আসসালামু আলাইকুম

আশা করছি আপনারা সবাই আল্লাহর রহমতে ভালো আছেন।

আমার আগের সব পর্ব:-

ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ১

ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ২

ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ৩

ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ৪

ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ৫

ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ৬

[পর্ব ৭] ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।[নাসির আল দীন আল তুসি:-ত্রিকোণমিতির স্রষ্টা,জিজ-ইলখানি উপাত্তের উদ্ভাবক]

[পর্ব ৮] ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।[আবুল ওয়াফা:-ত্রিকোণমিতির মূল স্থপতি]

15.আবু মারওয়ান/ইবনে জহুর(পরভূক জীবাণু বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা,পরীক্ষামূলক সার্জারির জনক, পরীক্ষামূলক শারীরবৃত্তীয়, মানুষের ব্যবচ্ছেদ, অটোপস এর অগ্রদূত)

আমরা অনেকেই জানিনা, বড় মাপের একজন মুসলিম বিজ্ঞানী বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে প্যারাসাইটোলজীকে চিহ্নিত করেছিলেন। প্যারাসাইটোলজি’র বাংলা নাম দেয়া যায় পরভূক জীবাণু বিজ্ঞান। এ বিষয়টিকে স্বতন্ত্র বিজ্ঞানের মর্যাদায় সমাসীন করেছিলেন বিজ্ঞানী আবু মারওয়ান আব্দুল মালিক ইবনে জহুর। একমাত্র তিনিই এই কৃতিত্বের দাবি করতে পারেন।

তাকে ইহুদী বলে চিহ্নিত করার জন্যে একটা অহেতুক বিতর্ক বিভিন্ন মহল থেকে তােলা হয়েছিল। সুখের কথা, এই অকার্যকর বিতর্কের স্বাভাবিক অবসান ঘটে শেষ পর্যন্ত। এক সময় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এলো, আবু মারওয়ান ছিলেন এক সহজ সরল মুসলমান। তবে তিনি ছিলেন প্রতিভাধর এক বিজ্ঞানী।

১০৯৪ সালে তৎকালীন আন্দালুসিয়ার (বর্তমান স্পেন) সিভাইল অঞ্চলে সম্ভ্রান্ত বানু জহুর গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন আবু মারওয়ান আবদুল মালিক ইবনে আবি আল আলা ইবনে জহুর (সংক্ষেপে ইবনে জহুর)।পশ্চিমাবিশ্বে তিনি আভেঞ্জোয়ার(Avenzoar) নামে পরিচিত।

বানু জহুর মূলত আরব দেশের প্রসিদ্ধ গোত্র ছিল, যার একটি অংশ ইসলাম প্রচারের সময় আন্দালুসিয়া (স্পেন) গমন করে।

আরব বিশ্বের প্রাচীন প্রথা অনুসারে ছোটবেলায় ইবনে জহুর ধর্মীয় শিক্ষা ও সাহিত্য রপ্ত ও চর্চা করতে থাকেন। পরবর্তীতে বাবা আবুল আলা জহুরের হাত ধরে তিনি চিকিৎসা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন শুরু করেন। ইবনে জহুরের নিজের ভাষ্য অনুসারে তার পিতা তাকে প্রখ্যাত রোমান চিকিৎসক গ্যালেন এবং ‘ফাদার অব মেডিসিন’ খ্যাত গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটসের চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এ ছাড়াও চিকিৎসাসেবায় ব্রত থাকার লক্ষ্যে ‘হিপোক্রেটিক ওথ’ নামক শপথ বাক্য পাঠ করান।

আবু মারওয়ানের সমসাময়িক পণ্ডিতজনের প্রয়াস চালাতেন যথাসম্ভব বেশি বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের। কিন্তু তিনি ছিলেন এ ধারণার বিপক্ষে। তিনি শুধু একটি বিষয়ে গভীর জ্ঞানার্জনের পক্ষপাতী ছিলেন।

তিনি সারা জীবন আত্মনিবেদিত ছিলেন চিকিসা বিজ্ঞান নিয়ে। লেখাপড়া শেষ করে চাকরি নেন শাসক আল- মুরায়িদ (আল মুরাবাতুন)-এর অধীনে। তিনি ছিলেন একজন আল-মুহাদ্দিস (আল-মুহাদুম) শাসক। মারওয়ান কাজ করতেন আব্দুল মমিনের অধীনে।

আল-মুরায়িদের এবং আল-মুহাদ্দিসদের রয়েছে আলাদা নিজস্ব ইতিহাস। স্পেনে মুসলিম শাসনের পতন সময়ে পশ্চিম আফ্রিকায় উত্থান ঘটে এক নতুন শক্তির। সাহারার আশেপাশে বসবাস করতাে একটি নাপিত সমাজ। এরা পরিচিত ছিল মুসাসামিনস নামে।

এরা ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়ে যায়। তাঁদের ধর্মীয় নেতা ‘মরবুত’ নামে পরিচিত ছিল। মরবুতদের রাজাকে বলা হতাে আল-মারাবিতা’ কিংবা ‘আল-মুরাবিদ। তাদের মধ্যে সবচে’ বিখ্যাত ছিলেন মােহাম্মদ ইবনে তুমুর্ত। তাঁর অনুসারীরা তাঁকে মহান সাধুপুরুষ হিসেবে বিবেচনা করতাে।

তিনি মেহদি’ উপাধি ধারণ করেন। তিনি ধর্ম প্রচারের ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর অনুসারীরা পরিচিত ছিল ‘আল-মুয়াহেদিন নামে। খুব শিগগিরই এরা রূপকথাতুল ধন সম্পদের অধিকারী হলাে । হয়ে উঠলাে অনন্য শক্তিধর। গড়ে তুললাে এক সাম্রাজ্য। ইবনে তুমুর্ত আব্দুল মমিনকে তাঁরা কমরেড হিসেবে গ্রহণ করলেন। মমিন ছিলেন খুব বড় এক ধনী ঘরের সন্তান। ৫২৬ হিজরি সনে অর্থাৎ ১১৩০ খৃষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন তুমুর্ত। আল-মুহাদ্দিসের শাসক হলেন আব্দুল মমিন। এ বংশের তিনি হলেন প্রথম শাসক।

মুসলমানদের সেই স্বর্ণ যুগে আবু-মারওয়ান ছিলেন এক বিখ্যাত চিকিৎসক। ছিলেন একজন সুবিখ্যাত আবিষ্কারকও। তিনি সে সময়ে অনেক নতুন নতুন ধরণার জন্ম দেন। চামড়ার স্ফোটকা কেন হয়, কেন হয় চুলকানি ইত্যাদির প্রথম বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন তিনি। এক্ষেত্রে তাঁর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো পবভূক জীবাণুর আক্রমণে চামড়ায় স্ফোটকা হয়, চুলকানি হয়। তিনি আবিষ্কার করেন প্যারাসাইট বা পরভূক জীবাণু।

বিশ্বজনীন বৈজ্ঞানিক প্রজ্ঞার ইতিহাসে মারওয়ানই ছিলেন প্রথম প্যারাসাইটোলজি বাংলায় বলা যায়, পরভূক জীবাণুবিদ।

এই মহান চিকিৎসক প্রথম শ্বাসনালীতে শল্যচিকিৎসার অর্থাৎ ট্র্যাকোওটমি(tracheotomy) সূচনা করেন।যা তিনি ছাগলের উপর করেছিলেন।

তিনি হচ্ছেন সেই প্রতিভাধর, যিনি সর্বপ্রথম অন্ননালী দিয়ে কৃত্রিম খাবার গ্রহণের সূচনা করেন। সে সময়ে এটা ছিল একটা বৈপ্লবিক ব্যবস্থা। তিনিই প্রথম ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন মেডিস্টিনাল টিউমারের। এ ছাড়া দেহের ভেতরের যক্ষ্মা ও ফোড়ার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও সর্বপ্রথম তাঁর কাছ থেকেই আমরা জানতে পারি। কানের ভেতরের ফোড়ার কারণও তিনি বিশ্ববাসীকে প্রথম জানান।

ইবনে জহুর দেহ ও ত্বকের সৌন্দের্যের জন্য বিভিন্ন চিকিৎসাব্যবস্থা এমনকি প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে লম্বা নাক, মোটা ভ্রু এবং আঁকাবাঁকা দাঁত ঠিক করার কথা বলে গেছেন।ইবনে যুহর তার আগে কখনও বর্ণিত নয় এমন অনেক রোগ এবং চিকিৎসা উদ্ভাবনগুলি বর্ণনা করে সার্জিকাল এবং চিকিত্সা জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছিলেন

বিভিন্ন প্রকার খাবার বিশেষত পুষ্টিকর খাবার, ফলমূল, মিষ্টি প্রভৃতির প্রতিক্রিয়ার কথাও তার রচনায় ওঠে আসে। খাদ্য হিসেবে সিংহ, সাপ ও বন্য পশুসহ বিভিন্ন জীবজন্তুর গোশত গ্রহণ এবং তার প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন ইবনে জহুর।

বিভিন্ন ঋতুতে কী খাবার গ্রহণীয় কিংবা বর্জনীয়, সেই তথ্য রয়েছে তার রচনায়। জীবনের শেষপ্রান্তে তিনি ৩০ খন্ডে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইনসাইক্লোপিডিয়া লিখে গেছেন। প্রায় হাজার বছর আগে তিনি ক্যান্সারের পূর্বাভাস দিয়েছেন এবং স্যালাইনের মাধ্যমে দেহে খাদ্য উপাদান বা পানীয় প্রয়োগের প্রথা চালু করেন।

তিনি বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ বিশেষত শ্বেতরোগ, ত্বকের ঘা নিয়ে আলোচনা করেছেন। যে কোনো ওষুধ এমনকি সার্জিক্যাল অপারেশন মানুষের দেহে প্রয়োগ করার আগে তা পশুর ওপর পরীক্ষা করার সফল প্রচলন করেন ইবনে জহুর।

ইবনে জুহর খাদ্যনালী , পেট এবং মধ্যযুগীয় ক্যান্সারের পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষত সম্পর্কে সঠিক বর্ণনা প্রদান করেছিলেন । পেটের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের বাঁচিয়ে রাখতে তিনি এনেমা খাওয়ানোর প্রস্তাব করেছিলেন। ওটিটিস মিডিয়া এবং পেরিকার্ডাইটিসের(হৃদপিণ্ডের চারপাশের ঝিল্লি থলির প্রদাহ) মতো জ্বলনের রোগগত বিবরণ তিনিই প্রথম দিয়েছেন ।

আবু মারওয়ান চিকিৎসা বিজ্ঞানের বেশ কিছু বই লিখে গেছেন। সময়ের স্রোতে তাঁর অন্তত কিছু বই আজও টিকে আছে।

আবু রুশদের মতে, মারওয়ান-এর ‘কিতাব আল-তাইসির ফি-আল-মুদায়াত ওয়া- আল-তদবির’(Book of Simplification Concerning Therapeutics and Diet) বইটি ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ।


এটি অস্ত্রোপচারের অগ্রগতির পক্ষে প্রভাবশালী ছিল। তিনি তাঁর এই বইয়ে ওষুধ এবং পথ্য সম্পর্কে বিস্তারিত লিখে গেছেন। তাঁর কিছু আবিষ্কার ও উদ্ভাবনা সম্পর্কেও কিছু আলােচনা করেছেন তাঁর বইয়ে।

এই কিতাবে তিনি লিখেছিলেন:

“হাতের নীচে উকুন রয়েছে, গোড়ালি এবং পায়ের কৃমির মতো এবং একই জায়গায় প্রভাবিত ঘা রয়েছে। যদি ত্বক অপসারণ করা হয় তবে এর বিভিন্ন অংশ থেকে এটি উপস্থিত হয়, একটি খুব ছোট প্রাণী যা খুব কমই দেখা যায়।”এ আলোচনার সূত্র ধরেই আধুনিক মাইক্রোবায়োলজির যাত্রা শুরু হয়।

তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই : ‘কিতাব আল-ইফতিসাদ ফি-ইমলাহ আল-আনফুস ওয়া আল-আজাদ’। এই বইয়ের প্রথম খণ্ডে আলােচ্য বিষয় হচ্ছে মনস্তত্ত্ব। এর পরের খণ্ডের আলােচনা রােগ সম্পর্কে। রােগের আলােচনা করে ওষুধও বাতলে দেয়া হয়েছে এ বইয়ে।

এতে উপদেশ আছে স্বাস্থ্য ও পথ্য বিষয়ে। সে সময়ের চিকিত্সকেরা এই বইটির মাধ্যমে বেশ উপকার পেয়েছেন।

তার আরেকটি বইয়ের নাম : ‘কিতাব আল-আখজেন।

বইটি তথ্য বিষয় নিয়ে লেখা। এটি একটি অনন্য সাধারণ বই। স্বাস্থ্য ও পথ্যের মধ্যে যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান-তাই এই বইটিতে তুলে ধরা হয়। লেখকের জ্ঞানা্বেষণ ও ব্যাখ্যা দেবার ক্ষমতা আজকের দিনেও বিরল। চিকিৎসা বিজ্ঞানে আবু মারওয়ানের অবদান পরবর্তী প্রজন্মেও প্রাধান্য বিস্তার করেছিল।

তার আরেকটি বইয়ের নাম : ‘কিতাব আল-তায়েসির’।

কিতাব আল-তায়েসির মৃত্যুর আগে ইবনে যুহরের শেষ বই বলে মনে হয়। বইটি তাঁর বন্ধু ইবনে রুশদের অনুরোধে তিনি লিখেছিলেন।

বইটিতে 30 টি অধ্যায় রয়েছে,যেখানে ক্লিনিকাল বর্ণনা এবং মাথা থেকে শুরু হওয়া রোগগুলির নির্ণয় সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে।

ইবনে আবী উসাইবিয়া ইবনে যুহরের অন্যান্য রচনার উল্লেখ করেছেন:

ফাই আল-জিনাহ (বিটিফিকেশন অন)।
আল-তিরিয়াক আল-সাবিনি (অ্যান্টিডোটোটস উপর)।
ফাই ইলাত আল-কিলা (কিডনির রোগসমূহে)।
ফাই ইল্লাত আল-বারাস ওয়া আল-বাহাক (কুষ্ঠ এবং ভিটিলিগোতে)।
আল-তাদকিরাহ (স্মরণ)

তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বইগুলাে হিব্রু ও লাতিন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। আঠারাে শতকেও এসব বই খুব সুনামের সাথে ইউরােপে পড়া হতাে। যখন রাষ্ট্রক্ষমতা হারিয়ে যায়, তখন প্রজার স্বীকৃতিও হারিয়ে যায়। মারওয়ানের গভীরতর পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে আজ আর কেউ মাথা ঘামায় না। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে তাঁর অসাধারণ পদ্ধতি নিয়ে আজ আর কেউ ভাবে না।

তিনি যখন গৌরবের শীর্ষ শিখরে, ঠিক তখনই তিনি এই মাটির পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

১১৬২ খৃষ্টাব্দে তার জন্মস্থান সেভেল্লিতেই তিনি ইন্তেকাল করেন। সেই সাথে গােটা মানবজাতি হারায় একজন অনন্য বিজ্ঞানী ব্যক্তিত্বকে।

2 thoughts on "[পর্ব ৯]ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।[আবু মারওয়ান/ইবনে জহুর:-পরভূক জীবাণু বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা,পরীক্ষামূলক সার্জারির জনক, পরীক্ষামূলক শারীরবৃত্তীয়, মানুষের ব্যবচ্ছেদ, অটোপস এর অগ্রদূত]"

  1. Al Amin Rimon Contributor says:
    ভালো


    1. Abir Ahsan Author Post Creator says:
      Thanks

Leave a Reply