হল, যেগুলোতে নারীরা ভালো করে, পুরুষ খারাপ করে। পুরোটাকে বলা হল ‘IQ টেস্ট’; এবং ‘নারী-পুরুষ’ আইকিউ সমান।

এই হল বিজ্ঞানের অবস্থা। যখন গবেষণার রেজাল্ট আপনার পছন্দ হচ্ছে না, মনমতো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে আপনি প্রাপ্ত ডেটাগুলো এদিক-সেদিক করে নিচ্ছেন। উদাহরণ যেন, অলিম্পিকে কোনো পোলভোল্ট ইভেন্টে কয়েকজন অ্যাথলেটকে আপনি ওজনের বাটখারা বেঁধে দিচ্ছেন। আর কয়েকজনকে পোলের উচ্চতা কমিয়ে দিচ্ছেন। যাতে ‘সত্য’টা প্রমাণিত হয় যে, শক্তি আর দ্রুততা যাই হোক, সৃষ্টিগতভাবে সব পোলভল্টারই সমান। (all the pole-vaulters, regardless of their prowess and agility, are created equal)

ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ২ – শামসুল আরেফিন শক্তি

তবে এটা বিজ্ঞানের অপব্যবহার, যা কিছু মানুষ করেছে এবং করছে- কেননা বিজ্ঞান কোন নির্দিষ্ট অথোরিটির হাতে সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানের অপব্যবহার আর অপপ্রয়োগগুলো নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে সবসময়ই।

যিনি সব জানেন…

ইসলাম এসেছে এই সমগ্র বিশ্ব জাহানের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তার কাছ থেকে, যিনি সবকিছু জানেন ও সবকিছুই তার আয়ত্তাধীন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

আমি যাকে ইচ্ছা, মর্যাদায় উন্নীত করি এবং প্রত্যেক জ্ঞানীর উপরে আছে অধিকতর এক জ্ঞানীজন।

সূরা ইউসুফ – আয়াত ৭৬

আল্লাহ তায়ালা তার প্রেরিত কিতাবকে প্রজ্ঞাময় উল্লেখ করেছেন,

প্রজ্ঞাময় কোরআনের কসম।

সূরা ইয়াসিন – আয়াত ২

আল কুরআনে বিজ্ঞান

বিজ্ঞান কিছু বছর আগে যেটা আবিষ্কার করেছে, তার অনেক কিছুই কুরআনে রয়েছে চৌদ্দশত বছর আগে থেকেই। সূরা আল আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

অবিশ্বাসীরা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল; অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম; এবং জীবন্ত সব কিছু পানি থেকে সৃষ্টি করলাম; তবুও কি তারা বিশ্বাস করবে না?

সূরা আল আম্বিয়া – আয়াত ৩০

আশ্চর্যজনক নয় যে, বর্তমান বিজ্ঞানের সাথে কুরআনের এই আয়াত মিলে যায়। বিগ ব্যাং থিউরিতে এরকমটাই বলা হয়েছে। আর প্রাণের সূচনা যে পানি থেকে হয়েছে, বর্তমান বিজ্ঞানের ধারণাও এরকমই।

এরপর সূরা আয যারিয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

আমি আমার ক্ষমতাবলে আকাশ নির্মাণ করেছি এবং আমিই একে সমপ্রসারিত করছি।

সূরা আয যারিয়াত – আয়াত ৪৭

এখানেও আধুনিক বিজ্ঞান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের কথারই স্বীকৃতি দিবে। বর্তমান বিজ্ঞান সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণা সমর্থন করে। আর এটা কুরআনের মু’যেজার একটি যে, বিজ্ঞান যত আধুনিক হবে, স্বাভাবিকভাবেই বিজ্ঞান কুরআনের কথাগুলোরই সত্যতার সাক্ষ্য দিতে থাকবে।

কুরআন পৃথিবীর কোন মানুষের রচনা হলে এটা সম্ভব হতো না। কারণ, কুরআনের অনেক তথ্য মানুষ জেনেছে কুরআন নাজিলের অনেক পরে। আর এখানে দুএকটি উদাহরণ দেওয়া হলো, এরকম আরো অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্য মহাগ্রন্থ আল কুরআনে রয়েছে।

বৈপরীত্ব ও করণীয়

মানুষ সর্বজ্ঞানী নয়, মানুষের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মানুষের পক্ষে সবকিছুর চূড়ান্ত রায় দেয়া সম্ভব না, সবকিছু জানা সম্ভব না- বিজ্ঞান এটা স্বীকার করে। এই সীমাবদ্ধতাকে পাশে রেখেই মানুষের জ্ঞানকে আরো উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া বিজ্ঞানের সাধনা। কিন্তু বিজ্ঞানকে মানবীয় ত্রুটির ঊর্ধ্বে পরম সত্য ধরে নেওয়া যেতে পারে কি? কখনোই না!

বিজ্ঞান কোন পরম স্ট্যান্ডার্ড হওয়া সম্ভব নয়, কেননা মানবীয় সব সীমাবদ্ধতাই বিজ্ঞানের জন্য প্রযোজ্য। বিজ্ঞানীদের মধ্যে ভিন্নমত থাকবে, বিজ্ঞানের কখনো অপব্যবহার হবে- এটা বাস্তবতা। কিন্তু বিজ্ঞান হলো মানুষের জ্ঞান আহরণের নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া- মানুষের অস্তিত্বের সাথে বিজ্ঞানের অস্তিত্ব অনিবার্য।

তাই বিজ্ঞানকে আমরা ইসলামের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখি না, আবার বিজ্ঞানকে পরম সত্যও মনে করি না। আমরা বিজ্ঞান দিয়ে কুরআনকে জাস্টিফাই করব না। বিজ্ঞান যা বলছে তা যদি কুরআন বা ইসলামের সাথে না মিলে, তাহলে আমরা বলবো, ইসলাম সত্য, এবং বিজ্ঞান হয়ত পরবর্তীতে ইসলাম যা বলেছে তার সত্যতার সাক্ষ্য দিবে।

এর কারণ হলো, ইসলাম এসেছে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের কাছ থেকে, যিনি সবকিছুই জানেন ও দেখেন। ইসলাম যা বলেছে, তার কোন পরিবর্তন হবে না, অথচ আজকের বিজ্ঞান কালকেই বদলে যেতে পারে।

ইসলামে চিন্তা ও গবেষণার গুরুত্ব

আল্লাহ তায়ালা বিজ্ঞান বা জ্ঞানচর্চাকে কুরআনের প্রতিপক্ষ করেননি। বরং জ্ঞানচর্চাকে কুরআনে উৎসাহিত করা হয়েছে। কুরআনের প্রথম যে আয়াত নাজিল হয়েছে, সেখানেই বলা হয়েছে,

তুমি পড় তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।

সূরা আল আলাক্ব – আয়াত ১

সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করলে স্রষ্ঠার মহিমা বোঝা যায়। কুরআনে সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-গবেষণা ও জ্ঞান অর্জনের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

যারা আল্লাহকে দন্ডায়মান, উপবিষ্ট এবং শায়িত অবস্থায় স্মরণ করে থাকে এবং আসমান ও যমীনের সৃষ্টির ব্যাপারে চিন্তা করে (ও বলে) : ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করনি, তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি, সুতরাং আমাদেরকে অগ্নির শাস্তি হতে রক্ষা কর।

সূরা আল ইমরান – আয়াত ১৯১

আল্লাহ তায়ালা তার সৃষ্টিতে নিদর্শন রেখেছেন। তাই আমাদের চিন্তা ও গবেষণা করতে হবে।

তিনি তা দিয়ে তোমাদের জন্য জন্মান শস্য, যায়তূন, খেজুর, আঙ্গুর এবং সর্বপ্রকার ফল। এতে চিন্তাশীল মানুষদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। তিনিই রাত ও দিনকে তোমাদের উপকারে নিয়োজিত করেছেন। আর সুরুজ ও চাঁদকেও; এবং তারকারাজিও তাঁরই নির্দেশে নিয়ন্ত্রিত; বিবেকসম্পন্ন লোকেদের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।

সূরা আন নাহল – আয়াত ১১-১২

আল কুরআনে আরো বলা হচ্ছে:

নিশ্চয় আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির মধ্যে, রাত ও দিনের পরিবর্তনের মধ্যে, যে সব জাহাজ মানুষের লাভের জন্য সাগরে চলাচল করে তাদের মধ্যে, আল্লাহ আকাশ থেকে যে পানি বর্ষণ করে মৃত ভূমিকে জীবিত করেন এবং সকল প্রকার প্রাণী তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন, আর বায়ুরাশির প্রবাহের মধ্যে (গতি পরিবর্তনে) এবং আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী (আল্লাহর আজ্ঞাধীন ভাসমান) মেঘের মধ্যে জ্ঞানী লোকের জন্য অবশ্যই (আল্লাহর মহিমার) বহু নিদর্শন রয়েছে।

সূরা আল বাকারা – আয়াত ১৬৪

মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আমরা চিন্তা ও গবেষণার সাথে এই গ্রন্থ থেকে নতুন নতুন তথ্য জানতে পারবো।

তাহলে তারা কি (আল্লাহর) এ বাণী সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে না? কিংবা তাদের কাছে এমন কিছু (নতুন বস্তু) এসেছে যা তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে আসেনি?

সূরা আল মু’মিনুন – আয়াত ৬৮

এখন আমরা ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে জানি, কিন্তু কুরআন যখন নাজিল হয়,তখন মানুষের এ বিষয়ে ধারণা ছিলো না। সূরা আল ওয়াকিয়ার ৭৫ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে,

সুতরাং আমি কসম করছি নক্ষত্ররাজির অস্তাচলের, আর নিশ্চয় এটি একটি মহাকসম, যদি তোমরা জানতে,

সূরা আল ওয়াকিয়া – আয়াত ৭৫, ৭৬

বর্তমানে এই আয়াতের ব্যাখ্যা করা হচ্ছে যে, এখানে কৃষ্ণগহ্বর বিষয়ে বলা হয়েছে। এটা কুরআনের একটি মু‌‌’জেজা যে, চিন্তা ও গবেষণা করলে আমরা কুরআন থেকে নতুন নতুন তথ্য জানতে পারব। এটা এমন এটি গ্রন্থ যা চির আধুনিক।

বিজ্ঞান কি ইসলামের প্রতিপক্ষ?

ইসলাম চিন্তা ও গবেষণাকে উৎসাহিত করে। সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করতে পারে। বিজ্ঞান ও ইসলাম প্রতিপক্ষ নয়। তবে, ইসলাম এসেছে স্রষ্ঠার নিকট থেকে যিনি সমস্ত ভুলত্রুটি থেকে পবিত্র। অন্যদিকে, বিজ্ঞান মানবীয় দোষত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়।

বিজ্ঞান ও ইসলাম প্রতিপক্ষ নয়। তবে একজন বিশ্বাসীর জন্য ইসলাম সবার আগে। বিজ্ঞান ও ইসলামের মধ্যে কোথাও অমিল থাকলে সেটা মানুষের সীমাবদ্ধতা। হতে পারে, ভবিষ্যতে বিজ্ঞান অমিলের বিষয়গুলোতেও ইসলামের সত্যতার সাক্ষ্য দিবে। ইসলাম এসেছে বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের কাছ থেকে, আর নিঃসন্দেহে ইসলাম সত্য।

মানুষের মধ্যে কেউ কেউ জ্ঞান, পথনির্দেশ ও দীপ্তিমান কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্বন্ধে বিতন্ডা করে।

সূরা আল হাজ্জ – আয়াত ৮

আরেকটি বিষয় আমাদের মাথায় রাখতে হবে, ইসলামের বিধানগুলো আমরা আল্লাহর আদেশ হিসেবেই মানবো। সালাত, সাওম এরকম ইবাদতগুলোর বৈজ্ঞানিকভাবে বিভিন্ন উপকারিতা রয়েছে, আমরা তা নিয়ে গবেষণা করতে পারি এবং এজন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে পারি, কিন্তু আমাদের ইবাদতের উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি। কোনভাবেই এর ওপরে তার পার্থিব উপকারিতা যেন আমাদের ইবাদতের মূল কারণ না হয়ে যায়।

JWST বিষয়ক সংযোজন

বিজ্ঞান মূলত যুক্তি ও প্রমাণনির্ভর। বর্তমানে মানুষের পরীক্ষণলদ্ধ জ্ঞান অনুযায়ী দূরবর্তী স্থান থেকে আলো আসতে একটা সময় প্রয়োজন। তাই অনেক দূরের কোন কিছুর ছবি তোলা হলে, ছবিটা সেটার বর্তমান অবস্থার না, বরং যত আলো সেখান থেকে আলো আসতে যতটা সময় নিয়েছে, তত আগের অবস্থানের হয়। এটা শুধু JWST-র বেলায় প্রযোজ্য না, হাবল বা অন্য টেলিস্কোপের ছবিগুলোতেও প্রযোজ্য। এমনকি আমরা যখন চোখ দিয়ে দূরবর্তী কোন তারা থেকে আসা আলো দেখি, তারও অতীতের অবস্থা দেখি আমরা। তবে JWST-র মার্কেটিংয়ে এই ব্যাপারটা আনা হচ্ছে বেশি।
ধরা যাক, একটি অন্ধকার রুমকে টর্চ জ্বালিয়ে আলোকিত করা হলো। আপনার থেকে কেউ যদি 9.461 ট্রিলিয়ন কিলোমিটার দূরে থাকে, তাহলে সে সাথে সাথে এই আলো (তথা রুমকে আলোকিত) দেখবে না। আলো তার কাছে যেতে ১ বছর সময় নিবে। ১ বছর পর তার কাছে যখন আলো গেলো, সে মূলত ১ বছর আগে রুমটি থেকে যাত্রা করা আলো দেখছে, অর্থাৎ রুমের ১ বছর আগের অবস্থা দেখতে পাবে সে। অবশ্য এখানে আরেকটি বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। মহাবিশ্ব যেহেতু প্রসারণশীল, এটির একটি প্রভাব রয়েছে। কাজেই বর্তমানে কোনকিছু যত আলোকবর্ষ দূরত্বে আছে, তার থেকে আলো তত বছরের আগেই আসা সম্ভব।
প্রসঙ্গত, আলোকবর্ষ সময়ের না, দূরত্বের একক। এক বছরে আলো যে দূরত্ব অতিক্রম করে সেটা এক আলোকবর্ষ। এটার মান 9.461 ট্রিলিয়ন কিলোমিটার। এই অংশের আলোচনাটুকু সরলীকৃত, এই বিষয়টি নিয়ে আমার বেসিক লেভেলের পদার্থবিজ্ঞানের বাইরে যথেষ্ট পড়াশোনা নেই।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা

এই লেখাটি লিখতে শাইখ ইফতেখার সিফাত, সাব্বির হোসাইন ভাই, মনির আহমদ মনির ভাই, মুহাম্মদ রাফসান নাসির ভাই, দীন মুহাম্মদ শেখ ভাই, তৌহিদুর রহমান মাহিন সহ আরো অনেক ভাইয়ের সহযোগিতা পেয়েছি। ভাইদের প্রতি আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। আল্লাহ উনাদেরকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

সহায়তা:

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ রব্বুল আলামীনের অশেষ রহমতে তিনি যতটুকু তাওফিক দিয়েছেন লিখতে চেষ্টা করেছি। লেখাটির বিষয়বস্তুর গুরুত্ব বিবেচনায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনে সচেষ্ট থেকেছি। এরপরও কোন ভুলত্রুটি থেকে যেতে পারে, মহামহিম রব এজন্য আমাকে ক্ষমা করুন, আমিন। কোন ভুলত্রুটি চোখে পড়লে আমাকে জানালে ইন শা আল্লাহ সংশোধনে সচেষ্ট হব।

একটি নিয়নবাতি পরিবেশনা

2 thoughts on "বিজ্ঞান ও ইসলাম কি পরস্পর প্রতিপক্ষ?"

  1. Tushar Ahmed Author says:
    Shundor likhechen! 💝
    1. তাহমিদ হাসান Author Post Creator says:
      শুকরিয়া

Leave a Reply